১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ছিলো শুক্রবার। আমি তখন ইউএনবির সর্বকনিষ্ঠ রিপোর্টার। অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে ক্রাইমও কাভার করতে হতো। তখনো মোবাইল টোবাইল এরকম অবস্থায় আসেনি। টেলিভিশন বলতে ছিলো বিটিভি যেখানে শুধু রাজারাজড়াদের বিষয়-আশয়ই জানা যেতো। এর বাইরে কিছু জানতে হলে অপেক্ষা করতে হতো রাত ৮টার বাংলা সংবাদের জন্য। ল্যান্ড ফোনই যেহেতু একমাত্র বিকল্প, অনেক সময়ই তাই রিয়েল টাইমে অনেক কিছু কাভার করা যেতো না। ঘটনা জানার পর ছুট লাগাতে হতো সাংবাদিকদের।
আর সেদিন শুক্রবার ছিলো বলে দিনটা একটু রয়েসয়েই শুরু হয়েছিলো। বড়কিছু ঘটে যাচ্ছে এরকমও মনে হয়নি। দুপুর নাগাদ মৌচাকে ইউএনবি অফিসে পৌঁছে ফোনে নিউজ খোঁজার মিশনে এক খবরে বিস্ময়ের যতো প্রতিশব্দ আছে সব একযোগে মাথায় চলে এসেছিলো। আমাদের সময়ের নায়ক সালমান শাহ আর নেই। তাও সেটা স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। আত্মহত্যা করেছেন সালমান শাহ।
কয়েক প্যারা নিউজ লিখে ছুট লাগালাম সালমানের ইস্কাটনের অ্যাপার্টমেন্টে। সেখান থেকে রমনা থানা, সালমান ওরফে ইমনদের গ্রিন রোডের বাড়ি এবং এফডিসি হয়ে আবার যখন মৌচাকে ইউএনবি অফিসে ফিরে আসলাম তখন রিপোর্ট লেখার জন্য সবকিছুই আমার কাগজের নোটবুকে। সিনেমাপাড়ার খবর যেহেতু কম জানা, এক ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছাড়া তার আর কোনো সিনেমা দেখা নেই, আর এখনকার মতো গুগল সার্চ করলেই সব ইতিহাস জানা যায় না; তাই সালমান শাহ’র ডিটেইলস জানতে সিনেমা কাভার করা সাংবাদিকদের সহায়তা নিতে হয়েছিলো অনেক।
একে তো দেশের ওই সময়ের সেরা নায়কের মৃত্যু, তাও আত্মহত্যা, আর আমার চেয়ে সামান্য বড় একটা ছেলের চেলে যাওয়া; বুকটা দুমড়ে-মুচড়ে গেলেও সাংবাদিক হিসেবে ভালো কাভারেজ আর দিনশেষে একাধিক রিপোর্টে অফিসের কর্তাব্যক্তিদের বাহবা জুটেছিলো।
তবে তখনো জানতাম না সালমান শাহ’র মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে ক্রাইম রিপোর্টার হিসেবে আমাদের আরো অনেকদিন রিপোর্ট করতে হবে। দীর্ঘ এক কাভারেজে পরিণত হবে তার আত্মহত্যার ঘটনা।
দীর্ঘ ওই রিপোর্টিং এর শুরু সালমান শাহ’র মা নীলা চৌধুরীর বিভিন্ন বক্তৃতা-বিবৃতিতে। নীলা চৌধুরী অনেক আগে থেকেই গণমাধ্যমে পরিচিত। তবে সেটা যতোটা না বাংলাদেশের এক নম্বর নায়কের মা হিসেবে, তার চেয়েও অনেক বেশি তার নিজস্ব ক্যারিশমায়। জাতীয় পার্টির নেত্রী ছিলেন তিনি। সে হিসেবে সালমান শাহ সালমান হওয়ার আগে থেকেই তিনি পরিচিত। তবে ছেলের মৃত্যুর পর ভুল-ঠিক বক্তৃতা-বিবৃতিতে তিনি শুধু মা হিসেবেই আবির্ভূত হলেন।
ছেলে আত্মহত্যা করেছে, এটা তিনি কোনোভাবেই মানতে পারছিলেন না। একে হত্যা হিসেবে দাবি করে সরাসরি দায়ী করলেন আলোচিত ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তিনি বলতেন, আত্মহত্যা হলেও এর জন্য আজিজ ভাই-ই দায়ী। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে সালমানের মৃত্যুকে কখনোই তিনি আত্মহত্যা বলতেন না, হত্যাকাণ্ড বলতেন।
একে তো দেশের সেরা নায়কের মৃত্যু, আত্মহত্যার ঘটনাকে হত্যা হিসেবে দাবি, দেশের এক শীর্ষ ব্যবসায়ীর দিকে অভিযোগের আঙুল; সব ধরণের সংবাদ উপাদানে সংবাদমূল্য তার অসাধারণ।
তবে প্রথম কয়েকদিন একপক্ষীয় ছিলো সব সংবাদ। সব সংবাদই হচ্ছিলো নীলা চৌধুরীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে। অভিযুক্তর বক্তব্য সেখানে অনুপস্থিত। দ্বিতীয় বা তৃতীয়দিন আমি তাই আজিজ মোহাম্মদ ভাই’র বক্তব্য নেওয়ার পরিকল্পনা করি। অফিসে সিনিয়র দুয়েকজনের কাছে তার ফোন নম্বর খোঁজ করি। তাদের কাছে নম্বর নেই। তবে তারা ভয় পাইয়ে দেওয়ার মতো কথা বললেন। আজিজ ভাইকে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে গেলে আমারই নাকি সমস্যা হতে পারে।
তাদের এসব বক্তব্য অনেকটা মিথের মতো মনে হলো। তারচেয়েও বড় বিষয় তার বক্তব্য জানা আমার এজন্য দরকার যে সাংবাদিকতার প্রাথমিক পাঠ আমাকে এ শিক্ষা দেয়নি যে কারো বক্তব্য ছাড়া আমি তার বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য প্রকাশ করতে পারি। আর আমি যেহেতু অভিযুক্তর বক্তব্য জানতে যাচ্ছি, সেখানে আমার ভয় কী! তারপরও কেউ কেউ হাস্যকরভাবে বললেন, আজিজ মোহাম্মদ ভাই’র সঙ্গে কথা বলাটাই বিপদের হতে পারে।
অযৌক্তিক কথাবার্তা পাত্তা না দিয়ে আমি তার টেলিফোন নম্বর সংগ্রহের চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। ইউএনবি অফিসে তখন বেশ কয়েকটা টেলিফোন গাইড ছিলো। একটা ছিলো কোনো একটা চেম্বার সংগঠনের। কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করে সেখানে তার নম্বর পেয়ে আমার চোখ ছানাবড়া। তখনকার ছয় ডিজিটে তার বাসার টেলিফোন নম্বর: ৮৮৮৮৮৮। যেহেতু রাত হয়ে গিয়েছিলো, তাই বাসার নম্বরেই ফোন দিলাম।
ভারিক্কি গলায় একজন ফোন ধরে বললেন, তিনিই আজিজ মোহাম্মদ ভাই। তবে আমি যে জাহিদ নেওয়াজ খান, আমি যে ইউএনবির রিপোর্টার সেটা তিনি কিভাবে নিশ্চিত হবেন! পরে বললেন, তিনি নিজ থেকে খোঁজ করে আমাকে কলব্যাক করছেন। আমি আমার নম্বর দিতে চাইলে দরকার নেই বলে ফোন রেখে দিলেন তিনি।
কয়েক মিনিট পর ইউএনবির পুরনো অ্যানালগ নম্বরে কেউ একজন ফোন করে আমাকে চাইলেন। আমি ফোন ধরার পর আগের সেই কণ্ঠ শোনা গেলো। তিনি বললেন, তিনি খোঁজ নিয়ে আমার পরিচয় নিশ্চিত হয়েছেন। এখন আমি কী জানতে চাই সেটা বলতে পারি। বুঝলাম, এসবই তার ভয় দেখানোর বা মুগ্ধ করার চেষ্টা। তার এরকম রহস্যজনক আচরণই তার সম্পর্কে অনেক সত্যমিথ্যা মিথের জন্ম দিয়েছে।
সে যাই হোক, আমার যেটা জানার দরকার সেটা আমি জানলাম। নীলা চৌধুরী তার দাবির পেছনে যেসব যুক্তি দিয়েছিলেন সেগেুলোকে ভিত্তি করে তীর্যক অনেক প্রশ্নও করলাম। কখনও তিনি হো হো করে হাসলেন। কখনও সিরিয়াস ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন।
পরদিন ফোন আসলো দুই পক্ষ থেকেই। নীলা চৌধুরী তার বক্তব্যের সমর্থনে আরো কিছু বক্তব্য দিলেন।
আর আজিজ মোহাম্মদ ভাই ফোন করে বললেন, তিনি শুধু ইউএনবির সঙ্গে কথা বলেছেন, কিন্তু সব পত্রিকাতেই তার বক্তব্য কিভাবে ছাপা হলো! আমি বললাম, ইউএনবি যেহেতু নিউজ এজেন্সি, তাই মেজর যতো পত্রিকা তারা আমাদের নিউজ সাবসক্রাইব করে এবং সে হিসেবে অনেকে আমাদের ক্রেডিটে আর অনেকে নিজেদের নামে তার জবাব প্রকাশ করেছে।
এভাবে দুইপক্ষের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে বিতর্ক চললো। এর মধ্যে নীলা চৌধুরীর পাশাপাশি আজিজ মোহাম্মদ ভাইও ঢাকার তরুণ রিপোর্টারদের অনেকের পরিচিত হয়ে উঠলেন। এক তরুণ সাংবাদিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পথশিশুদের জন্য যে স্কুলটি পরিচালনা করতেন তাতে বিনা পারিশ্রমিকের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের স্ত্রী যিনি নিজেও একজন প্রয়াত সাংবাদিকের কন্যা এবং অল্প বয়সে আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে বিয়ে করে যিনি অনেক আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন।
তবে প্রকৃতির নিয়মেই সালমান শাহ’র মৃত্যু হত্যা নাকি আত্মহত্যা সেই বিতর্ক একসময় থেমে গেলো। আরো শত-সহস্ত্র ঘটনায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন সকল ক্রাইম রিপোর্টার। কিন্তু সালমান শাহকে নিয়ে সেখানেই আসলে সবকিছুর শেষ ছিলো না।
নতুন বিতর্ক শুরু হলো একটি খবরে। হঠাৎ জানা গেলো, একজন গ্রেপ্তার হয়ে স্বীকার করেছে যে সে-ই সালমান শাহকে হত্যা করেছে। তখনকার ঢাকার পুলিশ কমিশনার একে আল মামুন স্বউদ্যোগী হয়ে এই খবর জানালেন। তবে এটাও অনেকের জানা ছিলো যে নীলা চৌধুরী যিনি মা হিসেবে কোনোভাবেই সন্তানের মৃত্যু মেনে নিতে পারছিলেন না, তিনি গত কিছুদিন ঘনঘন ডিএমপি হেডকোয়ার্টারে যাওয়া-আসা করেছেন।
এতো বছর পর বিষয়টি নিয়ে আবারো খোঁজ করতে গিয়ে দেখছি, চলতি বছরের শুরুর দিকেও এ সংক্রান্ত মামলা আদালতের কার্যক্রমে ছিলো।
গণমাধ্যমের রিপোর্ট বলছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে নীলা চৌধুরীর নারাজি আবেদন গ্রহণ মাসে সালমান শাহ সংক্রান্ত মামলাটি র্যাবকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের আদালত।
এর আগে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর আদালত হত্যা মামলাটি প্রমাণ হয়নি বলে আদেশ দিলে ২১ ডিসেম্বর নীলা চৌধুরী নারাজি আবেদন করেন। একইভাবে অপমৃত্যুর মামলাতেও তার পরিবার নারাজি দিয়েছিলো।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহ’র মৃত্যুর পর তার বাবা সাবেক জেলা ও দায়রা জজ কমরউদ্দিন চৌধুরী অপমৃত্যুর মামলাটি দায়ের করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে সালমান শাহ’র মৃত্যুকে আত্মহত্যাই বলা হয়। কিন্তু পরিবারের আপত্তিতে কবর থেকে লাশ তুলে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আরেকদফা পোস্টমর্টেম করা হয়। তাতে বলা হয়, লাশ বেশি পঁচে যাওয়ার কারণে মৃত্যুর কারণ নির্নয় করা সম্ভব হয়নি।
পরের বছর ফেব্রুয়ারিতে ডিবি পুলিশ আত্মহত্যা জনিত কারণে মৃত্যু উল্লেখ করে প্রতিবেদন দিলে বাদী একে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড দাবি করে আপত্তি জানান। নারাজিতে তিনি হত্যাকাণ্ডের জন্য কয়েকজনকে দায়ী করে তাদের নামও উল্লেখ করেন। ডিবি নতুন করে তদন্ত চালানোর সময়ই ১৯৯৭ সালের ১৯ জুলাই সালমানের বাবার বাসায় ঢুকে পড়া এক যুবককে আটক করে পুলিশের কাছে তুলে দেওয়া হয়। রিজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ নামে ওই যুবক জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, সে সালমান শাহ’র হত্যাকারী এবং সহযোগী হিসেবে সে আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে। ২২ জুলাই আদালত তার স্বীকারোক্তি রেকর্ড করেন।
কিন্তু সিআইডি তদন্ত করে মাস তিনেক পর জানায়, রিজভির পুরো বিষয়টি ভুয়া। ওই প্রতিবেদনে একজন নায়িকার নাম উল্লেখ করে বলা হয়, তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার জের ধরেই দাম্পত্য কলহের কারণে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। ওই প্রতিবেদনে সালমানের পরিবারের নারাজির সূত্র ধরেই মামলার পরবর্তী কার্যক্রম এবং গত ডিসেম্বরে আদালত মামলাটি প্রমাণ হয়নি উল্লেখ করার পর নীলা চৌধুরীর নতুন নারাজি এবং র্যাবকে আবারো তদন্তে আদালতের নির্দেশ।
এভাবে প্রায় ২০ বছর ধরে অমীমাংসিত সালমান শাহ’র মৃত্যুর ঘটনা। এ নিয়ে বছরের পর বছর আদালতে নানামুখি কার্যক্রম এবং গণমাধ্যমে আলোচনা চললেও বাস্তবতা হচ্ছে, যেভাবেই মৃত্যু হয়ে থাকুক, সালমান শাহ’র মৃত্যুতে সবচেয়ে ক্ষতির শিকার বাংলাদেশের চলচ্চিত্র।







