গুলশানের অভিজাত হলি আর্টিজান বেকারিতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে আকস্মিকতায় ভীত ও হতবিহ্বল প্রত্যক্ষদর্শীরা এখনো ভয়ার্ত ও শোকগ্রস্ত। চ্যানেল আই অনলাইনকে তারা বলেছেন সেই রাতের বিভীষিকাময় ১২ ঘন্টার কথা।
১ জুলাই ২০১৬ শুক্রবার। রমজানের ঈদকে ঘিরে যখন ঢাকার রাস্তার উৎসবের প্রস্তুতির ব্যস্ততা, ঠিক তখনই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ঘটে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। রাত ৯টার দিকে একদল অস্ত্রধারীরা বেকারিতে হামলা চালালে অবস্থানরত অজ্ঞাত সংখ্যক অতিথি সেখানে আটকা পড়েন৷ জিম্মী করা হয় হলি আর্টিজানের প্রায় ৩৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারিদের। এদের কেউ কেউ বাথরুম, কিচেনসহ বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে থাকায় প্রাণে বেঁচে যায়।
হলি আর্টিজানের ভয়াবহ হামলা প্রত্যক্ষ করেছেন সমীর বাড়ৈ। তিনি বলেন, বিভীষিকাময় একটি রাত পার করেছিলাম, ওই রাতের ভয়াবহ স্মৃতি এখনো আমায় তাড়া করে। আমিসহ হোটেলের আট নয়জন কর্মচারী বাথরুমে লুকিয়ে ছিলাম, পরে জঙ্গিরা আমাদের হত্যা করবে না এমন আশ্বাস দিলে আমরা বের হয়ে আসি।বেরিয়ে আসতেই সামনের মেঝেতে দেখি পাঁচ থেকে সাতটা লাশ। পরে হোটেলের বিভিন্ন জায়গায় দেখি লাশ আর লাশ।বোধহয় গুলি আর কুপিয়ে তাদের হত্যা করা হয়েছিল।
জঙ্গিরা ওই রাতে ২০ জনকে হত্যা করে, যাদের নয়জন ইটালির নাগরিক, সাতজন জাপানি, তিনজন বাংলাদেশী এবং একজন ভারতীয়। এ ছাড়া সন্ত্রাসীদের হামলায় দুজন পুলিশ কর্মকর্তাও প্রাণ হারান।জঙ্গিদের গুলি ও বোমায় আহত হন পুলিশের অনেকে।
সমীর বাড়ৈ আরও বলেন, আসলে ঘটনার সময় উপস্থিত থাকায় বুঝতে পারি জঙ্গিদের মূল লক্ষ্য ছিল বিদেশীদের হত্যা করা। অথচ কাষ্টমার হয়ে আসা জঙ্গিদের দেখে বোঝার উপায় ছিল না, তারা এরকম হত্যাযজ্ঞ ঘটাবে। তারা শেষরাতে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশীদের সেহেরি করায়। এরপর আবার আমাদের ছোট্ট একটা বাথরুমে তালাবদ্ধ করে আটকে রাখে। যেখানে একটা পর্যায়ে আমাদের সবার নিঃশ্বাস নিতেও সমস্যা হচ্ছিল।
সমীর বাড়ৈ আরো বলেন, সকালে দিকে জঙ্গিরা টের পায় তাদের রেহাই নেই। তারা বলেছিল, আমরা চলে যাচ্ছি। দেখা হবে বেহেস্তে। এরপর তারা দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তখনই সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা হলি আর্টিজানে অভিযান চালায়।
পরদিন সকালে সেনা কমান্ডোদের অভিযানে পাঁচ জঙ্গিসহ ছয়জন নিহত হয়। উদ্ধার হন ৩ বিদেশিসহ ১৩ জন।
হলি আর্টিজানে ওইরাতে আটকে থাকা আরেকজন আকাশ খান, তার অভিজ্ঞতাও প্রায় একইরকম। চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন, ঐ দিন সারা রাতই আমাদের জন্য খুব ভয়াবহ ছিল। এখনও ঘুমের ঘোরে সেই রাতের ভয়াবহ স্মৃতির কথা মনে পড়লে আমি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ি।
ঢাকায় বসবাসরত বিদেশি নাগরিক ও পর্যটকদের জন্য নিশ্ছিদ্র এবং নিরাপদ আনন্দের জায়গা ছিল গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি। রেস্টুরেন্টটির মূল প্রবেশদ্বার একটি। প্রবেশের পর একদিকে চমৎকার খোলা জায়গা আর সোজা গেলে বেকারি। কোলাহলপূর্ণ ঢাকার গুলশানে নিরিবিলি পরিবেশে হলি আর্টিজান অত্যন্ত মনোরম।অথচ এমন পরিবেশে সেখানে জঙ্গি আক্রমণ হবে তা কখনোই চিন্তা করে নি কেউ। ওই নারকীয় হামলার পরে আবার ঘুরে দাড়িয়েছে।
বর্তমানের নতুন হলি আর্টিজানের ইনচার্জ শাহরিয়ার আহমেদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, প্রথম তিন-চার মাস ভয়ে ছিলাম। যখন আবার কাজে যোগ দেই তখন আমাদের যে পুরাতন কাস্টমার ছিল, তারা আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়।
হলি আর্টিজানের ইনচার্জ শাহরিয়ার আহমেদ বলেন: আর্টিজানের প্রাকৃতিক পরিবেশ অত্যন্ত মনোরম। ছাদ থেকেই উপভোগ করা যেত গুলশান লেকের প্রাকৃতিক দৃশ্য। এই রেস্টুরেন্টে ঢুকতেই গেটের দুই পাশে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের গাছ-গাছড়া। ভিতরে একই পরিবেশ। এসব কারণেই ব্যস্ত জীবনের প্রশান্তির কিছু সময় কাটাতে বিদেশিরা হলি আর্টিজানে যেতেন।







