বিশ্বের যেসব মানবিক দেশ সবচেয়ে বেশি শরণার্থী গ্রহন করে অস্ট্রেলিয়া তাদের অন্যতম। প্রশান্তপাড়ের এই মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্রের আইনটি এমন যে কোন বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি যদি অস্ট্রেলিয়া পৌঁছে প্রমান করতে পারেন দেশে ফিরলে তার জীবন বিপন্ন হতে পারে তাহলে এই রাষ্ট্র তাকে আইনত আশ্রয় দিতে বাধ্য। তবে আপনার জীবন যে বিপন্ন সে গল্প আপনি এদের কাছে বললেই হবে না, এই রাষ্ট্র তা নিজস্ব উদ্যোগে এর সত্যমিথ্যা তদন্ত করবে। শরণার্থী গ্রহনে এই রাষ্ট্র দেখে একজন বিপদগ্রস্ত মানুষ। কখনো তার ধর্ম-বর্ণ দেখে না।
কিন্তু হঠাৎ করে অস্ট্রেলিয়া আশ্রয়প্রার্থীর ধর্ম-বর্ণ দেখার কথা বলেছে! আজ দু’দিন ধরে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী টনি এবোট, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলি বিশপসহ মন্ত্রীরা বলা শুরু করেছেন, সিরিয়া-ইরাকের শরণার্থীদের আশ্রয় দেবার ক্ষেত্রে তারা বাছবিচার করবেন! অগ্রাধিকার দেবেন সেখানকার সংখ্যালঘুদের! নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের নারী শিশুদের আশ্রয় প্রশ্নে গুরুত্ব দেবার ঘোষনা দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া।
সিরিয়া-ইরাকের সংখ্যালঘু মানে মুসলমান না, খ্রিস্টান, ইহুদি, দুর্জ মুসলিমসহ এথনিক বিভিন্ন গ্রুপ। দুর্জ নামের একটি মুসলিম জনগোষ্ঠী আছে লেবানন-সিরিয়ায়। যারা ধর্মকর্ম পালন শুরু করেন বয়স চল্লিশ বছর হবার পর! কারণ তারা মনে করেন হযরত মোহাম্মদ (সা:) চল্লিশ বছর বয়স হবার পর নবুওত পেয়েছিলেন! লেবাবনে এই দুর্জদের অনেকে অবস্থাপন্ন ধনী ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। লেবানিজ পার্লামেন্টেও তাদের সদস্য আছে। বনেদি সুন্নি-শিয়ারা তাদের মুসলমান মনে করে না। সিরিয়ায় আইএস জঙ্গীরা যাদের টার্গেট করেছে তাদের মধ্যে দুর্জরাও আছে। আইএস জঙ্গীদের কার্যক্রম বাড়ার পর এসব দুর্জ, ইহুদি, আরমানিয়ানসহ নানান সংখ্যালঘুরা বাড়িঘর হারিয়ে জর্দানসহ আশেপাশের নানাদেশের সীমান্তের শরণার্থী শিবিরগুলোয় আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘ উদ্বাস্তু হাইকমিশনের মাধ্যমে এমন ১২ হাজার শরণার্থী নেবার ঘোষনা দেয়া হয়েছে।
এমনিতেই একটি ক্যাথলিক খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু এবার শরণার্থী গ্রহন প্রশ্নে যে ধর্ম-বর্ণের বিষয়টি সংযুক্ত করে দেয়া হয়েছে, এটি এই ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের চরিত্রের সঙ্গে মেলে না। কারণ এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠট মানুষজন ধর্মকর্ম করেন না অথবা তা বিশ্বাস করেন না। কে ধার্মিক, আস্তিক-নাস্তিক এসব নিয়েও এ রাষ্ট্রের কোন মাথাব্যথা নেই। রাষ্ট্র দেখে শুধু কে কাজ করে কে করে না। কারণ কাজ না করলে কাজ না পাওয়া পর্যন্ত তাকে ভাতাসহ নানাকিছু দিতে হয়। এমন একটি দেশ হঠাৎ করে শরণার্থীর ক্ষেত্রে শুধু ক্রিস্টানসহ নানা ধর্ম-বর্ণ দেখা-চেনা শুরু করেছে দেখে অনেকে মেলাতে শুরু করেছেন নানা হিসাব!
উল্লেখ্য অস্ট্রেলিয়া এমনিতে অভিবাসীদের দেশ। আদিবাসীদের বাইরের সব লোকজনই এদেশে অভিবাসন নিয়ে এসেছেন। কেউ হয়তো এক দেড়শ বছর আগে অথবা পরে। আর শরণার্থী গ্রহনের ব্যাপারে এ দেশটার কাছে এক সময় বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক দেশ, যুদ্ধ-গৃহযুদ্ধ কবলিত দেশ গুরুত্ব পেয়েছে। সে কারণে যেসব দেশে সমাজতন্ত্র ছিল, যুদ্ধ ছিল সে সব দেশের লোকজন এদেশে আশ্রয় পেয়েছেন বেশি। অস্ট্রেলিয়া অভিমুখে শরণার্থী স্রোত আগেও ছিল এখনো আছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর একসঙ্গে অস্ট্রেলিয়া সবচেয়ে বেশি শরণার্থী নেয় ১৯৮০-৮১ সালে। সেই সময় ২০ হাজার ৭৯৫ জন শরণার্থী গ্রহন করা হয়েছিল। এটি জাতিসংঘ উদ্বাস্তু বিষয়ক হাইকমিশনের হিসাব। ২০০০ সালের প্রথম দিকে জাতিসংঘ উদ্বাস্তু বিষয়ক হাইকমিশনের মাধ্যমে প্রতি বছর ৬ হাজার করে শরণার্থী নেয়া হতো। ২০১২-১৩ সালে জুলিয়া গিলার্ডের সরকার এই সংখ্যা দ্বিগুণ করে বছরে ১২ হাজার শরণার্থী গ্রহন করেছে। কিন্তু পরবর্তিতে জুলিয়া গিলার্ড তথা লেবার পার্টির সরকার যে ক্ষমতা হারায় এর অন্যতম কারণ ছিল এই শরণার্থী ইস্যু। কারণ অস্ট্রেলিয়ার করদাতারা তাদের করের টাকা শরণার্থীদের পেছনে খরচ করাকে পছন্দ করেন না।
বর্তমান রক্ষণশীল লিবারেল কোয়ালিশন সরকার শরণার্থী স্রোত শক্তহাতে নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গত নির্বাচনে ক্ষমতা এসেছে। এরা ক্ষমতায় আসার পর ২০১৪ সালে শরণার্থী ২০ হাজার থেকে কমিয়ে গ্রহণ করেছে ৬ হাজার ৫ শ ১ জন। অথচ একই সময়ে সবচেয়ে বেশি শরণার্থী গ্রহণ করেছে আমেরিকা! একই সময়ে আমেরিকা ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজার পর্যন্ত শরণার্থী গ্রহন করেছে। এখন অস্ট্রেলিয়া সরকার বছরে ১৩ হাজার ৭৫০ জনকে প্রটেকশন ভিসা দেয়। কিন্তু সবাইকে শরণার্থীর মর্যাদা দেয় না। সাগরে ডুবে মরা শিশু আয়লান ট্র্যাজেডির পর ইউরোপ যেখানে বিপুল সংখ্যক শরণার্থী নিচ্ছে সেখানে অস্ট্রেলিয়া মাত্র ১০ হাজার জনকে আশ্রয় দেবার ঘোষনা দিয়েছিল। বিরোধীদল সংখ্যাটি আরো বাড়ানোর জন্যে সরকারকে চাপ দিচ্ছিল। এরপর প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন তারা ১২ হাজার শরণার্থী নেবেন। সঙ্গে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে শরণার্থীদের ধর্ম-বর্ণের হিসাব!
মজার বিষয় অস্ট্রেলিয়ার বিরোধীদল লেবার পার্টিও এখন পর্যন্ত এর শক্ত বিরোধিতা করেনি! তৃতীয় বৃহত্তম দল অস্ট্রেলিয়ান গ্রীন ১২ হাজার শরণার্থী গ্রহন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এটি হোক একটি ভালো সূচনা। আগামিতে আমরা আরও শরণার্থী নেবো। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী কৌশলগতভাবে সংখ্যালঘু শরণার্থী গ্রহনের আড়ালে মুসলিম শরণার্থী না নেবার ঘোষণা দিয়েছেন, তার শক্ত বিরোধিতা আসেনি, ধারণা করা যাচ্ছে তারাও করছে ভোটের হিসাব।
অস্ট্রেলিয়ার মুসলিমদের নিয়ে নানা সমস্যা দেখা দেয়া শুরু করেছে এই সমাজ-রাষ্ট্রে! উল্লেখ্য এদেশের বাসিন্দা মুসলিম জনগোষ্ঠীর সিংহভাগ লেবাননসহ বিভিন্ন আরব দেশ থেকে আসা লোকজন। লেবানিজদের অনেকে চল্লিশের দশকে এসেছেন। এদেশের মুসলিম কাউন্সিলের গ্র্যান্ড মুফতিও লেবানিজ বংশোদ্ভূত। অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসনপ্রাপ্তদের যাদেরকে আইনভঙ্গসহ নানান অপরাধের বেশি যুক্ত পাওয়া যায় তাদের পুরোভাগে আছে এই লেবানিজরা! যদিও ভোটের বাজারে এদের কদর বেশ! মুসলিমদের ঈদের জামায়াতের মতো বড় সমাবেশগুলোয় মন্ত্রী এমপিরা এসে হুমড়ি খেয়ে পড়েন! এমনিতে ইসলাম ধর্মসহ কোন ধর্ম পালনে এদেশে কোন বাধা নেই। যার ধর্ম তার কাছে রাষ্ট্রের কি বলার আছে।
কিন্তু আইএস বিরোধী যুদ্ধ শুরুর পর মুসলমানদের ব্যাপারে যেন নড়েচড়ে বসেছে এই রাষ্ট্র, এই সমাজ! আমেরিকা যেখানে যুদ্ধ করতে যায় পিছুপিছু অস্ট্রেলিয়াও যায়! এটি কেন জানি বেশ গৌরবের মনে করে পুঁজিবাদী অর্থনীতির এই রাষ্ট্র! আমেরিকার সঙ্গে এরা এভাবে আফগানিস্তানে-ইরাকে যুদ্ধ করতে গেছে। এখন গেছে আইএস বিরোধী যুদ্ধে! কিন্তু আইএস বিরোধী যুদ্ধে গিয়ে উল্টো আরেক সমস্যা মাথা ঘোরায় এই রাষ্ট্রের! উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অস্ট্রেলিয়ান মুসলিম ছেলেমেয়ে দেশ থেকে পালিয়ে গিয়ে যোগ দিয়েছে আইএসের সঙ্গে! এ কারণে আইএস বিরোধী রণক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ান সেনাবাহিনী যুদ্ধ করছে অনেক অস্ট্রেলিয়ান মুসলিম ছেলেমেয়ের বিরুদ্ধে! যাদের বেশিরভাগ আরব বংশোদ্ভূত!
পরিস্থিতি সামাল দিতে এরমাঝে নতুন দুটি আইন করা হয়েছে! প্রথম আইনে বলা হয়েছে, আইএস যুদ্ধ থেকে ফেরার পর সংশ্লিষ্টদের বিচারের সম্মুখিন করা হবে। দ্বিতীয় আইনটি হয়েছে যারা আইএস যুদ্ধে গেছে বাতিল করা হবে তাদের নাগরিকত্ব! উল্লেখ্য এমনিতে অস্ট্রেলিয়া যাদের একবার প্রটেকশন এবং নাগরিকত্ব দেয় তা বাতিল করে না। বিদেশে অস্ট্রেলিয়ান কেউ অপরাধে ধরা পড়লে সেক্ষেত্রেও দেখে যাতে সে ন্যায়বিচার পায়। এবারই শুধু আইন করলো নাগরিকত্ব বাতিলের! এই ফাঁড়ায় যারা পড়ছেন তারা সবাই মুসলিম।
সর্বশেষ সিডনির মার্টিন প্লেসের লিন্ড ক্যাফে রেষ্টুরেন্টে জিম্মি ঘটনায়ও মুসলমানদের ব্যাপারে নড়চড়ে বসে অস্ট্রেলিয়ার মানুষজন! ইরান থেকে আসা রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্ত এক বন্দুকধারীর হাতে জিম্মি ঘটনায় প্রাণ যায় দুই সাধারণ অস্ট্রেলিয়ানের! জিম্মি নাটকের অবসান করতে গিয়ে সেই বন্দুকধারীও মারা যায়। এরপর অনুসন্ধান শুরু হয় এমন একটি লোক কি করে অস্ট্রেলিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছিল! ওই ঘটনা স্বত্ত্বেও দেশটায় বসবাসরত শান্তিপ্রিয় মুসলমানদের যাতে কোন সামাজিক নিরাপত্তা সমস্যা দেখা না দেয় সে কারওণ বেশ সতর্কতাও নেয়া হয়েছিল। স্বেচ্ছাসেবকরা ট্রেনে বাসে মুসলিম নারীপুরুষদের পাহারা দিয়ে নিয়ে যায় যাতে কেউ তাদের সঙ্গে কটাক্ষমূলক কোন আচরন না করে। কিন্তু আইএস আর লিন্ড ক্যাফের ঘটনা যে এদেশের জনমানসে ক্ষত তৈরি রেখেছে তাতো সত্য বাস্তব। আফগানিস্তান, ইরাকে অস্ট্রেলিয়া যুদ্ধে যাবার পর এদেশের নানান স্থাপনার নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। আইএস বিরোধী যুদ্ধে যাবার পর এসব নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে আরো বহুগুণ। শুধু সিডনি হারবার ব্রিজ দিনেরাতে পাহারা দেয়া পঁয়ত্রিশজন নিরাপত্তা প্রহরী! এমন দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ সেতুসহ নানা স্থাপনার নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। এসবে বছরে খরচ বেড়েছে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার! মুসলিম এলাকাগুলোতে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। সিডনির লাকেম্বা এলাকাতে বাংলাদেশের আহসানুল্লাহ টিম গড়ার চিন্তা করছিলেন মুসলিমদের একটি গ্রুপ! শুরুতেই পণ্ড করে দেয়া হয়েছে সে অপচেষ্টা!
প্রশ্ন উঠেছে, এবার সিরিয়া-ইরাকের শরণার্থী নেবার ঘোষণার সঙ্গে শুধু খ্রিস্টানসহ সে সব দেশের সংখ্যালঘুদের নেবার বিষয়টি কি সেইসব ক্ষতের বহি:প্রকাশ! এটি কিন্তু অস্ট্রেলিয়ান মুসলিমদের প্রতি এই রাষ্ট্রের এক ধরণের অনাস্থার বহি:প্রকাশও বটে! অস্ট্রেলিয়ার মুসলিমরা হয়তো যা বুঝতে পারছেন। মুখ ফুটে বলতে পারছেন না!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







