আচ্ছা ধরুন, আপনি খুব দামী একটি গাড়ি কিনে সেটার ছবি দিলেন ফেসবুকে। দিতেই সেটা দেখে একজন ছিনতাইকারী প্রলুব্ধ হলো, সে গাড়িটা ছিনতাই করলো। এখন ওই গাড়ি ছিনতাইকারী আপনার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন এই বলে যে আপনি তাকে গাড়িটি ছিনতাই করতে ইন্টারনেটে প্রলুব্ধ করেছেন, ব্যাস আপনি পড়ে গেলে আইসিটি আইনের আওতায়।
এভাবেই আইসিটি আইন ২০০৬ এর বিরক্তিকর দিকটি বর্ণনা করছিলেন ব্লগার ও সাংবাদিক আরিফ জেবতিক।
আইন দেশের নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য, সেই আইনের জন্য ভোগান্তির শিকার অনেক মানুষ। সাম্প্রতিক সময়ে এমনই একটি আলোচিত আইনের নাম তথ্যপ্রযুক্তি আইন। প্রবীর সিকদারের গ্রেপ্তারের ঘটনার পর অনেকে আইনটিই বাতিল করতে বলছেন। কেউ কেউ বলছেন, আইন নয়; অপপ্রয়োগ বন্ধ হওয়া জরুরি।
তাই এখন অনেকেরই প্রশ্ন: জনগণকে স্বস্তি দিতে আইন বাতিল করা প্রয়োজন নাকি আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধ করা দরকার?
এমন প্রশ্নে একমত সকলেই: দেশকে এবং দেশের মানুষকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য এবং দেশকে যে কোনো ধরণের অন্যায় থেকে রক্ষা করার জন্য আইনের প্রয়োজন। কিন্তু আইনের ব্যবহারের চেয়ে অপব্যবহার বেশি।
তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন থাকবে, আইন থাকতেই হবে; কিন্তু সেটার অপপ্রয়োগের বদলে সঠিক প্রয়োগ জরুরি।
এ বিষয়ে চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে কথা বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন।
বললেন, আইন বাতিল হওয়ার প্রশ্নই উঠে না। এখনকার মতো ইলেকট্রনিক ডকুমেন্ট, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, ডাটা সিস্টেম আগে ছিলো না। তাই তখন এসবের কোনো বৈধতারও প্রয়োজন ছিলো না। এখন যেহেতু তৈরি হয়েছে, তাই সেসব নিয়ন্ত্রণ করার মতো আইনও দরকার।
‘তবে আইন করার সময় মনে রাখতে হবে আইন যেনো সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয় এবং এই আইনে যেনো নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ণ না হয়। আইন সবসময় ভারসাম্যপূর্ণ হতে হবে,’ বলে মন্তব্য করেন সাংবাদিক থেকে আইনের শিক্ষক হওয়া হাফিজুর রহমান।
কথোপকথনে ২০১৩ সালের সংশোধনের কথাও তুলে আনেন তিনি। ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধন করে যে ৫৭(১) ধারা নিয়ে আসা হয় সেটা আরো অনেকখানি পরিবর্তন করা উচিত বলেই মনে করেন আইনের এ অধ্যাপক। কেননা, এই ধারাতে নাগরিক রক্ষাকবচ নেই।
‘সেখানে ওয়ারেন্ট ছাড়াই যে কাউকে গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছে, অপরাধটি অজামিনযোগ্য, আবার সাজা ধরা হয়েছে সর্বনিম্ন ৭ বছর আর সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড। এসব যেমন সাংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তেমনই নাগরিক রক্ষাকবচও নেই এতে। এসব সংশোধন করে, যে উদ্দেশ্যে আইনটি করা হয়েছে সেটাই যেন পরিপূর্ণ,’ করার পরামর্শ তার।
ব্লগার ও সাংবাদিক আরিফ জেবতিক জানালেন প্রথম দিককার প্রতিবাদের কথা। বললেন, প্রথম থেকেই আমরা বলছিলাম, আইনটি ধোঁয়াশাপূর্ণ।
‘এই আইনের অধীনে যে কেউ মামলা করে দিতে পারে। সাধারণত সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ মামলা করতে পারে না, কিন্তু এখন প্রবীর সিকদারের ক্ষেত্রে তো দেখা গেলো অন্য একজনের মামলাও আদালত নিয়েছেন এবং তারই পরিপ্রেক্ষিতে প্রবীর সিকদারকে জেল হাজতে নেওয়া হয়েছে,’ বলে মন্তব্য করেন এই ব্লগার-লেখক-সাংবাদিক।
আইনটি আরো বেশি স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি। তা না হলে তার আশংকা পুলিশের গ্রেপ্তার বাণিজ্য যেমন বাড়বে, পাশাপাশি বাড়বে আইনের অপব্যবহার।
এ বিষয়ে এক লাইনে নিজের মন্তব্য জানালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস।
‘আইনটি থাকা দরকার কিন্তু সেটার পরিবর্তনও দরকার,’ মন্তব্য করে তিনি যোগ করেন: ঢালাওভাবে আইনটির প্রয়োগ না করে কিছু বাধ্যবাধকতা দেওয়া উচিত। কোনো নাগরিক যেনো হয়রানির শিকার না হয় সেদিকেই নজর রাখতে হবে সবার আগে।
চ্যানেল আই অনলাইনকে রোবায়েত ফেরদৌস বলেন: প্রবীর সিকদার আইনের কাছে নিজের সুরক্ষা চেয়েছিলেন, কিন্তু তাকে সেটা না দিয়ে আইনগতভাবে আরো ক্ষতিগ্রস্থ করা হলো। তিনি সুরক্ষা চাইলেন আর তাকেই উল্টো ধরে নিয়ে যাওয়া হলো, এমনটা নিশ্চয়ই হওয়া উচিত না।
প্রায় একইরকম কথা বললেন বাংলাদেশ ফেডারেল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টস (বিএফইউজে) সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল।
‘আমরা প্রথম থেকেই এই আইনের বেশ কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলে আসছি। অামরা বলে আসছিলাম, এই আইনটির প্রয়োগ, প্রয়োগকারী এবং শাস্তির ক্ষেত্রে নানা ধরণের সমস্যা থাকতে পারে। আর সে সবই আরো ভোগান্তিতে ফেলতে পারে সাধারণ জনগণকে। তাই আইনটি পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনেক, এমনটাই ছিলো আমাদের বক্তব্য,’ বলে জানান তিনি।
সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত অভিযোগগুলো এখন সাইবার কোর্ট বা তদন্তের স্বার্থে পুলিশ কর্মকর্তার হাতে দেওয়া হচ্ছে না। সরাসরি গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হচ্ছে। সেজন্যই এই আইনের পুনরায় বিবেচনা করা দরকার। এভাবে চলতে থাকলে অপব্যবহার আরো বাড়তে থাকবে বলেও মনে করেন বিএফইউজে সভাপতি।
পুরো আইনটি বাতিল করার পক্ষপাতি না হলেও এর অপপ্রয়োগ বন্ধ করার ক্ষেত্রে আইন ও সাংবাদিকতার শিক্ষক, সাংবাদিক এবং ব্লগার সকলেই একমত।







