স্বাধীনতা দিবস! শতাংশের হিসাবে হয়তো পাঁচ-দশ, বা তার চেয়ে কিছু বেশি সংখ্যক মানুষ কী বোঝে এই শব্দের মানে? তারপরও রেডিও-টিভিতে বিভিন্ন মঞ্চে-অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার জয়গান গাওয়া হচ্ছে। ‘ও আমার দেশের মাটি’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানে গলা মেলাচ্ছেন দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা, ঘুষখোর অফিসার, ওষুধে-খাবারে ভেজাল মেশানো ব্যবসায়ী, সাম্প্রদায়িক ভাবধারাপুষ্ট ধর্মবাদী রাজনৈতিক কর্মী। এই স্বাধীনতা দিবসেও সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প হৃদয়ে ধারণ করে একটি বিশেষ শ্রেণি ‘ধর্ম’কেই মানুষের একমাত্র ‘পরিচয়’ হিসেবে ঊর্ধ্বে তুলে ধরছেন। আষ্ফালন করছেন। এমন একটা পরিস্থিতিকে আমরা প্রগতিবাদীরাও মেনে নিয়েছি। আমরা যে সবাই স্বাধীন! এই স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি ৪৭ বছর আগে!
এত যে চারদিকে ধর্মের সুর, তবু সমাজে দুর্নীতি কমে না। মুখে ধর্ম, অন্তরে যেকোন উপায়ে টাকা বানানোর ধান্দা দেশের কোটি কোটি মানুষকে এখনও স্বাধীনতার স্বাদ থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। দেশের লক্ষকোটি নিরন্ন বুভুক্ষ মানুষ খালি পেট- খালি গা-রুক্ষ চুল-কোটরে বসা চোখ-মাথায় দুনিয়ার দুশ্চিন্তা নিয়ে ঘুমোতে যায়। গত কাল, গত পরশু, দিনের পর দিন যেমন ঘুমোতে যায়। আজ সকালে যেমন সূর্য উঠেছিল, কালও তেমন উঠবে। তবু এককণা আলো প্রবেশ করবে না তার জীবনে। প্রতিদিন গাঢ় থেকে গাঢ় হবে অকুল অন্ধকার। অনুন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের পথে প্রিয় স্বদেশের অগ্রযাত্রা তাদের চেতনা ও জীবনাচরণে তেমন কোনো প্রভাব সৃষ্টি করে না।
মাঝে মাঝে খুব আশাবাদী হয়ে উঠি। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দেশ আর্থিক সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলেছে বলে খুব ভালো লাগে। আবার যখন একটা খুব সাধারণ সত্য কথা বলে অভিনেতা মোশারফ করিম ধর্মবাদীদের কোপনলে পড়ে, কোনো ‘অপরাধ’ ছাড়াই ক্ষমা চায়, তখন নিজেকেও খুব বিপন্ন মনে হয়। তখন ‘ও আমার দেশের মাটি’ কিংবা ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’ গানে গলা মেলাতে পারি না। এই স্বাধীনতা চিত্তে দোলা দেয় না।
আরও বেশি বিপন্ন বোধ করি দেশের জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিপন্নতা দেখে! তাদের অনেক কিছুই নেই, সবচেয়ে বড় ‘নেই’ হচ্ছে নাগরিক অধিকার! নিরাপত্তা। সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচার অধিকার। রামুর উত্তম, নাসিরনগরের রসরাজ, নারায়ণগঞ্জের শ্যামলকান্তি কিংবা গঙ্গাচরার টিটু রায়ের মত যে কেউ যেকোন সময় নিশানা হতে পারেন। কোনো একটা হুজুগ তুলে যেকোন সময় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর যে কারও প্রতি হিংস্রতা নেমে আসতে পারে। মামলা হতে পারে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হতে পারে। এমন এক ভীতিকর পরিবেশে বাস করে কেন জানি তেমন দেশ দেশপ্রেমিক হওয়া যায় না। আবার ‘দেশদ্রোহী’ হওয়ার সাহস, যোগ্যতা বা যুক্তিও খুঁজে পাই না! সংখ্যালঘু মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে কেবলই মনে হয়, আমার দেশ আছে অধিকার নেই। আমার দেশের সংবিধান অলিখিতভাবে আমাকে ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’ বানিয়ে রেখেছে। সবসময় আমাকে হুমকি-উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকতে হয়। আমার নিরাপত্তা নেই। মুষ্টিমেয় মানুষের আহ্লাদী স্বাধীনতা আমার জীবন থেকে সাম্প্রদায়িকতার খড়গ চালিয়ে কেড়ে নিয়েছে দেশপ্রেমিক হওয়ার সেই নির্ভীক অহঙ্কার। এই দেশে এখন আমার অলিখিত পরিচয়— সংখ্যালঘু, ‘বিধর্মী’ (বধযোগ্য প্রাণী)! যাকে যে কোনও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করায় কোনও বাধা নেই। ইচ্ছে করলেই হামলা চালানো যায়। অপমান করা যায়। গাল দেওয়া যায়। আমরা সত্যিই কি স্বাধীন?
এই জীবন কারও কাছে প্রণত হতে পারে না। উচ্চারণ করতে পারে না ‘কৃতজ্ঞ’ শব্দটা। অধিকার-বঞ্চিত, সন্ত্রস্ত মানুষ কেবলই ভয়ের প্রহর গোণে। সে কী করে গাইবে, ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো?’ কী করে বলবে স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায়!
মাঝে মাঝে নিজেও বুঝতে পারি না ঠিক কাকে বলে স্বাধীনতা? কীসের মুক্তি সে নিয়ে আসে? স্বাধীনতা কার? ব্যক্তির? পুঁজির? গোষ্ঠীর? সমাজের? আমাদের সংবিধানে লেখা আছে ব্যক্তির ধর্মীয় মত প্রকাশের কথা, বাক স্বাধীনতার কথা। কিন্তু যদি আমরা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর চোখে দেশকে দেখার, তাদের উপর নির্যাতনকারী গোষ্ঠীর পরিচয় প্রকাশ করতে চাই, তাহলে তার অনুমতি মিলবে? তার মানে রাষ্ট্রের, সরকারের চোখ দিয়ে আমাকে, আমাদেরকে দেখতে হবে, সে মতো কথা বলতে হবে। রাষ্ট্রই ঠিক করে দেবে আমার মত প্রকাশের স্বাধীনতা কতটা।
বান্দরবানের গভীর জঙ্গলে বর্ষায় খাবার না পেয়ে কোলের শিশুর কান্না থামাতে মা অজান্তে মাটি খুঁড়ে তার মুখে যখন বিষাক্ত আলু দেন, তাঁর কোলেই যখন সন্তান নেতিয়ে পড়ে, তার খবর শহরে এসে পৌঁছায় না। আমার মনে হয় না সেই মায়ের কাছে স্বাধীনতা কোনও আলাদা তাৎপর্য নিয়ে আসে। যখন রাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনী গাইবান্ধার সাঁওতাল পল্লীতে আগুন দেয়, তখন সেই ঘরবাড়ি হারানো সাঁওতাল নারী-পুরুষের কাছে কীসের স্বাধীনতা?
কিংবা মহেশখালীর কৈবর্ত পরিবারের জেলে বর্ষায় বঙ্গপোসাগরে যখন উথালপাতাল ঢেউয়ে তার নৌকাটি নিয়ে প্রাণপণে ডাঙা খুঁজতে ব্যস্ত, তার কাছেও স্বাধীনতার কোনও আলাদা মানে নেই। তাহলে এ স্বাধীনতা কিসের স্বাধীনতা? কার স্বাধীনতা?
ছোটবেলায় বুড়োমানুষরা বলতেন, ‘ইংরেজ আমলই ভালো ছিল’। তাদের সঙ্গে কত তর্ক করেছি, বলেছি, সুশাসনের চাইতে স্বশাসন দামি। কিন্তু আজ যখন দেখি লাল-সবুজ পতাকার চেতনা ফিকে হয়ে কেবল একটি বিশেষ শ্রেণির, বিশেষ ধর্মের লোকেদের স্বার্থ রক্ষায় ক্রমেই বাউন্ডারি নির্মাণ করে, তখন বুঝি, দেশের গতি আমাদের স্বাধীনতার যে গতিমুখ ছিল, তার সঙ্গে ঠিক মানানসই নেই।
স্বাধীনতার প্রায় অর্ধ শতাব্দী পরেও আমাদের ‘পলিটিক্যাল সোসাইটি’ ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বশেষে সব মানুষের বেঁচে থাকার, সবার স্বার্থ ও অধিকার রক্ষার চাহিদাটুকুও পূরণ করতে পারল না। একদল অধিকতর গুরুত্ব ও মর্যাদা পেয়ে দাপট দেখাচ্ছে, শাঁসানি দিচ্ছে, আরেকদল কাচু-মাচু হয়ে কোনো মতে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। দারিদ্র্য আর অধিকারহীনতার মাপকাঠিতেই তারা বাঁধা থাকছে, আর ‘প্রিভিলেজড’ শ্রেণিটি ধনী হতে হতে ১৮ তলা, বিশ তলা অট্টালিকা বানাচ্ছে! কেউ কেউ হয়তো বলবেন, তাদেরও তো ১৮ তলা, বিশ তলায় বাস করার স্বাধীনতা আছে!
প্রায়ই প্রশ্ন জাগে, আসলে আমরা কোথায় চলেছি? ‘সত্যিই, কোথায় চলেছি’, এই প্রশ্নের উত্তর এখন কারও কাছেই পাওয়া যায় না। কারণ উত্তরটি সহজ নয়। এক কথায় বলা যায় না। কিন্তু মনে হয় বেশ কিছু শিক্ষিত ও বিত্তশালী ক্ষমতাবান মানুষের ধৈর্যচ্যুতি হয়েছে। তারা ও তাদের সমর্থনপুষ্ট রাজনৈতিক দল ও নেতারা ঠিক করেছেন ‘মুসলিম-সংহতি’ ও তার পরিণতিতে একটি ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’ গঠন করতে পারলেই এই দেশ মহাশক্তিশালী দেশ হয়ে উঠবে! ফলে চেষ্টা করা হচ্ছে দেশে আগ্রাসী, সংখ্যালঘু-বিরোধী একটি নতুন ও উগ্র ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ’ তৈরি করতে। কথায় কথায় ধর্মবিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। এ ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় গালিগালাজ ও অপছন্দের ব্যক্তিদের চরিত্রহননের মচ্ছব তো আছেই। রাজনৈতিক হিসেবটাও পরিষ্কার। মেরুকরণের রাজনীতির ফলে যদি সমস্ত মুসলিম ভোটকে এককাট্টা করা যায়, তা হলে সংখ্যালঘু মানুষ কোণঠাসা বোধ করলেও তাদের বিরোধিতা করার কোনও ক্ষমতা থাকবে না। সেই সুযোগে বাংলাদেশ একটি ‘মুসলিম পাকিস্তান’ হয়ে পুনর্জন্ম নেবে!
কিছু মানুষের এমন খায়েশ এবং এই খায়েশ পূরণের পথে নীরব কিন্তু ব্যাপক অভিযাত্রা দেখে সত্যিই খুব আফসোস হয়! কবির ভাষায় কেবলই বলতে ইচ্ছে করে: ‘বেড়া ভেঙে বুনো মোষ খেয়েছে ফসল’/স্বাধীনতা মুক্তিযুদ্ধ সবই কী বিফল?’
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)।









