অর্জনে বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল কোচ হলেও তাকে নিয়ে বিতর্কের অন্ত ছিল না। চন্ডিকা হাথুরুসিংহেকে ঘিরে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ ছিল শুরু থেকেই। একের পর এক বিতর্কের রেশ ধরে মোটাদাগে সামনে এসেছে ভারতে ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়ে ক্রিকেটার নাসুম আহমেদের সঙ্গে অসদাচরণের বিষয়টি।
যে কারণে সফল কোচের ট্যাগ থাকার পরও তাকে বরখাস্ত করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। সেটি তার চুক্তির মেয়াদ পূর্তির আগেই। নানা অভিযোগ থাকার পরও হাথুরুর ব্যাপারে কঠোর হতে পারেনি নাজমুল হাসান পাপনের অধীনে থাকা আগের কমিটি। ফারুক আহমেদ বিসিবি সভাপতির দায়িত্ব পাওয়ার দুমাস পেরোতেই নিয়েছেন কঠিন সিদ্ধান্ত।
পাকিস্তানের মাটিতে প্রথমবার জয়ের ইতিহাস যে কোচের অধীনে গড়েছে বাংলাদেশ, সে কোচই একমাসের ব্যবধানে চাকরি হারালেন! ২৪ ঘণ্টা না যেতে নতুন কোচ হিসেবে ফিল সিমন্স মিরপুরে এসে কাজও শুরু করে দিয়েছেন।
তাতে সহজে অনুমেয়, হাথুরুহিংহেকে না রাখার সিদ্ধান্ত আগেই নিয়েছিল বিসিবি। ভেতরে ভেতরে কোচ খোঁজার কাজ চলছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক ক্রিকেটারকে ৬ মাসের জন্য কোচ হিসেবে পাওয়ার সবুজ সংকেত পেতেই বিসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে হাথুরুর ব্যাপারে সিদ্ধান্তের কথা সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দিয়েছে।
গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডেও পরিবর্তন আসে। ফারুক আহমেদ বিসিবি সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে ইঙ্গিত মিলছিল হাথুরুর বিদায় সময়ের ব্যাপার মাত্র। দায়িত্ব নিয়ে ফারুক বলেছিলেন, হাথুরুসিংহে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে নতুন কিছু দিতে পারবেন কী না সেটি নিয়ে তার সংশয় আছে।
যে অভিযোগে হাথুরুকে বিদায় নিতে হচ্ছে সেগুলো বেশ গুরুতর। বিশ্বকাপ চলাকালীন জাতীয় দলের এক ক্রিকেটারের গায়ে হাত তোলা, চুক্তির বাইরে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে ছুটি নেয়া এবং দলের ভেতরে নানা ধরনের গ্রুপিং তৈরির অভিযোগ।
সংবাদ সম্মেলনে ফারুক আহমেদ বলেছেন, ‘ফিজিক্যাল অ্যাসল্ট কোনভাবেই একটা ন্যাশনাল প্লেয়ারকে আপনি করতে পারবেন না। এটার শাস্তি এখন হচ্ছে। এটাই হওয়া উচিত ছিল আগে।’
তিনি দাবি করেন, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড় এবং প্রত্যক্ষদর্শীর সাথে কথা বলেছেন। বিসিবি সভাপতি বলেন, ‘দুই-তিনটা ঘটনা ঘটেছে সেটা পীড়াদায়ক ছিল আমার জন্য। এসব ঘটনা টিমের জন্য ভালো উদাহরণ ছিল না।’
এসব বিষয় বিবেচনা করে হাথুরুকে শোকজ নোটিস এবং সাময়িক বরখাস্তের নোটিশ দেয়া হয়। তিনি দুদফায় বাংলাদেশের কোচ ছিলেন। প্রথম দফায় ২০১৫ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় দফায় আবার কোচ হিসেবে ফিরে আসেন ২০২৩ সালে।
‘কড়া হেডমাস্টার’ হিসেবে দেখা খেলোয়াড়দের অনেকেই মিডিয়ায় জানান, নতুন করে ফেরা হাথুরুসিংহে আগের মতো নেই। তবে কতটা নিজেকে পরিবর্তন আসলে করতে পেরেছেন এই লঙ্কান তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। বড় বড় জয়ে যিনি মাস্টারপ্ল্যান দিয়েছেন সেই কোচ বাংলাদেশ থেকে যখন অভিযোগের প্রেক্ষিতে বরখাস্ত হয়ে ফেরত যাচ্ছেন, যা মোটেও ক্রিকেটের জন্য ভালো উদাহরণ নয়।
বাংলাদেশ এপর্যন্ত ওয়ানডে জিতেছে ১৫৯টি। হাথুরুসিংহের অধীনে জিতেছে ৩৫টি, ডেভ হোয়াটমোরের অধীনে ৩২টি, জেমি সিডন্সের ৩১, ডোমিঙ্গো ২১ ও স্টিভ রোডসের অধীনে ১৭টি।
টেস্টেও হাথুরুর অধীনে এগিয়ে বাংলাদেশ। তার অধীনে দুই মেয়াদে ৩১ টেস্টে ১১ জয়, ১৬ হার ও ৪টি ড্র করেছে দল। ডোমিঙ্গো ও রোডসের অধীনে সর্বোচ্চ ৩টি করে টেস্ট জিতেছিল বাংলাদেশ।
হাথুরুর দ্বিতীয় মেয়াদে ১০টি টেস্ট খেল ৫টিতে হার ও ৫টিতে জয় পেয়েছে দল। নিউজিল্যান্ডকে প্রথমবারের মতো হারিয়েছে টেস্টে। পাকিস্তানের মাঠে এবং তাদের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো টেস্ট সিরিজ জয় ছিল অসাধারণ অর্জন। এছাড়া নিউজিল্যান্ডের মাঠে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে ও টি-টুয়েন্টি জয়ের কীর্তি গড়ে বাংলাদেশ দল।
হাথুরু কোচ থাকার সময় ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠে। একই বছর বাংলাদেশ হোম সিরিজ জিতেছিল ভারত, পাকিস্তান ও সাউথ আফ্রিকার সাথে। ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলেছিল। টেস্টে মিরপুরে ইংল্যান্ডকে হারিয়েছিল তিন দিনের মধ্যে।
হাথুরুর সঙ্গে বাংলাদেশের আরও একবার বিচ্ছেদ হলেও এই দেশের ক্রিকেট শ্রীলঙ্কান কোচকে মনে রাখবে। দলের মধ্যে কর্তৃত্ব, প্রভাব খাটানো, সিনিয়র খেলোয়াড়দের যথার্থ মূল্যায়ন না করা, দলে বিভাজন তৈরি ও আচরণগত সমস্যা নিয়ে খেলোয়াড়-কোচ, টিম ম্যানেজমেন্টের কেউ কেউ বিভিন্ন সময় কথা বলেছেন। তাকে ‘ভিলেন’ হিসেবে দেখতেন অনেকে। মিডিয়ায় মুখ না খুললেও ‘অফ দ্য রেকর্ড’ তাকে ঘিরে সমালোচনাই বেশি করতেন ক্রিকেটাররা।
দল নির্বাচনে হস্তক্ষেপের কারণে হাথুরুর প্রথম মেয়াদে বর্তমান বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদ পদত্যাগ করেছিলেন প্রধান নির্বাচক পদ থেকে। সেই ফারুকের সভাপতির মেয়াদে এবার বিদায় নিতে হল তাকে। বিসিবি সভাপতি হিসেবে ফারুক দুমাস অতিবাহিত করলেও হাথুরুর সঙ্গে দেখা হয়নি তার।








