দেশীয় বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের সুপারশপের পজ-ম্যানেজার থেকে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছে প্রতারক শরিফুল ইসলাম। অভিনব পন্থায় নিজের হাতঘড়িতে বিশেষ স্ক্রিমিং মিনি কার্ড রিডার সংযুক্ত করে গ্রাহকের এটিএম কার্ডের তথ্য চুরি করে ক্লোন কার্ড করে অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে কোটিপতি বনে যায় সে। চীনা প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় শরিফুল।
এছাড়াও হাজারো ছদ্মনাম, ছদ্মবেশ, ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে তিনি এ প্রতারণা করতো। কিছুদিন পর পরই বাসা পরিবর্তন করতো প্রতারক শরিফুল।
মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর মিরপুর এলাকায় নিজ বাসা থেকে এটিএম কার্ড জালিয়াতির এই মূল হোতাকে গ্রেপ্তার করে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগ।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কর্মকর্তারা বলছেন: শুধুমাত্র ৫টি ব্যাংকের (ব্রাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইবিএল ব্যাংক, ইউসিবিএল ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া) ভুয়া এটিএম কার্ড ব্যবহার করে প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার প্রমান পাওয়া গেছে। এর বাইরেও গত ৫ বছর ধরে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে এই প্রতারক।
প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে তার অবস্থান শনাক্ত সম্ভব হয়েছে জানিয়ে সিআইডির এক কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: কার্ড জালিয়াতির হোতা শরিফুল ইসলাম নিজে পুরোটাই ভুয়া। হাজার হাজার ছদ্মনাম, ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে চাকরি ও বাসা ভাড়া নিতো সে। কিছুদিন পর পরই বাসা পরিবর্তন করতো।
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন: মাস দুই-এক চাকরি করে গ্রাহকদের তথ্য সরবরাহ করতো সে। তারপর চাকরি ছেড়ে দিয়ে এক ব্যাংকের কার্ড দিয়ে অন্য ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে অর্থ উত্তোলন করতো। সবমিলিয়ে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকার সামগ্রী ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় শরিফুল।
গত মাসে বনানীর একটি স্বনামধন্য কোম্পানির সুপারশপে কেনাকাটা করেছেন এমন ৪৯ গ্রাহকের তথ্য নিয়ে নতুন কার্ড তৈরি করে ২০ লাখ টাকা তুলে নেয় একটি চক্র। এর পরই এ ঘটনার তদন্তে নামে সিআইডি।
সুপারশপগুলোতে গ্রাহকের এটিএম কার্ডের তথ্য চুরি করে ক্লোন কার্ডের মাধ্যমে যে প্রতারণা হচ্ছে তাতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
প্রতারণার স্বীকার এক ভুক্তভোগী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: কখনো ভাবতে পারি নাই এমনটা হবে। মনে করেছিলাম ব্যাংকিং সিস্টেমের গন্ডগোলের কারণে হিসাব ভুল দেখাচ্ছে। পরে যাচাই করে দেখতে পাই ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে প্রতারিত হয়েছি।
নিয়মিত বিভিন্ন স্বনামধন্য বিভিন্ন সুপারশপ থেকে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কেনাকাটা করা জাবিন আহমেদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: বিষয়টি খুব উদ্বেগজনক, আমরা যারা সুপারশপ থেকে নিয়মিত বাজার করি তাদের নিরাপত্তার কথা কর্তৃপক্ষকে ভাবতে হবে।
তথ্য চুরির ঘটনায় গ্রাহকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ কি না, জানতে চাইলে প্রতারক শরিফুল যে স্বনামধন্য কোম্পানির সুপারশপে চাকরি করত সেখানকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান লিটন বলেন: আমরা নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ না। ওই ছেলেটা কীভাবে এসব করলো সেটা তদন্তের আগে বলাটা কষ্টসাধ্য ছিল। কাস্টমারের অভিযোগ পাওয়ার পর দেখি পজ মেশিনের সামনের ছেলেটা কিছু লিখছে। তখনই তাকে সরাসরি এইচআর ডিপার্টমেন্টে এ্যাটাচ করেছিলাম, কিন্তু তার পর থেকে তাকে আর মোবাইলে পাওয়া যায়নি। তার দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী গ্রামের বাড়িতে গিয়েও দেখা গেছে ভুয়া ঠিকানা।
বর্তমানে নিয়োগসহ বিভিন্ন স্থানে নতুন নিয়মনীতি চালু হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন: এটা ছিল একটা এক্সিডেন্ট। পজ মেশিনগুলোর উপরে হুডি দিতে ব্যাংকগুলোকে আমরা বলেছি। এছাড়া সেখানে যে ছেলেটা কাজ করছে, তার শরীরে কোন ডিভাইস নেই নিশ্চিত করা হয়।
মার্চে ব্র্যাক ব্যাংকের ৯টি কার্ড নকল করে জালিয়াতি করা হয়েছে জানিয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের হেড অব কমিউনিকেশন জারা জাবীন মাহবুব বলেন: গ্রাহকদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমরা খতিয়ে দেখে বুঝলাম জালিয়াতি হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গেই আমরা তাদেরকে ক্ষতিপূরণ দিয়েছি।
তাদের প্রায় দেড়কোটি প্লাস্টিক কার্ড গ্রাহকের হাতে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন: বর্তমানে চিপ সংযুক্ত নতুন প্রযুক্তির একটা কার্ড গ্রাহকদের দেওয়া হচ্ছে। যেটা থেকে তথ্য চুরি সম্ভব নয়।











