ছিলেন ক্রিকেটার, সেখান থেকে এক লাফে রাজনৈতিক নেতা বনে যাওয়া ইমরান খান কি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন? ২৫ জুলাই আসন্ন ১৩তম সাধারণ নির্বাচনের হালচাল, পরিবেশ-পরিস্থিতি-পূর্বাভাস কিন্তু সে কথাই বলছে।
প্রচার মাঠে ইমরানের প্রধানমন্ত্রীসুলভ ভাব-গরিমা আর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস দেখে অনেকেই বলাবলি করছেন যে- ‘পাকিস্তানের নয়া প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন ইমরান।’ তার হাতেই প্রাণ ফিরে পাবে নয়া পাকিস্তান!
২২ বছর ধরে এক ‘নতুন পাকিস্তান’-এর জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন ইমরান। রাজনীতির জন্য যেখানে যতটুকু ছাড় দেয়া দরকার, যেখানে যে কৌশল ও কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার তার সবটুকুই তিনি করছেন। রসালো কৌতুকে ভরা বক্তৃতা দিয়ে তিনি অনেক মানুষকে মুগ্ধ করেছেন। এবার তার জন্য মাহেন্দ্রক্ষণ এসেছে। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন লাভের জন্য মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অবশ্য ইমরান খানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আশাবাদের পেছনে মূল কারণ হচ্ছে ‘সেনাবাহিনীর আশীর্বাদ’। পাকিস্তানের ভোটের বাজারে এখন সবচেয়ে বড় কানাঘুষা হল ইমরান-সেনা ‘মানিক জোড়’।
সবার বিশ্বাস, যেভাবেই হোক ইমরানকেই ক্ষমতায় আনবে সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর তুলে দেয়া বলেই ছক্কা হাঁকাবেন ইমরান। যদিও প্রবাস থেকে ফিরে এসে কন্যাসহ নেওয়াজ শরীফের কারাবরণের ঘটনা পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) পক্ষে সহানুভূতি ভোট কিছুটা বাড়তে পারে। নওয়াজ সমর্থকেরা পাঞ্জাবে মরণপণ লড়াই চালিয়ে ভালো অবস্থানেও চলে যেতে পারে। অনেকে অবশ্য তাতেও বড় কোনো পরিবর্তন আশা করছেন না। পাকিস্তানে যা খুশি তাই করা বা আগাগোড়া উল্টে দেয়া কেবল সেনাবাহিনীর ইচ্ছের ব্যাপার। পাকিস্তানের আগামী নির্বাচন নিয়ে বিশ্লেষণে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো এ কথাই বলছে।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নিজেদের মতো’ করে নির্বাচনে সব আয়োজন সম্পন্ন করে ফেলেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। এই সেনাবাহিনীকে ‘আম্পায়ার’ আখ্যা দিয়ে বলা হচ্ছে, এদের হাতে রাখতে পারলেই পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হয়ে বোলিংয়ে প্রতিপক্ষকে বোল্ড করে ব্যাটিংয়ে ছক্কা হাঁকাবেন। আর এটা ঘটলে তিনিই হতে যাচ্ছেন দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী। তার হাতেই প্রাণ ফিরে পাবে নয়া পাকিস্তান।
তবে একেবারে বিনা স্বার্থে পাকিস্তানের কোনো দলকেই এ পর্যন্ত বুকে টানেনি সেনাবাহিনী। তাহলে ইমরানের মাথায় হাত রাখার স্বার্থ কী? বিশ্লেষকরা বলছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি বা নওয়াজের পিএমএল-এনের মতো প্রভাবশালী দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে সেনাবাহিনীকে অনেকটা বেগ পেতে হয়।
আর তাই তৃতীয় শক্তি হিসেবে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের মতো চারাগাছকে ক্ষমতায় বসাতে চায় সেনাবাহিনী। খেলার মাঠ ছেড়ে রাজনীতির মাঠে নামার পর থেকেই ‘সেনা হাতিয়ার’-এর কলঙ্ক লাগে ইমরানের গায়। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর তা আরও চাঙ্গা হয়ে ওঠে। একাংশের ধারণা, এবার ইমরানের কাঁধে বন্দুক রেখে ‘হরিণ’ শিকার করবে সেনাবাহিনী।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও দেশটির শাসন ব্যবস্থায় বরাবরই দেখা গেছে সেনাবাহিনীর অপচ্ছায়া। এর থেকে যেন কিছুতেই বের হতে পারছে না ‘জঙ্গিবাদের স্বর্গভূমি’ এই দেশটি। এখানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কখনওই দানা বাধতে পারেনি। নানা চড়াই-উৎড়াইয়ের মধ্য দিয়ে মাত্র প্রথমবারের মতো দুটি গণতান্ত্রিক সরকার নিজেদের মেয়াদ পূর্ণ করতে সক্ষম হয়েছে। তৃতীয়বারের মতো একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন হওয়ার কথা আগামী ২৫ জুলাই।
কোনো কোনো বিশ্লেষক বলছেন যে, সেনাবাহিনী যতই ছক কাটুক, শেষ পর্যন্ত ‘অতি আত্মবিশ্বাসী’ ইমরান খানের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সম্ভব নাও হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী হতে পার্লামেন্টে যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দরকার, তার জন্য ইমরানকে অবশ্যই জোট করতে হবে। সে ক্ষেত্রে তাকে নির্ভর করতে হবে পিপিপির ওপর। কারণ ইমরান খান বরাবরই পিটিআইয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই গাঁটছড়া বাঁধবেন না বলে দাবি করে এসেছেন। আর পিপিপি নেতা জারদারি যে নিজের সমর্থন দেওয়ার জন্য চড়া মূল্য হাঁকবেন, সেটি চোখ বন্ধ করেই বলে দেয়া যায়। সে ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভায় নিজেদের সদস্য সংখ্যা বাড়াতে এবং জারদারির বিরুদ্ধে করা দুর্নীতি মামলাগুলো তুলে নেওয়ার দাবি তারা সামনে আনতে পারে। আর এসব কিছু সামলে ইমরানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন পূরণ নাও হতে পারে।
তবে বেশিরভাগ পর্যবেক্ষক এবারের নির্বাচনে সার্বিক পরিস্থিতি ইমরানের অনুকূলে বলেই মনে করছেন। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী, বিচার বিভাগ ও আমলাদের সমর্থন ইমরানের পক্ষেই। এমনকি তালেবান ও অন্যান্য বিদ্রোহী গ্রুপগুলোও তাকে নীরব সমর্থন দিচ্ছে। কারণ এখন পর্যন্ত ইমরান খানের দলীয় সমাবেশে কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি।
পাকিস্তানের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ যেমন-নওয়াজ শরিফ, বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি, আসফানদিয়ার ওয়ালি খান ও আলতাফ হোসেনের মতো নেতারা পিটিআইকে সমর্থন দেওয়ায় সেনাবাহিনীর সমালোচনা করেছেন। বিভিন্ন দলের জয়ী হওয়ার মতো প্রার্থীদের গোয়েন্দাদের নকশা অনুযায়ী পিটিআইতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছে এবং যারা তা করতে রাজি হননি তাদের নির্বাচন কমিশন অযোগ্য ঘোষণা করেছে বলে অভিযোগ করেছেন রাজনীতিকরা।
পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নতুন কিছু নয়। দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ১৯৯০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তান পিপলস পার্টিকে (পিপিপি) পরাজিত করতে বিরোধী দলগুলোকে অর্থ দিয়েছিল সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বা ইন্টার সার্ভিসেস ইনটেলিজেন্স। এবারের নির্বাচনে সেনাবাহিনীর প্রভাব খাটানোর নানা আলামত আগেই পাওয়া গেছে। এখন সেগুলো প্রকাশিত হচ্ছে।
পাক নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী দেশের জাতীয় সংসদের ২৭২টি অসংরক্ষিত আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যা ৩৪৫৯ জন আর চারটি প্রাদেশিক আইনসভার মোট ৫৭৭টি কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৮৩৯৬ জন প্রার্থী। নির্বাচনী লড়াইয়ের ময়দানে অন্যদের সঙ্গে রয়েছেন বামপন্থীরাও। আওয়ামী ওয়ার্কার্স পার্টি, মজদুর কিষাণ পার্টিসহ কয়েকটি বামপন্থী দল জোট বেঁধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। অন্যদিকে, দেশের প্রধান দুই দলের নেতারা রেওয়াজ অনুযায়ী একাধিক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। উল্লেখ্য, ১৯৯৮ থেকে রাজনীতি শুরু করা ইমরান ও তাঁর দল গত নির্বাচনে ১৬ শতাংশ ভোট পেয়ে আসন সংখ্যার বিচারে তৃতীয় স্থানে ছিল, কিন্তু উত্থান ছিল চোখে পড়ার মতো, বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে তাঁর দল ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ।
পাকিস্তানে সেনাবাহিনী দেশের গণমাধ্যমের ওপরে ব্যাপক খবরদারি শুরু করেছে। কোনও নির্বাচনকে নিয়ন্ত্রিত করতে চাইলে সবার আগে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে।এই সূত্র মেনেই জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল জিও-র সম্প্রচার কিছুদিন আগে বন্ধ করে দেয় কেবল নেটওয়ার্ক সংস্থাগুলো। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে আজীবন রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে আদালতের দেওয়া রায়ের কঠোর সমালোচনা করেছিল জিও টিভি। তারা পরিষ্কারভাবে বলেছিল এই রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এই রায়ের পেছনে সেনাবাহিনীর হাত থাকতে পারে। এই খবর ছাড়াও সেনাবাহিনীর দায়িত্বে থাকা একটি প্রকল্পের আর্থিক দুর্নীতি নিয়েও খবর সম্প্রচার করেছিল বেসরকারি ঐ টিভি চ্যানেলটি। ঠিক এর পরেই জিও টিভিকে ‘নিষিদ্ধ’ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। জিও টিভি ছাড়াও দেশের সবচেয়ে বিখ্যাত ও প্রধান প্রগতিশীল পত্রিকা ‘দ্য ডন-এর বিক্রি ও প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয় দেশের বেশ কিছু অংশে। সাংবাদিকদের অপহরণ সহবিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের দপ্তরেও লিখিত ও অলিখিত বিভিন্ন নির্দেশ যাচ্ছে কি লেখা যাবে আর কি যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি ।
দেশের আধুনিক ও যুব প্রজন্ম ইমরানকেই চাইছেন। পানামা পেপার কেলেঙ্কারিতে নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে প্রথমে আদালতে মামলা ঠোকেন ইমরানই। এরপর বিচারক্রমে নওয়াজ সবরকম পদ থেকে বরখাস্ত হলে এবং তারপর সাজা ঘোষণায় দশ বছরের জেল– সব মিলিয়ে ইমরানের রাস্তা অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে আছে। ইমরান নিজেও বিশ্বাস করেন সেই ‘ধর্মীয় পপুলিস্ট’ এবং ‘উগ্র দেশপ্রেমের’ রাজনীতিতেই যে নীতির ওপর ভর করে বর্তমানে আমেরিকা, তুরস্কসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন দক্ষিণপন্থী দলগুলোর উত্থান ঘটছে। ইমরান নিজে বরাবরই রক্ষণশীল ইসলামিক ঘরানাকে অগ্রাধিকার দেন। তার সঙ্গে তালেবানদের সখ্যেরও বেশ কিছু উদাহরণ রয়েছে। সব মিলিয়ে আর্থিকভাবে ভঙ্গুর অবস্থায় থাকা দেশে ‘ধর্ম’ আবারও একটা ভূমিকা পালন করতে চলেছে নির্বাচনে। ইমরান খান নিজের প্রচারে দেশবাসীকে ‘ভালো সময়’ ও ‘ভালো জীবনযাত্রা’ আনার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন এবং সঠিক ‘পাকিস্তানি’ মূল্যবোধ মেনে চলার কথা বলছেন।
দেশের প্রধান বামপন্থী দল আওয়ামী ওয়ার্কার্স পার্টির মুখপাত্র ফারুক তারিক কিন্তু পরিষ্কারভাবেই বলছেন– ‘ইমরানকে ক্ষমতায় বসাতেই পাক সেনাবাহিনী চূড়ান্ত ব্যস্ত। তারা ক্রমাগত অন্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও কর্মীদের হুমকি ও হয়রানি করে চলেছে, গুম করে চলেছে, বিচার বিভাগের শক্তিশালী একাংশের সঙ্গে মিলে বিভিন্ন মামলায় বিরোধী রাজনৈতিকদের জেরবার করে চলেছে। ঠিক নির্বাচনের মুখেই নওয়াজ শরিফ ও তার কন্যা মরিয়মের বিরুদ্ধে দশ বছরের জেলের সাজা ঘোষণা করাও সেনাবাহিনীর পরিকল্পনার একটা অংশ যাতে করে ইমরান খানের রাস্তা একেবারেই নিষ্কণ্টক থাকে’।
জঙ্গি অধ্যুষিত পাকিস্তানে আসন্ন নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ‘হাতের পুতুল’ হয়ে ক্রিকেটের এই সাবেক অলরাউন্ডার রাজনীতির মঞ্চে কী খেলা খেলেন-এখন সেটাই দেখার বিষয়।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








