দুই বছর সাত মাসের এক দীর্ঘ যাত্রা। এরপর এসেছে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। কর্মক্ষেত্রে যোগ দিয়েছেন তারা। তারা ৩৫তম বিসিএসে’র মাধ্যমে চুড়ান্তভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা।
প্রায় আড়াইলাখ প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে সাফল্যের মালা গলায় পরেছেন।স্বপ্নের পথে এগিয়ে গেছেন অারও একধাপ। উৎফুল্ল এসব তরুণ কর্মকর্তার চোখে মুখে প্রশান্তির ছাপ, কণ্ঠে উচ্ছ্বাস।দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে তাদের। তারা এখন বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ সম্মানজনক চাকুরিতে আসীন।
তবে দীর্ঘ এ পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। বিসিএসের দীর্ঘসূত্রতাসহ হয়েছেন নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন। সব বাধাকে জয় করে তারা আজ সফল। কিন্তু কেমন ছিল তাদের এই দীর্ঘযাত্রাটা? চাকুরির প্রথম দিনের অভিজ্ঞতাই বা কেমন? চ্যানেল অা্ই অনলাইনকে বিস্তারিত জানিয়েছেন তারা ।
ইমদাদুল হক তালুকদার প্লাবন
৩৫ তম বিসিএসের মাধ্যমে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে মনোনীতদের একজন। স্নাতক করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগ থেকে। এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য পাড়ি জমান ফিনল্যান্ডে। সেখানে উচ্চ শিক্ষার পাশাপাশি এসে অংশ নেন বিসিএস প্রিলিমিনাররি, লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষায়।
তারও আগে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ার সময়ই বিয়ে করেন তিনি। জীবনে সংগ্রামটা মূলত তখন থেকেই শুরু।
আবার স্নাতক পাশের পর বিদেশ পাড়ি জমালে তা নিয়েও পরিবারের মাঝে দেখা যায় অসন্তোষ। এর মাঝেই বিসিএস দেন ইমদাদুল হক তালুকদার প্লাবন।
‘আশপাশের ছোট ভাই, বন্ধুবান্ধব অনেকেই সেসময় প্রতিষ্ঠিত। আর আমি ছিলাম বিদেশে পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। সেসময় সবার মধ্যে একটা বদ্ধমূল ধারণা দেখতে পেতাম যাদের কিছু হয় না তারাই বিদেশে যায়।’
তিনি বলেন: অন্য দেশে যারা থাকে তাদের সমপরিমাণ অর্থ পাঠাতে পারতাম না দেশে, আর তাই বঞ্চনাবোধ করতাম। অনেক কথা শুনতে হয়েছে অামাকে। এর মাঝে যখন বিসিএসে অংশ নেই তখন লোকে আমাকে বলেছে, পাগল নাকি!
কিন্তু বিসিএস পরীক্ষার একটি ফলই বদলে দেয় প্লাবনের জীবন। আশপাশের সব মানুষগুলোর রাতারাতি পরিবর্তন অবাক করে প্লাবনকে। সব জায়গায় হাসিমুখ আর উষ্ণ অভ্যর্থনা।
‘মানুষ কিভাবে নিজের ভেল পরিবর্তন করতে পারে তা অামি খুব কাছ থেকে দেখেছি।’
বিদেশে থেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও প্লাবনের মনটা সবসময়ই পড়ে থাকত প্রিয় মাতৃভূমিতে। ভেতর থেকে সবসময়ই দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কিছু করার তাড়না অনুভব করতেন। তাই বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে প্রশাসন ক্যাডারে সফল হওয়া এই কর্মকর্তার উদ্দেশ্য এখন একটাই: দেশের মানুষের সেবা করা।
হাসান মুহাম্মদ মুহতারিম সজীব
৩৫ তম বিসিএসের মাধ্যমে পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাসান মুহাম্মদ মুহতারিম সজীব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপলায়েড ফিজিক্স থেকে স্নাতক্ এবং আইবিএ থেকে স্নাতকোত্তর করা মেধাবী এই তরুণ একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে উচ্চ বেতনে কর্মরত ছিলেন। স্বাচ্ছন্দ্য, সুখ, স্বচ্ছলতা সবই ছিল সজীবের জীবনে। তবুও সব কিছু ছেড়ে কেন তার এই প্রত্যাবর্তন?
উত্তরটা মেলে সজীবের কাছ থেকেই: যেখানে চাকুরি করতাম সেখানে অনেক সম্মান ছিল, অর্থ ছিল। কিন্তু যা ছিল না তা হল আমার মানসিক প্রশান্তি। চাকুরি শেষে যখন বাসায় ফিরতাম তখন অনেক বেশি হতাশ লাগত। সবকিছু্ মনে হত অর্থহীন। মনে হত আমি আমার দেশ, জাতি , সমাজের জন্য কিছু করছি না। দেশের কোনকিছুতেই রাখতে পারছি না অবদান।
এরইমধ্যে তার বন্ধুরা বিসিএস দিয়ে অনেকে অনেক উচ্চ পর্যায়ে চলে গেছেন। ৩০তম বিসিএসে সফল হয়েছেন তার বন্ধু ও সহপাঠীদের অনেকেই। তাই কিছুটা সময় নিয়ে দেরি করে হলেও নিজের মেধা ও শ্রম দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য নিবেদিত করার সুযোগ পেয়ে সন্তুষ্ট পুলিশের এই নতুন কর্মকর্তা।
সিফাত মোহাম্মদ ইশতিয়াক ভূঁইয়া
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ছিলেন সিফাত মোহাম্মদ ইশতিয়াক ভূঁইয়া। নিয়োগও পেয়েছেন বিসিএস ইকোনোমিক ক্যাডারে। নিজের পঠিত বিষয় আর চাকুরিটা এক হওয়ায় নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করছেন ইকোনমিক ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্ত এ কর্মকর্তা।
এটাই ছিল সিফাতের প্রথম বিসিএস। তবে এই দীর্ঘ যাত্রায় অনেক প্রতিকূলতা অতিক্রম করতে হয়েছে সিফাতকে।
মাস্টার্স শেষ করেন ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে। বাবা মারা যান ২০১৫’র জানুয়ারিতে। আর বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় মার্চে।
বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই যেকোন একটা চাকুরিতে যোগ দেয়ার চাপ আসতে থাকে চারপাশ থেকে। সেসময় অনেকের অনেক কটু কথা শুনতে হয়েছে। তবে সবার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, নিজের প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে চালিয়ে গেছেন পড়াশোনা।
লিখিত পরীক্ষার পরপর যোগ দেন এফবিসিসিআইয়ে। হাল ধরেন সংসারের। কিছুদিন আগেও কর্মরত ছিলেন সেখানে।
দুই বছর সাত মাসের দীর্ঘ পথটা অনেক কষ্টকর ছিল সিফাতের। তবে সব কষ্টের অবসান হয়েছে এখন। যোগ দিয়েছেন প্ল্যানিং কমিশনে।
প্রথম বিসিএস, ঢাকায় পোস্টিং, প্রিয়জনদের হাসিমাখা মুখ, সবার ভালবাসায় দারুণ এক সময় কাটছে এই তরুণ কর্মকর্তার।








