সাত নভেম্বরকে কীভাবে দেখবো আমরা? বিএনপি, আওয়ামী লীগ নাকি জাসদের রাজনৈতিক দৃষ্টিতে? নাকি ৭ নভেম্বর নিহত তিন বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশাররফ, হায়দার ও হুদার পরিবারের মতো করে? এখনো জেনারের খালেদ মোশাররফের মেয়ে বাবার হত্যাকাণ্ডের জন্য মামলা করতে চান। কর্নেল হুদার ছেলে চান সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে যেন একটি তদন্ত হয়। আর লে. কর্নেল হায়দারের স্বজনরা চান সরকার এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার করুক। এসব নিয়ে এখন অন্য কেউ কথা বলেন না।
ইতিহাসের পাতায় কীভাবে মূল্যায়িত হবে ৭ নভেম্বর? ৪১ বছর পরও বিতর্ক অব্যাহত আছে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর যে রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব ছিল না, তারাই ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করে দিনটির। সেদিন যে অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিলো জাসদের গণবাহিনী আর তাদের সহযোগী সৈনিক সংস্থা, সেই জাসদ নেতারাই এখন জিয়াউর রহমানকে বিশ্বাসঘাতক বলেন। কারণ অল্পদিনের মধ্যেই কর্নেল তাহের গ্রেপ্তার এবং পরে ফাঁসীকাষ্ঠে ঝুলেছিলেন। কিন্তু টিকে গিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। খুব ঠাণ্ডামাথায় ধীর স্থিরভাবে এগিয়েছিলেন সেনাপ্রধান জিয়া। তাই তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী সকলকে অতিক্রম করে সেনাবাহিনীতে একরকম শৃংখলা ফেরাতে সক্ষম হয়েছিলেন, যদিও বিচ্ছিন্নভাবে আরো কিছু অভ্যুত্থানের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাকে। আর একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করতে পারলেও মাত্র ছয় বছরের মাথায় সেনাবাহিনীর কয়েকজন সদস্যের হাতেই নিহত হন সামরিক বাহিনীতে একসময়ের জনপ্রিয় জেনারেল জিয়াউর রহমান।
যদি আমরা ফিরে যাই ৭৫’র নভেম্বরে তাহলে দেখা যাবে পাল্টা অভ্যুত্থানে ৭ নভেম্বর সকালে তখনকার সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ তার দুই সহযোগী কর্নেল হুদা, হায়দারসহ নিহত হন। ওই সকালেই বেতার ভাষণে জিয়াউর রহমান বললেন, ‘আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, বিডিআর, পুলিশ, আনসার এবং অন্যদের অনুরোধে আমাকে সাময়িকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের চিফ মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর ও সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হয়েছে।’
তখনও দেশে রাষ্ট্রপতি আছেন। কিন্তু প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ভাষণ দিয়ে ওই দিন নিজেকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে শীর্ষ ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন জেনারেল জিয়া। যদিও ওই সন্ধ্যায় বেতার ভাষণে প্রেসিডেন্ট হিসেবে সায়েম নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবেই উল্লেখ করেন। তার সাথে বিদায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে খন্দকার মোশতাকও বক্তব্য দেন। ‘বিএনপি: সময়-অসময়’ বইতে মহিউদ্দিন আহমেদ উল্লেখ করেছেন- ৭ নভেম্বর সকালে বেতার ভাষণে জিয়াউর রহমান নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে উল্লেখ করলেও সকাল ১০টায় সেনানিবাসের বৈঠকে রাষ্ট্রপতিকেই প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে কর্মকাণ্ড চালানোর পক্ষে মত দেন অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান সংগঠক কর্নেল আবু তাহের। সেনানিবাসের বৈঠকে ছিলেন জিয়াউর রহমান, জেনারেল ওসমানী, জেনারেল খলিলুর রহমান, বিমান বহিনী প্রধান তায়েব, নৌ প্রধান এম এইচ খান ও মাহাবুব আলম চাষী। ওই বৈঠকে জিয়া নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধানের মতো উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে কাজ চালানোর বিষয়টি মেনে নেন। সন্ধ্যায় বিচারপতি সায়েম, খন্দকার মোশতাক, জিয়াউর রহমান ও কর্নেল তাহের ঢাকা বেতার কেন্দ্রে যান। সেখানেই নতুন এবং বিদায়ী দুই রাষ্ট্রপতি বক্তব্য রাখেন।
৭ নভেম্বর মূলত জাসদের উদ্যেগেই রাজধানী ঢাকায় বেসামরিক জনগণ ও সেনাসদস্যরা একযোগে মিছিল করেছে। এখন বিভিন্ন গণমাধ্যমে আমরা ট্রাকে করে সৈনিক-জনতার যে উৎফুল্ল মিছিলের ছবি দেখি তার পেছনে ছিল জাসদ ও সৈনিক সংস্থার সফল অভ্যুত্থান। কিন্তু মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই জিয়াউর রহমান খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি সায়েমের সাথে মিলিয়ে নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেন। ৮ নভেম্বর রাজশাহী কারাগার থেকে জাসদ নেতা আ স ম আব্দুর রব এবং ময়মনসিংহ থেকে জাসদ প্রধান মেজর (অব.) এম এ জলিল মুক্ত হলেও ২৩ নভেম্বরের মধ্যে আবারো গ্রেপ্তার হয়ে যান কর্নেল তাহেরসহ বেশিরভাগ জাসদ নেতা। আর মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে জাসদের মোহভঙ্গ হয় জিয়াউর রহমান সম্পর্কে। তখন থেকে শুরু করে এখনো জাসদ নেতারা জিয়াউর রহমানকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবেই উল্লেখ করে আসছেন।
তখনকার গণবাহিনী নেতা অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের লেখা ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ৭ নভেম্বর অভ্যুত্থানে কর্নেল তাহের’ বইটি পড়লে জিয়াউর রহমান সম্পর্কে তাদের মূল্যায়নটি পাওয়া যায়। ডিবিসি নিউজের ‘উপসংহার’ অনুষ্ঠানেও তিনি স্পষ্ট করেই জিয়াউর রহমানকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নিজের বইতে তিনি লিখেছেন: ‘নিপীড়িত মানুষের নেতৃত্বদানকারী তাহের ভুল করলেও তার প্রতিপক্ষ কিন্তু কোনো ভুল করেনি। জিয়ার প্রাণ রক্ষাকারী হাতের, সিপাহী অভ্যুত্থানের নায়ক তাহেরকে হত্যা করতে তাদের এতটুকু দ্বিধা হয়নি, হাত কাঁপেনি। যেমন হাত কাঁপেনি পরবর্তিতে হাজার হাজার অভ্যুত্থানী সৈনিককে গণফাঁসি দিয়ে হত্যা করতে। ৭ নভেম্বরের বড় শিক্ষা এ থেকে পাওয়া যাবে।’
একথা বলাই যায় যে ৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমান তার ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে পেরেছিলেন। আপাতত সেনাবাহিনীতে একটি শৃংখলাও ফিরে এসেছিল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে অসন্তোষ ছিল। তারই বহি:প্রকাশ ঘটেছিল একাধিক অভ্যুত্থানের চেষ্টায়। বঙ্গবন্ধুর খুনীদের অন্যতম মেজর ফারুক ৪ নভেম্বর দেশ ছেড়ে গেলেও আবারো সে ফিরে এসে বগুড়া সেনানিবাসে অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছে। ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে একাধিক অভ্যুত্থান হয়েছে। এসব অভ্যুত্থানে জড়িত থাকার কথা বলে কয়েকশ সেনা ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তাকে ফাঁসীতে ঝুলিয়েছেন জিয়াউর রহমান। আমরা নভেম্বর ‘৭৫ নিয়ে আলোচনা করছি, কিন্তু এসব অভ্যুত্থানে নিয়ে খুব বেশি আলোচনা এখন আর হয় না।
‘উপসংহার’-এর আলোচনায় যারা এসেছেন তাদের বিস্তারিত আলোচনার পরও বলাই যায় যে পঁচাত্তরের রক্তাক্ত নভেম্বর নিয়ে আরো বেশি গবেষণার দরকার আছে। এমনকি জেল হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়ার পরও তার পেছনে যে ষড়যন্ত্র ছিল, সেগুলোও উদঘাটিত হওয়া দরকার।
ডিবিসি নিউজের ‘উপসংহার’ অনুষ্ঠানের আলোচনায় নানা বিষয়ে কথা বলে একটি জায়গায় পৌঁছতে চেয়েছি। তার মধ্যে একটি বড় বিষয় হলো: ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে নিহতদের স্বজনদের চাওয়া অনুযায়ী সেসব হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে কি না? আর দেশে যে হঠকারী রাজনীতির সৃষ্টি হয়েছিল, যে কারণে জাতির জনককে হত্যা করা হয়েছিল সে থেকে রাজনীতির কোন শিক্ষা আমরা নিতে পারি কি না? আরেকটি বিষয় হচ্ছে, জেল হত্যাকাণ্ডসহ সেসময়ের সামগ্রিক একটি ঘটনাপঞ্জি তৈরি করা যায় কি না, সে বিষয়েও একটি উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। (চলবে)
(৭ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে গত অক্টোবর মাস জুড়ে ‘ডিবিসি’ টেলিভিশনে আট পর্বে ‘উপসংহার’ নামে একটি টক-শো করেছেন ডিবিসি নিউজের এডিটর প্রণব সাহা। সেই টক-শোতে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং অন্যান্য বই ও দলিলপত্র ঘেঁটে তিনি চ্যানেল আই অনলাইন’র জন্য এ ধারাবাহিকটি লিখছেন। টক-শো’র মতো এখানেও তিনি সবার চোখ দিয়ে ৭৫’র নভেম্বরের ঘটনাগুলোতে দৃষ্টিপাত করে একটি উপসংহারে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন।)







