বহুল আলোচিত তিন বছর আগে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলায় যেসব দেশের নাগরিকরা নিহত হয়েছিলেন, ওই সব দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তারা রায় শুনতে আসবেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আইনজীবীরা আশা করছেন, আট আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিবেন বিচারক। রায়কে ঘিরে মঙ্গলবার থেকেই আদালত চত্বরে নেয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
জানা যায় জাপানসহ কয়েকটি দেশের দূতাবাসের প্রতিনিধি রায় দেখতে এজলাসে উপস্থিত থাকবেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের অর্থায়নে পরিচালিত ন্যাশনাল সেন্টার ফর স্টেট কোর্টের প্রতিনিধি হিসেবে আবু ওবায়দুর রহমান টগর, তৌফিকুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম রায় পর্যবেক্ষণে এজলাসে থাকবেন।
ঢাকা মহানগর অপরাধ, তথ্য ও প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-কমিশনার জাফর হোসেন বলেন: যে আদালতে রায় হবে, সেখানে দিনের প্রথমভাগে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৩ এর বিচারক বসেন এবং দ্বিতীয় ভাগে সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক বসেন।
বুধবার ঢাকার সন্ত্রাস দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান এই রায় ঘোষণা করবেন।
মঙ্গলবার দুপুরে পুরান ঢাকার আদালত পাড়া পরিদর্শন করেন ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মীর রেজাউল আলম ও কৃষ্ণ পদ রায়।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. জসিম উদ্দিন বলেন: মহানগর দায়রা জজ আদালত বুধবার মামলাটির রায় ঘোষণা করবে। রায় ঘিরে আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার থাকবে।
আলোচিত এই মামলায় এখন পর্যন্ত ঘটনা সম্পর্কে জানেন কিংবা ঘটনা দেখেছেন, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জানেন-এরকম ১১৩ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে।
এদের মধ্যে ১৭ জন সাক্ষী ঘটনার দিন হলি আর্টিজানের ভেতর অবস্থান করছিলেন। তাদেরকে কমান্ডো বাহিনী, পুলিশ ও র্যাব জীবিত উদ্ধার করে। রায় ঘোষণার দিন ধার্য করার আগে এ মামলার ৭৫টি আলামত আদালত পর্যবেক্ষণ করে।
সন্ত্রাস দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর গোলাম সারোয়ার খান জাকির বলেন: সাক্ষ্য প্রমাণে প্রমাণ করতে পেরেছি যে আসামিরা অপরাধী। আশা করছি আট আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিবেন বিচারক।
ঘটনার তারিখ ও সময়ঃ ২০১৬ সালের ১ জুলাই, রাত ৮:৪৫ মিনিট।
ঘটনাস্থলঃ গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি।
বাদীঃ ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রিপন কুমার দাস।
মামলা নং ও তারিখঃ গুলশান মডেল থানার মামলা নং ১, ২০১৬ সালের ৪ জুলাই।
ধারাঃ ২০০৯ সালের সস্ত্রাস বিরোধী (সংশোধনী/২০১৩) আইনের ৬(২)/৮/৯/১০/১১/১২/১৩ ধারা।
তদন্তকারী সংস্থাঃ কাউন্টার টেররিজম এন্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম, ডিএমপি।
মোট অভিযুক্তঃ ২১ জন (ঘটনাস্থলে নিহত-৫ জন, বিভিন্ন সময়ে অভিযানে নিহত-৮ জন, জীবিত-৮ জন)।
মোট সাক্ষীঃ ২১১ জন (এর মধ্যে ১৭ জন ভিকটিম সাক্ষী)।
মোট আহতঃ ৩৬ জন (৩০ জন পুলিশ সদস্য, ১ জন আনসার, ৫ জন সিভিল)।
মোট নিহতঃ ২২ জন (২ জন পুলিশ অফিসার, ৯ জন ইটালিয়ান, ৭ জন জাপানিজ, ১ জন ভারতীয় ও ৩ জন বাংলাদেশী)।
জঙ্গি নিহতঃ ১৩ জন ( ঘটনাস্থলে ৫ জন)।
উদ্ধারঃ ৯ এমএম পিস্তল-৫ টি, একে ২২ মেশিনগান-৩ টি, একে ২২ মেশিন গানের ম্যাগাজিন-৭ টি এবং গুলি
মোট আলামতঃ ৭৫ টি।
এজাহারের সংক্ষিপ্ত বিবরণ
মামলার বাদী এসআই রিপন কুমার দাস ২০১৬ সালের পহেলা জুলাই সকাল ৯ টা থেকে গুলশান থানাধীন রোড নং-৭১ হতে ৯২ এবং এর আশপাশ এলাকায় সরকারি গাড়িযোগে পেট্রোল ডিউটিরত অবস্থায় রাত অনুমান ৮:৪৫ মিনিটে ওয়াকিটকির মাধ্যমে জানতে পারেন যে, গুলশানস্থ ৭৯ নং রোডের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বেকারিতে গোলাগুলি হচ্ছে। সংবাদ জেনে তিনি সঙ্গে ফোর্সসহ রাত আনুমানিক ৮:৫০ মিনিটে রেস্টুরেন্টের কাছে উপস্থিত হয়ে দেখতে পান যে, রেস্টুরেন্টের ভেতরে কতিপয় সন্ত্রাসী ‘আল্লাহ্ আকবর’ ধ্বনি দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণ ও বোমা নিক্ষেপ করছে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সন্ত্রাসীরা তাদের উপর বোমা নিক্ষেপ ও এলোপাথাড়ি গুলি বর্ষণ করতে থাকে। আত্মরক্ষার্থে তারা পাল্টা গুলি চালায়। এক পর্যায়ে সন্ত্রাসীদের নিক্ষিপ্ত গুলি ও গ্রেনেডের আঘাতে এসআই ফারুক হোসেন ও তার সঙ্গে থাকা কনস্টেবল প্রদীপ চন্দ্র দাস ও আলমগীর হোসেন মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হয়। আহতদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো।
এসআই রিপন কুমার দাস তাৎক্ষণিক উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেন। যার প্রেক্ষিতে তৎকালীন পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়াসহ ডিএমপি’র সংশ্লিষ্ট সকল অফিসার ও ফোর্স ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হয় এবং হলি আর্টিজান বেকারি চারপাশ কর্ডন করে ফেলে। অফিসার ও ফোর্স সন্ত্রাসীদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলে সন্ত্রাসীরা তাদেরকে লক্ষ্য করে অনবরত গ্রেনেড ও গুলি বর্ষণ করতে থাকে। রাত অনুমান ১০:৩০ মিনিটে সন্ত্রাসীরা হলি আর্টিজানের বেকারির পশ্চিম দিকের ৭৯ নং রোডের ২০ নং বাড়ির সামনে অবস্থানরত পুলিশ অফিসার ও ফোর্সদের লক্ষ্য করে গ্রেনেড নিক্ষেপ ও গুলি বর্ষণ শুরু করে। ফলে ৩০-৩৫ জন পুলিশ অফিসার ও ফোর্স আহত হয়। আহতদের মধ্যে কেউ কেউ মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হয়। আহতদের সবাইকে চিকিৎসার জন্য ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত অনুমান ১১:২০ টা সময় বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সালাহউদ্দিন খান মৃত্যুবরণ করেন। এর কিছুক্ষণ পরই ডিবির সহকারী পুলিশ কমিশনার মোঃ রবিউল করিম মৃত্যুবরণ করেন।
ইতোমধ্যে তৎকালীন বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে পরদিন সকালে আনুমানিক ৭:৪০ মিনিটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন জিম্মিদের উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করার লক্ষ্যে অভিযান পরিচালনা করে। অভিযান চলাকালীন সন্ত্রাসীরা কমান্ডো বাহিনীর উপর হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ ও গুলি বর্ষণের মাধ্যমে পাল্টা আক্রমণ করে। অভিযানকালে ৬ জন নিহত হয়। নিহতরা হলো- ১। মীর সামহ মোবাশ্বের (১৯), ২। রোহান ইমতিয়াজ (২০), ৩। নিরবাস ইসলাম (২০), ৪। মোঃ খায়রুল ইসলাম পায়েল (২২), ৫। মোঃ শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ওরফে বিকাশ (২৬) ও ৬। সাইফুল চৌকিদার।
এক পর্যায়ে প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ান তাদের সফল অভিযান সম্পন্ন করে। তারা দেশী বিদেশী মোট ১৩ জন জিম্মিকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। উল্লেখ্য যে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ২ জন বিদেশী নাগরিকসহ ১৯ জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে। জিম্মি থাকাবস্থায় সন্ত্রাসী দ্বারা নৃশংসভাবে নিহত হওয়া ৯ জন ইতালিয়ান, ৭ জন জাপানিজ এবং ১ জন ভারতীয় এবং ৩ জন বাংলাদেশী (৩ জন বাংলাদেশীর মধ্যে ০১ জন বাংলাদেশ-আমেরিকান নাগরিক) নাগরিকদের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।
প্যারা কমান্ডো বাহিনীর অভিযানকালে ৬ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী নিহত হয়। জিম্মির সময়ে সন্ত্রাসীদের দ্বারা নিহত দেশী বিদেশী ২০ জনের মৃতদেহ এবং ৬ জন সন্ত্রাসীর মৃতদেহ উদ্ধার করে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, ঢাকায় পাঠানো হয়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মৃতদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরী করা হয়।
সিআইডি ক্রাইম সিন বিভাগের সহায়তায় গুলশান থানার এসআই রিপন কুমার দাস, এসআই মফিদুল ইসলাম, এসআই জয়নাল আবেদীন, এসআই হুমায়ুন কবির ঘটনাস্থল থেকে সন্ত্রাসীদের ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক দ্রব্যাদিসহ অন্যান্য উপাদানাবলি ও ভিকটিমদের ব্যক্তিগত মালামাল সাক্ষীদের মোকাবেলায় জব্দ করে নিজ হেফাজতে নেন।
উল্লেখিত সন্ত্রাসীরা গত পহেলা জুলাই রাত থেকে পরদিন সকাল ৭:৪০ পর্যন্ত অর্ধ শতাধিক দেশী বিদেশী নিরীহ মানুষকে জিম্মি করে। ২০ জন দেশী বিদেশী নাগরিককে গুলি করে ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে এবং ২ জন পুলিশ অফিসারকে গ্রেনেড ছুঁড়ে হত্যা করে।
তদন্ত
দীর্ঘ দুই বছরের তদন্তে অত্র ঘটনার সাথে ২১ জনের জড়িত থাকার তথ্য প্রমাণ পেয়েছে সিটিটিসি’র তদন্তকারী কর্মকর্তা। যার মধ্যে ৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত ৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট। ঘটনার সময় অভিযান চলাকালে ৫ জন এবং বিভিন্ন সময় অভিযানে ৮ জন নিহত হয়।
গ্রেপ্তার ৮ জন
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী ওরফে সুভাষ ওরফে শান্ত ওরফে টাইগার ওরফে আদিল ওরফে জাহিদ (৩২), মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান (৬০), রাফিউল ইসলাম ওরফে রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান (২২), মো. আব্দুস সবুর খান ওরফে হাসান ওরফে হাতকাটা সোহেল মাহফুজ ওরফে মুসাফির ওরফে জয় ওরফে নসুরুল্লাহ (৩৩), হাদিসুর রহমান সাগর, মো. আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ ইসলাম ওরফে আবু জাররা ওরফে র্যাশ (২০),শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ (২৫), মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন (৩০)।
ঘটনার সময় নিহত
রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামহ মোবাশ্বের, নিরবাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম উজ্জল ওরফে বিকাশ, খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল।
বিভিন্ন সময় অভিযানে নিহত
তামিম চৌধুরী, সারোয়ার জাহান ওরফে আব্দুর রহমান, তানভীর কাদেরী ওরফে জামসেদ ওরফে আবদুল করিম, নুরুল ইসলাম মারজান, বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট, মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান, মেজর (অবঃ) জাহিদুল ইসলাম ওরফে জাহিদ ওরফে মেজর মুরাদ, রায়হান ওরফে রায়াহানুল কবির ওরফে ফারুক ওরফে তারেক।








