সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে রাজধানী উত্তাল হয়ে উঠেছে। আন্দোলনকারীদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ক্রমে এই আন্দোলন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ছে।
ব্যাপক বেকারত্বের দেশে কোটার নামে সরকারি চাকরির ‘সুযোগ’কে কিছু মানুষের জন্য ‘কুক্ষিগত’ করে রাখার বিরুদ্ধে ছাত্ররা গর্জে উঠেছে। যথারীতি এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন নিয়েও চলছে নানা বিভ্রান্তি, হঠকারিতা, দলাদলি, জল ঘোলা করার হীন প্রয়াস। দেখা গেল শান্তিপূর্ণ অহিংস আন্দোলন চলাকালে হঠাৎ মুখোশ এঁটে কিছু ‘আন্দোলনকর্মী’ ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠলেন। আন্দোলনকারীদের মধ্যে যারা মুখ ঢেকে ভিসির বাসা এবং চারুকলায় হামলা করেছেন তারা কারা? তাদের মুখ ঢাকার প্রয়োজন হলো কেন?
মুখোশধারীদের এমন আক্রমণ এই আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার কৌশল বলেই সবাই মনে করছেন। এই কৌশল কারা প্রয়োগ করেছেন? সরকার পক্ষ? বিরোধী দল? জামায়াত-শিবির চক্র?
এই মুখোশধারীরা আসলে গণতন্ত্র সংহারকারী। মুখোশ সব সময়ই খারাপ। মুখোশ পরে কেউ কখনও ভালো কিছু করে না, করতে যায় না। গত কয়েক বছর ধরে দেশে প্রতিবাদ আন্দোলন হলেই যারা রে-রে করে তেড়ে যাচ্ছেন, যাবতীয় বিরোধিতার মাথা ভেঙে দিতে যারা বদ্ধপরিকর হয়ে উঠেছেন, মুখোশ এখন তাদের রক্ষাকবচ!
কোটার মতো বিষয়ে শিক্ষার্থীরা যে এত উত্তপ্ত হতে পারে, তা আগে সম্ভবত কারও জানা ছিল না। উত্তাপ যেহেতু রয়েছে, সেহেতু বিপদও রয়েছে। বিপদের হাত থেকে বাঁচতে তাই রক্ষাকবচ খুঁজে নিয়েছে ‘গণতন্ত্র সংহার বাহিনী’। গত তিনদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রান্তে এই বাহিনীকে অবস্থান করতে দেখা গেছে। মোটর সাইকেল আরোহী এই বাহিনীর সদস্যদের হাতে লাঠি বা আগ্নেয়াস্ত্র আর মাথায় হেলমেট। প্রয়োজনের সময় তারা মুখটা ঢেকে নেয়। এতে তাদের চেনাও যায় না, আবার স্বার্থও হাসিল হয়।
এই মুখোশ বাহিনীকে এতটা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখব কি না, তা অবশ্য ‘ভেবে দেখা’ দরকার। এই মুখোশ বাহিনীকে মোতায়েন করা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ‘নির্বিঘ্ন’ ও ‘শান্তিপূর্ণ’ রাখার জন্যই। দেশের শাসকরা ‘উন্নয়ন’ বিষয়ে অত্যন্ত ‘সংবেদনশীল’। নির্বাচনী বছরে কোনও ‘অঘটন’ যদি কোনও অঞ্চলে ঘটে যায়, তা হলে সেই অঞ্চলের উন্নয়ন ব্যাহত হবে বলে বর্তমান শাসকরা বিশ্বাস করেন। তাই তাদের সদাসতর্ক থাকতে হয়। কোনো পরিস্থিতিতেই যেন বিরোধিতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। এই ‘উন্নয়ন’কে অব্যাহত রাখতে ‘নিজেদের মতো’ করে ‘নির্বাচন’ করার দরকার হতে পারে। সেই প্রক্রিয়ায় ‘বিঘ্ন’ ঘটা একেবারেই কাম্য নয়। অতএব মুখোশ বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম, সে কথা বলাই বাহুল্য।
কিন্তু মুখোশ বাহিনীকে কারা মোতায়েন করলেন, সে নিয়ে কিন্তু একটু সংশয় তৈরি হয়েছে। আন্দোলনকারীরা বলছেন, এই বাহিনী তাদের কেউ নয়। শাসক দলও বলছে, এই বাহিনী তাদের নয়। তাহলে বাহিনী কার? বিরোধীরা শাসকের দিকেই আঙুল তুলছেন। বাহিনীর তাণ্ডবে যে শাসকের সুবিধা হচ্ছে এবং আন্দোলনকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তা-ও দেখা যাচ্ছে। কিন্তু শাসক তবু মানতে নারাজ। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, ‘উন্নয়ন’ নিজেই নিজের স্বার্থে বাহিনী মোতায়েন করেছে। আবার এমন কথাও শোনা যাচ্ছে, বাহিনী নাকি মোতায়েন করেছেন জামায়াত-শিবিরচক্র! হবেও বা! এই সব সম্ভবের দেশে কোনো কিছুই বিচিত্র নয়!
তবে ফল ভক্ষণেই মনোনিবেশ করা জরুরি, বৃক্ষ গণনা অপ্রয়োজনীয়। অতএব বাহিনী কার তা ভেবে সময় নষ্ট করা অনুচিত। বাহিনীর কর্মদক্ষতা যে ‘প্রশংসনীয়’, সে কথাই মাথায় রাখা দরকার।
‘নিন্দুকরা’ শুধু তাণ্ডব দেখতে পাচ্ছেন আর তাণ্ডবকারীদের মুখে মুখোশ দেখতে পাচ্ছেন। আসলে মুখোশ তো পরানো হল গণতন্ত্রের মাথায়। একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সাবোটাজ করতে মুখোশ পরে তাণ্ডবলীলা চালানো হলো। এ ক্ষেত্রেও ‘নিন্দুকে’ বলবেন, গণতন্ত্রকে কুক্ষিগত করা হল। কিন্তু একটু ‘উদার’ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখলে যে কেউ টের পাবেন, কুক্ষিগত নয়, গণতন্ত্রকে ‘সুরক্ষিত’ করা হল। মুখোশ পরিয়ে গণতন্ত্রকে ‘রক্ষাকবচ’ দেওয়া হল।
যেভাবে গণতন্ত্রের মাথায় মুখোশ পরানো হলো, তাতে কেউ কেউ বলতেই পারেন— গণতন্ত্র নয়, এ হল মুখোশ-তন্ত্র। কিন্তু নাম যা-ই হোক, একটি গণতান্ত্রিক দাবিদার সরকার যখন মুখোশে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে, আর মুখোশহীন সাধারণ মানুষ যখন অসহায় বোধ করছে, তখন মুখোশতন্ত্রকেই ভবিতব্য হিসাবে মেনে নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।
পুনশ্চ: কোটার পক্ষে এবং বিপক্ষে দু’দিকেই যুক্তি আছে। প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে যারা উপরে উঠে আসে তাদের কৃতিত্ব অনেক বেশি সন্দেহ নেই। কিন্তু কোটা কতটা থাকতে পারে? অর্ধেকেরও বেশি কোটা কি থাকতে পারে? কোটা কি অনন্তকাল ধরে চলতে পারে?
মনে রাখতে হবে যে, মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাদের অবদানের কারণেই আমরা আজ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি। আর স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি বলেই কোটা সংস্কারের দাবি করতে পারছি। নিজের অধিকারের বিষয়টি তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছি। মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে কোনো অবস্থাতেই যেন আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান না করি।
হ্যাঁ, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তানদের জন্য কোটা অবশ্যই আরও অন্তত এক দশক বহাল রাখা উচিত। কিন্তু সেটা করতে হবে কিছু নিয়ম-নীতির আলোকে। সত্যিকার অর্থেই যারা পিছিয়ে পড়া-তাদের সামনে টেনে আনার লক্ষ্যে। আমাদের মতো চরম বেকারের দেশে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ঢালাও ৩০% ভাগ রেখে দিলে বিক্ষোভ বাড়বে। যে প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান সম্পর্কে অবহিত নয়, তাদের এখন একাত্তরে ফিরিয়ে নেয়া যাবে না। মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের কথা বলে কোনো যুক্তিতেই তাদের মন গলানো যাবে না। বরং মুক্তিযোদ্ধা কোটা যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনলে মুক্তিযোদ্ধাদের মান বাঁচবে। তা না হলে মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারকে সুবিধা ও সম্মান দিতে গিয়ে তাদের অসম্মানই করা হবে বেশি।
আরেকটি কথা, কোনো পুরস্কার হিসেবে কোটা ব্যবস্থা চালু করা হয়নি। দেশের অনগ্রসর মানুষকে সুবিধা দেবার জন্যই কোটা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের কোটায় যে চাকরি সেটা শুধু যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং যারা সরকারের কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাচ্ছেন, তাদের সন্তানদের জন্য রাখা যেতে পারে। কিন্তু যারা সচ্ছল, সেসব মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের যদি কোটা দেয়া হয় তাহলে তো পুরস্কার দেয়া হবে। সেটা তো অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সহায়তা করা হবে না।
আর কোটা কোনো মতেই চিরস্থায়ী ব্যবস্থা হতে পারে না। কোটা একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। তবে সামজিক ন্যায়ের স্বার্থে কিছু কোটা অবশ্যই রাখতে হবে। যে ছেলেটির একটা পা খাটো, তাকে যদি আরেকটি ভালো পা-ওয়ালা ছেলের সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে দিই, তাহলে সেটা ন্যায্যতা হয় না। ‘সবার জন্য সমান সুযোগ’ ন্যায়ের সমাজ গড়তে পারে না। কাজেই কিছু মানুষের জন্য কিছু কোটা রেখে দিতে হবে। তবে কোটা ব্যবস্থা প্রতি পাঁচ বছর পর মূল্যায়ন করা উচিত।
পরিশেষে সরকারের উদ্দেশ্যে বিনীত নিবেদন, অবিলম্বে আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে সংকট নিরসনে উদ্যোগী হোন। সময়ের কাজ সময়ে না করলে বড়ো খেসারত দিতে হয়। ‘কোটা’র কাঁটা সমাজে দগদগে ঘা তৈরি করার আগেই এ থেকে জাতিকে মুক্ত করার জন্য আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নিন। কালক্ষেপণের কৌশল সব সময় ভালো ফল দেয় না। ক্ষমতাসীনদের মনে রাখা দরকার যে, একটা স্ফুলিঙ্গ দাবানল হয়ে উঠতে পারে!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)।







