খুনিদের বাইরে সেনাবাহিনীর প্রথম যিনি ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর পৌঁছেছিলেন, তিনি ফার্স্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অ্যাডজুটেন্ট। তাকে বাড়ির পরিস্থিতি দেখে আসার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলো।
এরপর যারা যান তারা ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই) সদস্য। তাদের সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিলো শুধুই ঘটনাস্থলের ছবি তোলা।
তার কিছু পর সেখানে পৌঁছান কুমিল্লার ওয়ান ফিল্ড আর্টিলারির যে কোম্পানিটি ৩২ নম্বরের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলো তাদের কমান্ডার ক্যাপ্টেন (পরে লে. কর্নেল) বাশার।
এরপর সেখানে উপস্থিত হন সাপ্লাই অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক যিনি পরে মরদেহগুলোর দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করেন। আর সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহর নির্দেশে বেলা ৩টার দিকে পৌঁছান ঢাকার স্টেশন কমান্ডার।
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সাক্ষীদের সাক্ষ্যে প্রমাণ হয়েছে, ৭৫’র ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর ছোট একটি অংশ সপরিবার বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেও ভয়ে কম্পমান সেনা নেতৃত্ব তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে নানা জুজুর অজুহাতে এভাবে শুধুমাত্র ঘটনাস্থলের ছবি তোলা আর মরদেহগুলোর দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করার মধ্যেই তাদের দায়িত্ব পালন করেছে।
তাদের বাইরে ঘটনার পরে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন রাষ্ট্রপতির মিলিটারি সেক্রেটারি এবং তিন এডিসি। আর ঘটনার সময় শুধু একজনই সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন এবং নিহত হন। তিনি রাষ্ট্রপতির বিদায়ী প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিল। তার হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেন তার ড্রাইভার এবং মামলার ২০ নম্বর সাক্ষী আইনউদ্দিন মোল্লা।
কর্নেল জামিল হচ্ছেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে টেলিফোনে কথা হওয়া শেষ তিনজনের একজন। অন্য দু’জনের মধ্যে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ হতচকিত অবস্থায় উদ্যোগহীনতা প্রত্যক্ষ করলেও কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেন নি।
আর একেবারে শেষ মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ফোনে কথা বলা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা মহিউদ্দিনের পক্ষে রণসজ্জার বিরুদ্ধে কোনো কিছু করার কথা ছিলো ভাবনারও অতীত।
আইনউদ্দিন মোল্লা জানান, ভোর ৫টার দিকে তার রুমের কলিং বেল বেজে উঠে। তখন তিনি অজু করছিলেন। তাড়াতাড়ি বাসার সামনে গেলে কর্নেল জামিল উপর থেকে দ্রুত গাড়ি তৈরি করতে এবং গণভবনে গিয়ে সকল ফোর্সকে হাতিয়ার ও গুলিসহ ৫ মিনিটের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার নির্দেশ জানাতে বলেন।
গণভবনে সৈনিকদের নির্দেশ জানিয়ে তিনি ফিরে আসলে কর্নেল জামিল তার ব্যক্তিগত গাড়িতে রওনা হন। ধানমন্ডির ২৭ নম্বর রোডের মাথায় তারা গণভবন থেকে আসা ফোর্সদের দেখেন।
সেনাবাহিনী থেকে ১৯৭৪ সালে অবসরে গিয়ে কর্নেল জামিলের গাড়িচালক হওয়া মামলার ২০ নম্বর এই সাক্ষী বলেন, সোবহানবাগ মসজিদের কাছে পৌঁছালে দক্ষিণ দিক থেকে শোঁ শোঁ করে গুলি আসতে থাকে। তখন ফোর্স অ্যাটাক করানোর কথা বললে কর্নেল জামিল বলেন, এটা ওয়ার-ফিল্ড নয়, ফোর্স অ্যাটাক করালে সিভিলিয়ানদের ক্ষতি হতে পারে।
এরপর জামিল আইনউদ্দিন মোল্লাকে প্রতিপক্ষের অবস্থান জেনে আসার নির্দেশ দিয়ে গাড়িতেই বসে থাকেন। নির্দেশ পেয়ে তিনি যখন দেয়াল ঘেঁষে ৩২ নম্বরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ৫/৬ জন সেনাসদস্য দৌড়ে জামিলের গাড়ির দিকে যায়। হাতে ইশারা করে তিনি কর্নেল জামিলকে সরে যেতে বলেন। স্যার, স্যার বলে আওয়াজও করেন কয়েকবার। কিন্তু কর্নেল জামিল তার দিকে তাকান নি।
‘ওইসময় আর্মির অস্ত্রধারী লোকগুলো গাড়ির কাছে পৌঁছে যায়। কর্নেল জামিল দুই হাত উঠিয়ে তাদেরকে কিছু বলার বা বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু, তারা কর্নেল জামিলকে ২/৩টি গুলি করলে তিনি মাটিতে পড়ে যান,’ বলে জানান আইনউদ্দিন মোল্লা।
পরে সকাল ৮টার দিকে কর্নেল জামিলের ছোট ব্যক্তিগত গাড়িতে করেই জামিলের মরদেহ ৩২ নম্বরে নিয়ে আসা হয় বলে মুহিতুল ইসলামসহ একাধিক সাক্ষী জানিয়েছেন।
মামলার সাক্ষ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে খবর পেয়েই ৩২ নম্বরের দিকে ছুটে গিয়েছিলেন কর্নেল জামিল। আর হত্যাকাণ্ড ঘটে যাওয়ার পর ওই খবর পেয়ে রাষ্ট্রপতির মিলিটারি সেক্রেটারি ব্রিগেডিয়ার মাশরুরুল হকসহ বঙ্গভবন থেকে ৩২ নম্বরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন রাষ্ট্রপতির দুই এডিসি গোলাম রব্বানী (মামলা চলার সময় কমান্ডার এবং ডিজিএফআই’র পরিচালক) এবং ক্যাপ্টেন শরীফ আজিজ (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিসেবে অবসর)।
পনেরো নম্বর সাক্ষী হিসেবে গোলাম রব্বানী জানান: ৩২ নম্বর রোডের মাথায় সেনা সদস্যরা তাদের বাধা দেয়। একজন সুবেদার তাদের চশমা, ঘড়ি, মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। তিনজনকে রশি দিয়ে বেঁধে একটি নার্সারিতে বসিয়ে রাখে। কিছুক্ষণ পর তাদের চোখ বেঁধে ফেলা হয়। সেসময় গান লোডের শব্দও পান তারা।
প্রায় ২/৩ ঘণ্টা পর একজন অফিসারের নির্দেশে তাদের চোখ খুলে দেওয়া হলে তারা মেজর ফারুককে দেখতে পান বলে গোলাম রব্বানী জানিয়েছেন। পরে তারা জানতে পারেন, গান লোড করে মেরে ফেলতে চেয়েছিলো রিসালদার মোসলেমউদ্দিন। কিন্তু সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট (পরে মেজর) শহিদুল্লাহ মেজর ফারুকের সঙ্গে দেন-দরবার করে তাদের মুক্তির ব্যবস্থার করেন।
মুক্তির পরও অবশ্য তাদেরকে কড়া পাহাড়ায় গণভবনে এডিসির রুমে বসিয়ে রাখা হয়। পরে রাষ্ট্রপতির মিলিটারি সেক্রেটারি মাশরুরুল হকের নির্দেশে দুই এডিসি আর্মি হেডকোয়ার্টারের মিলিটারি সেক্রেটারি কর্নেল নাসিম (পরে সেনাপ্রধান) এর কাছে রিপোর্ট করেন। হাই কমান্ডের নির্দেশে বিকেল ৪টার দিকে তারা বঙ্গভবনে গেলে খন্দকার মুশতাক আহমেদকে প্রেসিডেন্টের চেয়ারে বসে থাকতে দেখেন।
ওইদিন বিকেলে ডিজিএফআই’র নির্দেশে বঙ্গভবনে গিয়ে একইরকম দৃশ্য দেখার আগে ধানমণ্ডি গিয়েছিলেন মেজর জিয়াউদ্দিন। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তায় ডিজিএফআই থেকে সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ডিউটি ছিলো। হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে রেডিও স্টেশন ঘুরে তিনি মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার রউফের কাছে রিপোর্ট করেন। রউফের নির্দেশে তিনি প্রথমে সেনাসদরে যান। পরে সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নির্দেশে রক্ষী বাহিনীর পরিচালক হাসানকে রেডিও স্টেশনে নিয়ে যান মেজর জিয়া।
তখন ডিজিএফআই থেকে কর্নেল মুসিউদ্দৌলাহ এবং কর্নেল মাহমুদুল হাসানকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ছবি তোলার নির্দেশ দেওয়া হলে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার ৪২ নম্বর সাক্ষী জিয়াউদ্দিনও তাদের সঙ্গী হন। তারা যখন ছবি তুলতে যান তখন বেলা ১১টা। খুনিদের বাইরে তারাই প্রথম ৩২ নম্বরে পৌঁছেছিলেন।
এর কিছুক্ষণ পর ব্যাটালিয়ন অ্যাডজুটেন্ট বা মেজরকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে পৌঁছান সাপ্লাই এবং ট্রান্সপোর্ট ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আব্দুর রব (পরে মেজর জেনারেল এবং মামলার ১০ নম্বর সাক্ষী)। তিনি জানান, ৩২ নম্বর রাস্তার মুখে কিছু আর্মি তাকে বাধা দিলেও পরিচয় দেওয়ার পর তাদের যেতে দেয়। সেখানে লাশ দেখে তিনি বুঝতে পারেন; গুজব নয়, মারাত্মক ঘটনা ঘটে গেছে।
জেনারেল রব জানান, পরে রাত সাড়ে ৩টার দিকে স্টেশন কমান্ডার লে. কমান্ডার আব্দুল হামিদ (নয় নম্বর সাক্ষী) তাকে নির্দেশ দেন: তোমাকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির লাশ, সেরনিয়াবাতের বাড়ির লাশ এবং শেখ মনির বাড়ির লাশ যতো দ্রুত সম্ভব ‘ডিসপোজ অব’ করতে হবে। কোথায় কিভাবে ‘ডিসপোজ অব’ করতে হবে জানতে চাইলে কর্নেল হামিদ বলেন: এটা বঙ্গভবনের নির্দেশ, সব লাশ বনানী কবরস্থানে দাফন করতে হবে।
তবে তার ইউনিটের সৈনিকরা যে ১৮টি মরদেহ নিয়ে আসে, তার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর মরদেহ ছিলো না। কারো জানাযায় অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকায় নিজেরাই যতোদূর পেরেছেন দোয়া-দরূদ পড়ে লাশগুলো তারা বনানী কবরস্থানে দাফন করেন বলে জানান রব।
তাকে যিনি লাশ দাফনের ব্যাপারে বঙ্গভবনের নির্দেশনার কথা জানিয়েছিলেন, সেই কর্নেল হামিদও ১৫ আগস্ট ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে গিয়েছিলেন। তিনি জানান: সেনাপ্রধান শফিউল্লাহর নির্দেশে বেলা ৩টার দিকে ৩২ নম্বরের অবস্থা দেখে এসে তিনি রিপোর্ট করেন। পরে রাত ৩টার দিকে মেজর এম এম মতিন কর্তৃপক্ষের নির্দেশের কথা জানিয়ে বঙ্গবন্ধুর মরদেহ ছাড়া অন্যগুলো বনানী গোরস্থানে দাফনের কথা বলেন।
এছাড়া ফার্স্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল মতিয়ার রহমানের নির্দেশে পরিস্থিতি দেখে আসার জন্য সকাল পৌণে ৯টার দিকে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে পৌঁছান রেজিমেন্ট অ্যাডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন সাহাদৎ হোসেন খান।
সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে এর বাইরে আর যিনি ৩২ নম্বরে গিয়েছিলেন তিন ক্যাপ্টেন বাশার। তিনি মামলার ৭ নম্বর সাক্ষী। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকলেও গাড়ি না থাকায় তিনি সেখানে পৌঁছান দুপুর ১২টা/সাড়ে ১২টার দিকে।
তিনি জানান: ১৯৭৫ সালের ১/২ আগস্ট তার নেতৃত্বে কুমিল্লার ওয়ান ফিল্ড আর্টিলারির ১০৫ জনের একটি কোম্পানি মেজর ফারুকের ফার্স্ট বেঙ্গল ল্যান্সারের কাছ থেকে প্রেসিডেন্টের বাসভবনের নিরাপত্তার দায়িত্ব বুঝে নেয়। গণভবনে জায়গা না থাকায় তিনি প্রেসিডেন্টের মিলিটারি সেক্রেটারি ব্রিগেডিয়ার মাশরুরুল হকের অনুমতি নিয়ে আজিমপুরের চায়না বিল্ডিংয়ে থাকতেন।
তিনি বলেন: ১৫ আগস্ট তার বাসার কাজের ছেলে দোকান থেকে ফেরত এসে জানায়, রুটি পাওয়া যাবে না; কারণ দেশে মার্শাল ল জারি হয়েছে। তখন রেডিও অন করে তিনি শোনেন: আমি মেজর ডালিম বলছি। শেখ মুজিবকে হত্যা করা হইয়াছে। সরকার উৎখাত করা হইয়াছে। দেশে মার্শাল-ল জারি করা হইয়াছে।
সঙ্গে সঙ্গে তিনি গাড়ি পাঠানোর জন্য গণভবনে টেলিফোন করেন। গাড়ি না আসায় ব্রিগেডিয়ার মাশরুরুল হকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তিনি ব্যর্থ হন। পরে শুনেছেন যে তিনি বন্দি ছিলেন।
‘সকাল ১০টা/১০:৩০টার দিকে সুবেদার মেজর আব্দুল ওয়াহাব জোয়ার্দার জিপে বাসায় এসে জানায়, ল্যান্সারের সৈনিকরা সকাল বেলা বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ঘেরাও করে। সাথে ক্যাপ্টেন হুদা ছিলো। তারা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যা করেছে। এই ঘটনায় ল্যান্স নায়েক শামসুও নিহত হয়েছে। জোয়ার্দার আরো বলে, স্যার যা হওয়ার হয়ে গেছে, বাতাসের উল্টোদিকে যাওয়া ঠিক হবে না,’ ওই সকালে জোয়ার্দারের সঙ্গে কথোপকথনের এরকম বর্ণনা দিয়েছেন বাশার।
তিনি বলেন: তখন আমি বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যেতে চাইলে জোয়ার্দার বলে, স্যার, আপনার এখন যাওয়ার দরকারে নেই। গাড়ি পাঠাচ্ছি। তখন আসবেন।
বেলা ১২টা/১২:৩০টার দিকে গাড়ি আসলে বাশার সেখানে যান। তখন লেকের পাশে ক্যাপ্টেন হুদা তাকে বলে: স্যরি, ব্রাদার। আই কুড নট ইনফর্ম ইউ আর্লিয়ার ফর অবভিয়াস রিজন। ইট ওয়াজ নট পসিবল (দুঃখিত ভাই, বিশেষ কারণে আমি তোমাকে আগে খবর দিতে পারি নি, সেটা সম্ভবও ছিলো না)।
(আগামীকাল ষষ্ঠ কিস্তি: অন্তঃহীন ঘুমে পঁচাত্তরের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক)







