স্ত্রী কামরুন্নাহার লাকীকে হত্যার দায়ে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া সামী রফিকুল ইসলাম বুলবুলকে খালাস দিয়েছে হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুস ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর হাইকোর্ট বেঞ্চ বৃহস্পতিবার এই রায় দেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মনিরুজ্জামান রুবেল, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মারুফা আক্তার শিউলী। আর আসামি রফিকুল ইসলাম বুলবুলের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হাসনা বেগম।
আসামি রফিকুল ইসলাম বুলবুল বিচারের শুরু থেকেই পলাতক। তিনি সিঙ্গাপুরে থাকেন বলে জানা গেছে।
১৯৯৮ সালের ১৭ নভেম্বর সিঙ্গাপুরে বগুড়ার কামরুন্নাহার লাকীর মৃত্যু হয়। পরের দিন তার মৃতদেহ দেশে আসে। এরপর ১৯ নভেম্বর বগুড়া থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়।
এর প্রায় এক বছর পর ১৯৯৯ সালের ২৬ আগস্ট রফিকুল ইসলাম বুলবুলের বিরুদ্ধে বগুড়া থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন বিশেষ আইনে মামলা করেন লাকীর মা জহুরা হায়দার।
এই মামলার অভিযোগে বলা হয়, ১৯৯৬ সালের ৫ জুলাই রফিকুল ইসলাম বুলবুলের সঙ্গে লাকীর বিয়ে হয়। বিয়ের দিন থেকেই যৌতুকের দাবিতে রফিকুলের মা-বাবা বিবাদ শুরু করে। পরবর্তীতে যৌতুকের দাবিতে লাকীর উপর শারীরিক-মানসিক নির্যাতন শুরু করে।
পরে একসময় যৌতুকের দাবি মেটানোও হয়। কিন্তু বিয়ের ৮ মাসের মাথায় রফিকুল ব্যবসার জন্য আবার দুই লক্ষ টাকা চায় শ্বাশুরি জহুরা হায়দারের কাছে। টাকা দিতে অস্বীকার করলে রফিকুল লাকীকে রেখে সিঙ্গাপুর চলে যায়। লাকী তখন সরকারী আজিজুল হক কলেজে ইংরেজি বিভাগে সম্মানের ছাত্রী ছিলেন।
পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে রফিকুল লাকীকে সিঙ্গাপুর নিয়ে যায়। সেখানে ৯০৪ ব্লকের ৯১ নাম্বার স্ট্রিটে ১৩৫ জুরং ওয়েস্ট ভবনে তারা ওঠে। সেখান থেকে মাঝে মধ্যেই ফোনে মায়ের সঙ্গে কথা হতো লাকীর। ১৯৯৮ সালের ১৫ নভেম্বর ফোনে লাকীর সঙ্গে কথা বলে মা জহুরা হায়দারের আশঙ্কা তৈরি হয়। তার দুইদিন পর অর্থাৎ ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টায় মা জহুরা হায়দার লাকীকে ফোন করলে লাকী জানায় সে কিছু দেখতে পাচ্ছে না। কথা বলার এক পর্যায়ে ফোন কেটে যায়। পরে বাংলাদেশ সময় রাত ৮টার দিকে রফিকুল ইসলাম বুলবুল জানায় ১২তলা ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছ।
লাকীর মা জহুরা হায়দার মামলায় উল্লেখ করেন যৌতুকের কারণে ধারাবাহিক নির্যাতনেই ১২তলা ভবন থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
এ মামলায় রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ২০১১ সালের ১২ ডিসেম্বর রায় দেয়। রায়ে একমাত্র আসামি রফিকুল ইসলাম বুলবুলকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর রাজশাহীর আদালত মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য হাই কোর্টে ডেথ রেফারেন্স পাঠায়। সেই ডেথ রেফারেন্সের ওপর শুনানি শেষে হাই কোর্ট মামলার একমাত্র আসামি নিহতের স্বামী রফিকুল ইসলাম বুলবুলকে খালাস দেয়।
রায়ের সময় আদালতে লাকীর মা ৮০ বছরের বৃদ্ধা জহুরা হায়দার উপস্থিত ছিলেন। রায়ের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, মেয়েকে হারিয়েছি। এখন তাকে হত্যার বিচারও পেলাম না।
এ বিষয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মনিরুজ্জামান রুবেল বলেন, লাকী মারা যাবার পরপরই সিঙ্গাপুর পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায় ও পরে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়।
তাদের ওই প্রতিবেদন ইন্টারপোলের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। ওই তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, লাকীর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যার কোন আলামত পাওয়া যায়নি। আত্মহত্যা বলে প্রতীয়মান হয়। হাইকোর্ট সিঙ্গাপুর পুলিশের ওই তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্বাস করেছেন। এ কারণে আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
মনিরুজ্জামান রুবেল আরও বলেন, সন্তান না হওয়ায় লাকী হতাশাগ্রস্ত ছিল। এজন্য সে চিকিৎসাও নিয়েছে। সেই হতাশা থেকেই আত্মহত্যা করেছে বলে প্রমাণ মিলেছে। হাইকোর্ট এটাকে বিশ্বাস করে আসামিকে খালাস দিয়েছে। এর আগে, যৌতুকের জন্য লাকীকে নির্যাতন করা হতো, এ কারণে ১২তলা ভবন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যা করা হয়েছে, সাক্ষীদের এমন জবানবন্দি বিশ্বাস করে আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল বিচারকি আদালত।






