ব্রেইন স্ট্রোক এমনই গুরুতর একটি সমস্যা যার কারণে জীবন পুরো অন্ধকারের দিকে নিয়ে যেতে পারে। উচ্চবিত্তের রোগ হিসেবে এর পরিচিতি থাকলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য তা শারীরিক ও মানসিক কষ্টের পাশাপাশি আর্থিক কষ্টেরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্ট্রোকের পর অনেকে কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেও পুরোপুরি আগের জীবনে ফিরে আসতে তাদের বেশ বেগ পেতে হয়। অনেকেই স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারেন না।
এর কারণ হিসেবে চিকিৎসকরা বলছেন, স্ট্রোকের রোগীদের পুনর্বাসনের জন্য কী ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন, সেই সচেতনতা এখনও ভাল করে গড়ে ওঠেনি সাধারণ মানুষের মধ্যে। এর ফলে পঙ্গুত্ব, স্মৃতিভ্রম ও গভীর মানসিক অবসাদে ডুবে যাচ্ছেন অনেকেই।
শনিবার বিশ্ব স্ট্রোক দিবসে এই সচেতনতা বাড়ানোর উপরই তারা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
ভারতের ফিজিক্যাল মেডিসিনের চিকিৎসক মৌলিমাধব ঘটক জানান, সাধারণভাবে একজন ব্যক্তির মস্তিষ্কের ৩০ শতাংশ কোষ সক্রিয় থাকে। বাকি ৭০ শতাংশ থাকে ঘুমন্ত। স্ট্রোকের সময় সক্রিয় কোষগুলো নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তখন ওই ৭০ শতাংশ সুপ্ত কোষকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা হয় নানা থেরাপির মাধ্যমে। এর উদ্দেশ্য হলো: স্ট্রোকের পরও পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তিকে
জীবনের মূল স্রোতে ফিরে যেতে সহায়তা করা। চিকিৎসা পরিভাষায় একে বলা হয় ‘স্ট্রোক রিহ্যাবিলিটেশন’ (Stroke Rehabilitation)।
এক্ষেত্রে ঠিক সময়ে থেরাপি শুরু করাটাই সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করেন ডাক্তাররা।
স্ট্রোকের পর যাদের উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয়, বা যাদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে ক্ষতির পরিমাণটা অনেকটা জায়গা জুড়ে ঘটে, তাদেরকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা কঠিন বলে জানান ডা. মৌলিমাধব।
তিনি বলেন, ‘‘এদের কিছু সমস্যা থেকেই যায়। কারও হয়তো একটা হাত বা পা পুরো সচল হলো না, কারও হয়তো কথায় জড়তা থেকে গেল। এসব ক্ষেত্রে আমরা দেহের বাকি অংশগুলোকে বেশি সক্রিয় রাখার চেষ্টা করি।’’
সক্রিয় রাখার চেষ্টাটি কেমন, এ সম্পর্কে ওই চিকিৎসক জানান, হয়তো কারও একটা হাত তেমন সচল নেই। সেক্ষেত্রে অন্য হাতটাকে থেরাপির মাধ্যমে বেশি কর্মক্ষম করার চেষ্টা হয়। যেন ‘প্রায়
অচল’ হাতের কাজ ‘সচল’ হাতটি একাই করতে পারে।
চিকিৎসকরা মনে করেন, স্ট্রোক আসলে মানবদেহের জন্য একটি বিশাল ঝড়, যা থেমে যাওয়ার পরও বড় একটি ছাপ রেখে যায়। সেই ছাপটি দূর করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
স্নায়ু রোগ চিকিৎসক শ্যামল দাস বলেন, স্ট্রোকের পর অনেক রোগীই বাকিটা জীবন পঙ্গু অবস্থায় কাটান। কিন্তু স্ট্রোকের পরের কয়েকদিনের চিকিৎসাই যে সব নয়, বেশিরভাগ মানুষই সেটা জানেন না। এমনকি ডাক্তারদের মধ্যেও এ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণার অভাব রয়েছে। তাই স্ট্রোকের পরে রোগীকে প্রাণে বাঁচিয়ে দিলেই সেটাকে ‘চিকিৎসা শেষ’ বলে মনে করেন অনেকে। সেটাকে শেষ নয়, বরং চিকিৎসার মাঝ পথ বলে উল্লেখ করেন ড. শ্যামল।
তিনি আরও জানান, স্ট্রোক রোগীর পুনর্বাসনের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদী। এর জন্য ওষুধ, ফিজিওথেরাপি, কাউন্সেলিং — সবই প্রয়োজন হয়। এসবের পেছনে ১৮ থেকে ২৪ মাস পর্যন্ত সময় লাগে।তাই কিছুদিনে হতাশ হয়ে না পড়তে পরামর্শ দেন তিনি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ৫৮ লাখ মানুষ স্ট্রোকে মারা যায়।
স্ট্রোক হয়ে উঠেছে মৃত্যুর দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং পঙ্গুত্বের চতুর্থ বৃহত্তম কারণ। চিকিৎসকরা মতে, স্ট্রোক হওয়ার প্রথম দু’-তিন দিনের মধ্যেই পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু করে দেয়া উচিত।
স্ট্রোকের পরে প্রথম ৪০ দিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়টি পেরিয়ে যাওয়ার পর পুনর্বাসন শুরু করলে সুফল পাওয়ার আশা অনেক কমে যায়। যদি স্ট্রোকের পাঁচ-ছ’ সপ্তাহ পরেও কেউ বিছানা ছেড়ে ওঠার চেষ্টা না করেন, খাওয়াদাওয়ায় অনীহা দেখান, সবসময় হতাশ হয়ে থাকেন, অল্পতেই বিরক্ত হন, তবে ধরে নিতে হবে স্ট্রোকের পথ ধরে অবসাদও গ্রাস করছে তাকে।
এক্ষেত্রে অবশ্যই রোগীকে মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারে স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞরা অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। তারা যদি রোগীর পরিবারকে রোগীর অবস্থা ও পুনর্বাসন চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতন করেন, তবে চিকিৎসা অনেক আগে শুরু হতে পারে।







