দক্ষিণ হাওয়া, ধানমণ্ডি। দুপুর বেলা। প্রচণ্ড গরম পড়ছে। হুমায়ূন আহমেদের বাসায় চেক বই নিয়ে একটি ব্যাংকের কেরানি এসেছেন। ঘামে তার সারা গা ভিজে জবুথবু। মাঝে মাঝেই কেরানি লোকটিকে ভিআইপি অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের বাসায় চেক বই নিয়ে যেতে হয়।
দক্ষিণ হাওয়ার দরজা খোলাই ছিল। বেল বাজাতেই গোলগাল, চশমা পরা এক ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। খালি গা, লুঙি পরা ভদ্রলোককে দেখে কেরানি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন। কেমন যেনো চেনা চেনা লাগছে। স্যার সাইন করলেন। চেক বই বুঝে নিলেন। এই ফাঁকে কেরানি জিজ্ঞেস করলেন, স্যার কিছু মনে করবেন না। আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি মনে হয়? নাটকে অভিনয় করেন? স্যারের ঠোঁটে রহস্যের হাসি। উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করলেন, দুপুরে খেয়েছেন? কেরানি তখনো বিহবলতা কাটাতে পারেনি। ঘোরের মধ্যে ‘হ্যাঁ স্যার, খেয়েছি’ বলতে গিয়ে বলে ফেলল, ‘না স্যার। খাইনি।’ ভদ্রলোক বললেন, চলেন। একসাথে খাব।
তিনি ডেকে ঘরের ভেতরে বসালেন। ঠাণ্ডা পানি দিতে বললেন। কেরানি লোকটি ঘোর থেকে বের হতে পারছেন না। কত ভিআইপির বাসায় গেলেন এই জীবনে। কেউ এত আপন ভাবে জিজ্ঞেস করেনি, দুপুরে খেয়েছেন?
‘চলেন, আমিও খাইনি। এক সাথে খাওয়া যাক,’ বলে বাসার ভেতর হাঁটা ধরলেন স্যার। কেরানির মনে হল তিনি ভুল শুনছেন। তাকে চলে যেতে বলেছেন। অথচ তিনি শুনেছেন খেতে ডাকছেন। বেশি গরমে এমন হয়। কান শোনে এক, মাথায় সিগন্যাল দেয় আরেক। কেরানি লোকটি দরজার দিকে হাঁটা ধরবেন, ঠিক তখনই স্যারের স্ত্রী পেছন থেকে ডাক দিলেন। কী হলো, আসুন। আপনার স্যার টেবিলে বসে পড়েছেন।
খাবার টেবিলে গিয়ে আরেক দফা ধাক্কা খেলেন কেরানি। আরে! স্যারের স্ত্রীকেও তো চেনা চেনা মনে হচ্ছে। টিভিতেই দেখেছেন। আজ হচ্ছেটা কী তার? সবাইকে চেনা চেনা লাগে অথচ কাউকেই চিনে উঠতে পারছেন না? ভাবতে ভাবতে হাত ধুয়ে খেতে বসে গেলেন ব্যাংকের কেরানি।
স্যারের স্ত্রীর আচরণে মনে হল তার স্বামীর সঙ্গে যে কেউ একজন খেতে বসবে এটা আগেই জানা ছিলো। হয়তো এই সময় এ বাড়িতে এসে কেউ না খেয়ে যায় না মনে হয়।
চাকা চাকা বেগুন ভাজি থেকে ঘিয়ের মৌ মৌ ঘ্রাণ বেরুচ্ছে। সঙ্গে ঢাউস সাইজের পাবদা মাছ। এতবড় পাবদা কেরানি জীবনে দেখেননি। মাঝারি আকারের বোয়াল মাছের মতো।
খাবার টেবিলের এক কোনায় তিনটা বই। একটায় লেখা ‘নির্বাচিত সায়েন্স ফিকশন’। তারপর চশমা পরা স্যারের ছবি। নিচে লেখা হুমায়ূন আহমেদ। কেরানি লোকটা এবার চিনতে পারলেন। তার সামনে বসে বেগুন ভাজি চটকে ভাতের সাথে মাখছেন যিনি, তার নাম হুমায়ূন আহমেদ।
হুমায়ুন আহমেদকে চেনার পর আরও ঘোরের মধ্যে চলে যান কেরানি। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। তার প্লেটের পাবদাটা শেষ হতেই চোখ বড় করে তাকালেন তরকারির বাটিতে থাকা পাবদা মাছের দিকে। লাজ শরমের মাথা খেয়ে বলে বসলেন- স্যার আমি আরেকটা মাছ নিই?
স্যার আরেকটা মাছ তুলে দিলেন কেরানির পাতে। কেরানি ঘোরের মধ্যে না থাকলে বুঝতে পারতেন তিনটা পাবদা থেকে তিনি দুটো খেয়ে নিয়েছেন। স্যার আর তার স্ত্রী একটা পাবদা ভাগ করে খাচ্ছেন। হুমায়ূন আহমেদ যে নিজে খাওয়ার চেয়ে অন্যকে খাইয়ে আনন্দ পেতেন।
(গত বছরের ৪ জুলাই মাসে মেহের আফরোজ শাওনের মুখে শোনা ঘটনাটি আমার মত করে লিখেছি। কিছু ত্রুটি থাকলে মার্জনা করবেন।)








