সুরেশ চন্দ্র সুশীলের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান উপলক্ষে বাড়িতে লাগানো ছিল সামিয়ানা। বুধবার (৯ ফেব্রুয়ারি) প্রায় দেড়-দুই হাজার পাড়া-প্রতিবেশিদের জন্য আয়োজন ছিল শাকান্ন ভোজের। কিন্তু ঘাতক একটি পিকআপ গাড়ির চাপায় এক সাথে পাঁচ সন্তানের মৃত্যুতে সব কিছুই পণ্ড হয়ে গেছে। এখন আহত তিন ভাইবোনও জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। সবমিলিয়ে এ মর্মান্তিক ঘটনায় পরিবারসহ আশপাশের এলাকায়ও চলছে শোকের মাতম।
হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী ভাইদের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করতে হয়েছে আরেক ভাই চিত্তরঞ্জন সুশীলকে।
বুধবার দুপুরে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডস্থ হাসিনা পাড়ায় মৃত ডা. সুরেশ চন্দ্র সুশীলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান উপলক্ষে বাড়িতে ঢুকার পথে একটি তোরণ নির্মাণ করা হয়েছিলো। সেই তোরণের কাপড় খুলে ফেলা হয়েছে। শুধু বাড়ির উঠানে একটি সামিয়ানা লাগানো রয়েছে। এর মধ্যে চলছে মৃত ডা. সুরেশ চন্দ্র সুশীলের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। শুধুমাত্র ধর্মীয় রীতিই পালন করা হচ্ছে। চারিদিকে শুধু কান্নার শব্দ।
ডুলাহাজারা মেমোরিয়াল খ্রিষ্টান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন প্লাবন সুশীলকে বাবার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করার জন্য নিয়ে আসা হলেও সে বারবার অজ্ঞান হয়ে যাওয়ায় পিতার শেষ কাজটি করতে পারেনি। চেয়ার নিয়ে এক পাশে বসে রয়েছে মৃত সুরেশ সুশীলের স্ত্রী মৃণালিনী বালা সুশীল মানু। অন্যপাশে স্বামীহারা স্ত্রী ও সন্তানরা কান্নাকাটি করছে। সে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য!
পুত্রদের হারিয়ে পাগলপ্রায় মৃণালিনী বালা সুশীল কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, আমার সব শেষ হয়ে গেছে। স্বামী গেছে, সন্তানরাও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আমারও বাঁচার ইচ্ছে নেই। এসময় তিনি তার গুরুতর আহত তিন সন্তানকে বাঁচানোর জন্য সবার সহযোগিতা চান।
কী ঘটেছিলো সেদিন?
প্রত্যক্ষদর্শী বেঁচে যাওয়া ছোট বোন মুন্নি সুশীল বলেন, ধর্মীয়রীতি অনুযায়ী মৃত বাবার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করার আগে ক্ষুদান্ন ও ক্ষৌড়কর্ম করতে হয়। এই উপলক্ষে মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে আমিসহ আমার ভাই অনুপম, নিরুপম, দিপক, চম্পক, স্মরণ, রক্তিম, প্লাবন ও বোন হীরা সুশীল ক্ষুদান্ন দান করতে বাড়ির অদূরে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পূর্বপার্শ্বে বট গাছের নিচে যাই। মূলত সুর্য উদয়ের আগেই এই কাজটি সম্পন্ন করতে হয়। আমরা সবাই ক্ষুদান্ন শেষ করে বাড়ি ফেরার জন্য দুই সারি করে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়েছিলাম। প্রথম সারিতে ভাইয়েরা। দ্বিতীয় সারিতে আমি, ছোট বোন হীরা ও ছোট ভাই প্লাবন। এসময় চকরিয়া থেকে কক্সবাজারগামী একটি সবজি বোঝাই পিকআপ আমাদের ভাইদের চাপা দেয়। এতে ভাইয়েরা সবাই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে যন্ত্রণায় চিৎকার করতে থাকে। পরে ওই পিকআপটি পিছনের দিকে এসে আবারও ভাইদের চাপা দিয়ে কক্সবাজারের দিকে পালিয়ে যায়।
এসময় ঘটনাস্থলে মারা যায় চার ভাই অনুপম, নিরুপম, দিপক, চম্পক। গুরুতর আহত হয় স্মরণ, রক্তিম, প্লাবন ও ছোট বোন হীরা। পরে স্থানীয় লোকজন এসে তাদের উদ্ধার করে মালুমঘাট মেমোরিয়াল খ্রিষ্টান হাসপাতালে নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে গুরুত্বর আহত স্মরণ ও রক্তিমকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ওখানে গতকাল মঙ্গলবার রাতে ভাই স্মরণ সুশীল মারা গেছে। আরেক ভাই রক্তিম সুশীল মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করছে। জানিনা ওই ভাইকে বাঁচাতো পারবো কিনা। এসব কথা বলতে বলতে মাঝে-মধ্যে হুশ হারিয়ে ফেলছেন বোন মুন্নি সুশীল।
সদ্যজাত কন্যার নাম রেখে যেতে পারেনি স্মরণ সুশীল
একমাস আগে নিহত স্মরণের ঘরে জন্ম নেয় এক কন্যা সন্তান। হিন্দুধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সন্তান জন্ম নেয়ার ২১ দিনের মধ্যে নামকরণ করতে হয়। কিন্তু সেই নামকরণ অনুষ্ঠানটিও করা হয়নি স্মরণের। এছাড়াও আগামী মাসে তার বিদেশ যাওয়ার কথাও ছিলো। স্বপ্ন ছিলো বিদেশ গিয়ে টাকা উপার্জন করে একটু স্বাবলম্বী হবে। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেলো।
বাবার শ্রাদ্ধ করতে এসে জীবন প্রদীপ নিভলো দিপকের
প্রায় ৮-১০ বছর আগে পরিবারকে স্বচ্ছল করতে কাতার গিয়েছিলেন দিপক সুশীল। বাবা ডা. সুরেশ চন্দ্র সুশীলের অন্তোষ্টিক্রিয়া করতে না পারলেও শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করার জন্য দেশে ফিরেছেন ৬ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু বাবার শ্রাদ্ধ করতে এসে তার ছোট্ট সন্তানকেই করতে হচ্ছে বাবা দিপক সুশীলের শ্রাদ্ধ।
মৃত্যুর আগের দিন হামলা হয়েছিল ডা. সুরেশ চন্দ্র সুশীলের বাড়িতে
মৃত ডা. সুরেশ চন্দ্র সুশীলের স্ত্রী মৃণালিনী বালা সুশীল মানু বলেন, গত ২৯ জানুয়ারি সন্ধ্যার দিকে স্থানীয় কয়েকজন যুবকের সাথে আমার ছেলে চম্পক ও প্লাবনের সাথে কথাকাটা হয়। পরে অনুপম সুশীল এসে তাদের মধ্যে সমঝোতা করে দেয়। কিন্তু এই সমঝোতাও মানেনি ওই যুবকরা। ওইদিন রাতে ২০-৩০ জন যুবক এসে বাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। ঘরের টিনের তৈরি বেড়াও ভেঙ্গে দেয়। কিন্তু কারা সেই যুবক তাদের নাম প্রকাশ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, আমাদের হুমকি দেয়া হয়েছিলো এলাকা চেড়ে চলে যাওয়ার। আমরা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটিয়েছি।
এই ঘটনার সাথে গাড়িতে চাপা পড়ে সন্তানদের মৃত্যুর মধ্যে কোন ষড়যন্ত্র আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তা বুঝতে পারছিনা। তবে আমার সন্তানদের যারা হত্যা করেছে আমি তাদের সঠিক বিচার দাবি করছি।
মালুমঘাট হাইওয়ে থানার ইনচার্জ (ইন্সপেক্টর) শাফায়েত হোসেন বলেন, ঘাতক পিকআপটি জব্দ করা হয়েছে এবং ওই গাড়ির চালক-হেলপারকে আটক করতে সোর্স লাগানো হয়েছে। এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহতের ছোট ভাই প্লাবন সুশীল বাদি হয়ে চকরিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে।
মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে নিহতদের কাকা চিত্তরঞ্জন সুশীল বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে এখনও থানায় কোন এজাহার দেয়া হয়নি। আমার দুই ভাইপো ও এক ভাতিজি হাসপাতালের জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে। মামলার বিষয়ে আমরা অবগত না।
বুধবার দুপুরে নিহতদের বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জানান চকরিয়া-পেকুয়া (কক্সবাজার-১) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব জাফর আলম, চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেপি দেওয়ান, ডুলাহাজারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাসানুল ইসলাম আদর। এসময় চকরিয়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইউএনও জেপি দেওয়ান প্রত্যেক পরিবারকে ২৫ হাজার করে মোট ১ লাখ ২৫ টাকা নগদ অর্থ সহায়তা দিয়েছেন।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেপি দেওয়ান বলেন, ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগদ অর্থ সহায়তা দেয়া হয়েছে। আর ওই পিকআপের চালক-হেলপারকে আটক করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে বলা হয়েছে।
এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন কক্সবাজার জেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট দীপংকর বড়ুয়া পিন্টু, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক প্রিয়তোষ শর্মা চন্দন, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি উজ্জল কর, সাধারণ সম্পাদক বেন্টু দাশ, চকরিয়া উপজেলা ও পৌরসভা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ, চকরিয়া উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদ।
এটি কি নিছক দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।








