জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশন নেটওয়ার্ক এবার যে ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশ ফিনল্যান্ড; আর সবচেয়ে কম সুখী আফ্রিকার দেশ দক্ষিণ সুদান।
গত বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১৫। এবার ১০ ধাপ নেমে তা হয়েছে ১২৫। এর আগে ২০১৭ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১০। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের সুখের সূচক ক্রমনিম্নগামী। বাংলাদেশের মানুষ কি তাহলে ক্রমেই আরও বেশি অসুখী হচ্ছে, নাকি এই রিপোর্টকে আদৌ আমলে নেয়ার কিছু নেই?
২০১২ সাল থেকে ‘ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট’ বা সুখী দেশের এই তালিকা প্রকাশ করে আসছে জাতিসংঘ। এবার তালিকায় ১৫৬ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৫ তম। বরাবরের মতো এবারও সুখী দেশের তালিকার শীর্ষে ইউরোপের, বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশগুলো যেমন ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, নরওয়ে, আইসল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, নিউজিল্যান্ড, কানাডা ও অস্ট্রিয়া।
তালিকা অনুযায়ী নিচের দিকে আছে দক্ষিণ সুদান, মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র, আফগানিস্তান, তানজানিয়া, রুয়ান্ডা, ইয়েমেন, মালাবি, সিরিয়া, বতসোয়ানা ও হাইতি।
কিন্তু বিস্ময়করভাবে দেখা যাচ্ছে, এবার দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে সুখী দেশ পাকিস্তান আর অসুখী দেশ আফগানিস্তান। প্রশ্ন হলো, প্রতিনিয়িত যুদ্ধাবস্থা আর তালেবান হামলার মধ্যে থাকা দেশ পাকিস্তান—যাকে সব সময়ই একটি অকার্যকর রাষ্ট্র বলে চিহ্নিত করা হয়, সেই দেশটি কী করে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে সুখী দেশ হয়? দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের পরেই আছে ভুটান। যদিও সুখী মানুষের দেশ হিসেবে ভুটানের খ্যাতি বেশ পুরনো। ভুটান সরকার মোট জাতীয় সুখ বৃদ্ধিকে তাদের জাতীয় লক্ষ্য হিসেবেও নির্ধারণ করেছে। কিন্তু এবার সুখের সূচকে সেই ভুটানের চেয়েও পাকিস্তানের এগিয়ে থাকাটা রীতিমতো বিস্ময়কর এবং তর্কসাপেক্ষও বটে।
প্রশ্ন ওঠে, সুখের মানদণ্ডগুলো তাহলে কী? তাহলে কি ইমরান খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে দেশটিতে সত্যি সত্যি পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে এবং সে দেশের মানুষেরা নিজেদের সুখী ভাবতে শুরু করেছেন?
সুখ বস্তুত এমন একটি অনুভূতি, যা ব্যক্তি নিজে অনুভব না করলে জোর করে কাউকে সুখী বানানো সম্ভব নয়। খুব অর্থকষ্টে থাকা একজন মানুষও অন্যান্য পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় নিজেকে সুখী ভাবতে পারেন। পক্ষান্তরে খুব প্রাচুর্যর মধ্যে থেকেও একজন মানুষ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কারণে অসুখী হতে পারেন বা অসুখী বোধ করতে পারেন।
উল্লেখ করা যেতে পারে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে ইমরান খান খোদ তাদের সংসদে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন—যে দেশের সাথে যুদ্ধ করে ১৯৭১ সালে তারা হেরে যায় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়। একসময় পূর্ব পাকিস্তান নামে যে অংশটিকে বস্তুত পশ্চিম পাকিস্তানিরা শাসন করতো, সেই দেশটি স্বাধীন হওয়ার অর্ধ শতাব্দী আগেই যেভাবে উন্নয়নের নানা সূচকে এগিয়ে যাচ্ছে, তা পাকিস্তানের জন্য দৃষ্টান্ত বলেও মন্তব্য করেন ইমরান খান।
অথচ সেই বাংলাদেশের চেয়ে সুখের সূচকে এগিয়ে পাকিস্তান—এটা কি ভাববার মতো বিষয় নয়?
জাতিসংঘের এই রিপোর্টকে আমলে না নিলে একরম, আর নিলে এটি অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি আমাদের দাঁড় করায়। যেমন একদিকে আমরা অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছি, মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়ছে, দৃশ্যমান উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু তারপরও কেন অসুখী হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে? তার মানে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের যে জায়গাগুলোতে উন্নয়ন হওয়ার কথা, সেখানে আমরা যথেষ্ট পিছিয়ে পড়ছি? মানুষের পেটে ভাত আর পরনে দামি কাপড় থাকলেই যে সুখী হয় না, বরং সুখী হওয়ার জন্য তার আরও যেসব নাগরিক অধিকার থাকার কথা, সেই অধিকারগুলো কি আমাদের রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে?
জাতিসংঘ মনে করে, ‘যেসব দেশে সমৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য আছে, অর্থাৎ যেসব দেশে সমাজের চূড়ান্ত পর্যায়ের আস্থা আছে, অসমতা কম ও সরকারের প্রতি জনগণের পূর্ণ আস্থা আছে—সেসব দেশ সাধারণ মাপকাঠিতে সুখী দেশ।’ বিশ্বের সুখী দেশের এই তালিকাটি তৈরি করতে ছয়টি মানদণ্ডকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। এগুলো হচ্ছে মোট দেশজ উৎপাদন, স্বাস্থ্যকর জীবনের প্রত্যাশা, স্বাধীনতা, উদারতা, সামাজিক সমর্থন ও দুর্নীতিমুক্ত সরকার ও ব্যবসা।
দেখা যায়, সবচেয়ে সুখী দেশের তালিতায় বরাবরই ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, ডেনমার্কের মতো দেশগুলোর নাম উঠে আসে। পক্ষান্তরে আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থাকে তালিকার সবচেয়ে নিচে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে অস্থির ও অস্থিতিশীল দেশগুলো। বাংলাদেশও কম সুখী দেশের তালিকায় থাকে। যদিও সব সময় এটি বলতে শোনা যায় যে, বাংলাদেশের মানুষ খুবই সুখী।
বলা হয়, সুখ একটি মানবিক অনুভূতি। একজন দুর্নীতিমুক্ত আপাদমস্তক ভালো মানুষও ব্যক্তিজীবনে অসুখী হতে পারেন। আবার বহু দুর্নীতিবাজ মানুষই ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে সুখী। গ্রামের একজন দিনমজুরও দেশের সবচেয়ে সম্পদশালী ব্যক্তির চেয়ে অধিকতর সুখী হতে পারেন। আবার অতি সম্পদশালী এবং বাইরে থেকে একজন মানুষকে যথেষ্ট সুখী বলে মেনে হলেও, তার পরিবারে কিংবা তার ব্যক্তিজীবনে এমন কোনো ক্ষুদ্র বিষয়ও থাকতে পারে, যা তাকে প্রতিনিয়ত কাঁদায়, ভোগায়। তাকে সুখী হবার পথে বিরাট অন্তরায় তৈরি করে। কেউ আবার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সব আয়োজনের ভেতরেও অসুখী হতে পারেন। জীবনানন্দ এই অবস্থাকে বলেছেন ‘বিপন্ন বিস্ময়’। ব্যাখ্যাতীত এই অবস্থায় একজন দারুণ সুখী মানুষও গলায় একগোছা দড়ি পেঁচিয়ে ঝুলে পড়তে পারেন অশ্বত্থের ডালে। ফলে সুখের সর্বজনীন কোনো সংজ্ঞা বা কোন পরিস্থিতিতে মানুষ সুখী হবে, সে বিষয়ে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়ার সুযোগ নেই।
প্রতিটি মানুষের সুখী হবার তরিকা ভিন্ন। তবে আমরা যখন কোনো একটি রাষ্ট্রের মানুষের সামগ্রিক সুখের গড় বা হ্যাপিনেসের জেনারেল ট্রেন্ড নিয়ে কথা বলি, তখন সেখানে সেই দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, মানুষের সহনশিলতা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা ও বিশ্বাস কেমন সেই বীজগণিতও বিবেচনায় রাখতে হয়। কেননা একজন ব্যক্তির সুখী হবার পেছনে তার পারিপার্শ্বিকতা বিরাট ভূমিকা পালন করে।
অনেক সময় সুখের পেছনে ছুটতে গিয়ে ব্যর্থতাও অসুখের জন্ম দেয়। যে কারণে কোনো কোনো পণ্ডিত সুখের পেছনে অধিকতর ছোটাছুটিকে ক্ষতিকর বলে মনে করেন। কেউ কেউ সুখকে প্রজাপতির সঙ্গে তুলনা করে বলেন, সুখ হচ্ছে প্রজাপতির মতো যাকে তাড়া করে ধরা যায় না। বরং নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকলে সে নিজেই আপনার গায়ে এসে বসবে।
গত বছর ‘সুখী হওয়ার পাঁচটি উপায়: অধ্যাপকের পরামর্শ’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করে বিবিসি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞান এবং কগনিটিভ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক লরি স্যান্টোসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ‘বিজ্ঞানে এটা প্রমাণ হয়েছে যে সুখী হতে হলে সচেতন প্রচেষ্টার প্রয়োজন।’
তার মতে, ‘সুখী হওয়ার বিষয়টি এমন নয় যে এটা আপনা-আপনি হয়ে যায়। সুখী হওয়ার জন্য আপনাকে এটা চর্চা করতে হবে।’ কিভাবে সুখী হতে হবে তার কিছু কলাকৌশল তিনি শিক্ষার্থীদের শেখান সপ্তাহে দুদিন। সুখী হতে তিনি কিছু উপায়ও বাতলে দেন; যেমন-নিশ্চিন্তে ঘুমানোর চেষ্টা করা; প্রতি রাতে আট ঘণ্টা করে ঘুমানো; প্রত্যেকদিন ১০ মিনিট করে মেডিটেশন বা ধ্যান করা; পরিবার ও বন্ধুদের সাথে আরও সময় কাটানো’ সোশ্যাল মিডিয়ায় যোগাযোগের পরিবর্তে বাস্তবে মানুষের সাথে যোগাযোগ বাড়ানো।
অধ্যাপক স্যান্টোস মনে করেন, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সুখের বিষয়ে মিথ্যা যেসব ধারণা পাওয়া যায় সেসবে ভেসে যাওয়া উচিত নয়।
পণ্ডিতেরা বলেন, একজন মানুষের পক্ষে প্রতিনিয়ত সুখী থাকার সুযোগ নেই। বরং সুখী থাকার চেষ্টা থাকতে পারে। সুখী থাকার ভানও করা যেতে পারে। আবার একজন মানুষ সব সময়ই অসুখে বা নিরানন্দেও থাকেন না। খুব জটিল কোনো রোগে আক্রান্ত একজন মানুষও বিছানায় শুয়ে যদি কোনো একটি ভালো সংবাদ শোনেন, তিনিও মুচকি হেসে ওঠেন।
তার মানে চরম অসুখে থাকা মানুষও সব সময় অসুখী নন। বিজ্ঞানীরা বলেন, ব্যক্তির সুখের ওপর মানুষের কোনো হাত নেই। বরং সুখ হচ্ছে একটি জৈবচেতনা যা সৃষ্টি হয় মানুষের মস্তিষ্কে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।








