ফুটবল খেলাটা অনেকটা বিয়ে করার মত! সম্পর্কটা জড়িয়ে যায় ক্লাবের সঙ্গে। সতীর্থ খেলোয়াড়রা হয়ে ওঠে পরিবারের অংশ। মাঠের ফুটবলের পাশাপাশি সুখে-দুঃখেও একে অন্যের পাশে থাকে। সময় সময় ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি বাড়লে সম্পর্কটা গড়ায় লম্বা সময় পর্যন্ত।
আর থাকে বিচ্ছেদ! সেও যেন মানব জীবনেরই ধারা। কেন, কার, কিসের জন্য বিচ্ছেদ; সেসব নিয়ে গল্প-কাহিনী গড়ায় অনেকদূর পর্যন্ত। কখনও কখনও বিচ্ছেদটা কোনও কোনও পক্ষ মেনে নিতে পারে না। খেলোয়াড় কিংবা ক্লাব দোষারোপে ব্যস্ত থাকে একে অপরের প্রতি। অপমান, পাল্টা অপমানে কলুষিত হয় দুপক্ষের বাস্তব কর্মজীবন।
সাবেক ক্লাবকে বিদায় জানিয়ে পরে সেই ক্লাবকে দোষারোপ করাটা আবার যেন ফুটবল নাটকের চিরন্তন চিত্রনাট্যও। এমন পাঁচ ফুটবলারকে তুলে ধরা যাক, যারা সাবেক ক্লাবকে ধুয়ে দিয়েছিলেন নতুন ক্লাবে নাম লেখানোর পর-
নেইমার
যখন বার্সেলোনায় যোগ দিয়েছিলেন, তখন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডকে ভাবা হচ্ছিল কাতালান দলটির ভবিষ্যৎ হিসেবে। মেসির জায়গাটা একদিন হবে নেইমারের, এমন চিন্তা করেই এগোচ্ছিল ক্লাব কর্তৃপক্ষ। তবে পেশাদারিত্বের জায়গায় কল্পনা আর বাস্তব যে এক নয় সেটাই যেন প্রমাণ করে ছাড়লেন নেইমার।
২০১৬-১৭ মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শেষ ষোল থেকে যে পিএসজিকে প্রায় একাই বিদায় করে দিয়েছিলেন নেইমার, সেই ক্লাবই তাকে বার্সা থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় পরের মৌসুমে। বিশ্বের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় বানিয়ে। সঙ্গে ভেঙ্গেচুরে গুঁড়িয়ে দিয়ে যায় বার্সায় এমএসএন ত্রয়ীর সাজানো সংসার।

নেইমার কেন বার্সা ছাড়লেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানিয়ে দিলেন, মেসির ছায়ায় থাকতে চান না বলেই ছেড়েছেন কাতালান ক্লাবটি। সঙ্গে নিজের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিলেন সাবেক ক্লাবের কর্তাদের।
‘আমি চার বছরে বার্সায় খুবই খুশি ছিলাম। যখন ছেড়ে এসেছি তখনও সুখী ছিলাম। তবে কর্মকর্তাদের বিষয়টি আলাদা। এমন ব্যক্তিদের বার্সার মত একটি ক্লাব আশা করতে পারে না। এসব কর্মকর্তারা বার্সার জন্য অনেকটা বিষফোঁড়ার মত।’
চলতি মৌসুমে বার্সা ছেড়ে নেইমার পিএসজিতে যোগ দেবার পর জল ঘোলা হয়েছে আরও। মেয়াদ বাড়িয়েও ক্লাব ছাড়ায় নেইমারের বোনাস আটকে দিয়েছে বার্সা। সেই বোনাস আদায়ের জন্য সাবেক ক্লাবকে আদালতে নেয়ারও হুমকি দিয়েছেন ব্রাজিল তারকা। বার্সাও একই পথে হেঁটেছে। দুপক্ষের এই হুমকি-পাল্টা হুমকি যে খুব শীঘ্রই থেমে যাবে এমন আভাসও দেখা যাচ্ছে না।
পেপে
রিয়ালের মূল স্কোয়াডে ১০ বছর ধরে খেলে যাওয়া বিদেশি খেলোয়াড় পাওয়া এমনিতে বেশ বিরল। সেদিক থেকে পেপে নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবতেই পারতেন। কিন্তু নিজেকে এমনটা ভাবার চেয়ে অভাগাই ভাবছেন পর্তুগিজ ডিফেন্ডার। পেপের ভাষ্য, রিয়াল অনেকটা ফুটবলের মত করেই তাকে লাথি মেরে বের করে দিয়েছে।
পেপে এখনও বিশ্বাস করেন, লস ব্লাঙ্কোসদের হয়ে আরও ১০ বছর খেলার সামর্থ্য থাকার পরও তার যথাযথ মূল্যায়ন করেনি রিয়াল। উগ্র মেজাজের কারণে কুখ্যাত এ ফুটবলার আর কোন ভাল ক্লাবে জায়গা পাবেন না বলে মনে করেছিলেন অনেক ফুটবল বোদ্ধা। তাদের ধারণা ভুল করে দিয়ে তুরস্কের জায়ান্ট দল বেসিকতাসে জায়গা পেয়েছেন পেপে।

নিজের ভবিষ্যৎ মোটামুটি নিশ্চিত করার পরই সাবেক ক্লাবকে একহাত নিয়েছেন পর্তুগিজ ডিফেন্ডার। রিয়াল তার সঙ্গে অনেকটা সৎ মায়ের মত আচরণ করেছে বলে অভিযোগ তার। তার অনেক মন্তব্য বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে মাদ্রিদিস্তাদের।
‘মাদ্রিদ আমার সঙ্গে দুবছরের জন্যও চুক্তি বাড়াতে চায়নি। তারা চেয়েছিল আমি যেন এক বছর খেলে কোন রকমে ক্লাব থেকে বেরিয়ে যাই। মানে একটাই, তোমাকে আমাদের আর চাই না। এমনকি তাদেরকে আমার ট্যাক্স সংক্রান্ত ঝামেলার সময়ও পাশে পাইনি। এজন্যই তাদের প্রতি আমার ঘৃণা বাড়ছে দিন দিন।’
মারিও বালোতেল্লি
নিজের প্রকৃতিপ্রদত্ত ফুটবল প্রতিভাকে কতটা নিদারুণ ভাবে অপচয় করা যায় তার উত্তম উদাহরণ বালোতেল্লি। বড় বড় ক্লাবে খেলার সুযোগ পেয়েও টিকতে পারেননি কোথাও। যেখানেই গেছেন নামের পাশে যুক্ত হয়েছে একটাই উপমা- ‘ব্যাড বয়’!
কোন কোন দলকে লিগ শিরোপা জেতাতে সহায়তা করলেও ব্যক্তিগত শোকেসটা বলতে গেলে প্রায় ফাঁকাই। কারণ একটাই, নিজের প্রতিভার প্রতি সুবিচার করেননি কোন কালে। ধুঁকতে থাকা ক্যারিয়ার টেনে তোলার বড় সুযোগটা বাল্লোতেলি পেয়েছিলেন এসি মিলান থেকে ধারে লিভারপুলে খেলতে এসে। ওই সুযোগের পর তার ক্যারিয়ারের পুনর্জীবন দেখেছিলেন অনেকে।

তবে অলরেডদের হয়েও বেশিরভাগ সময় কাটাতে হয়েছে সাইডবেঞ্চে। পরে লিভারপুলের কোচের দায়িত্ব পেয়ে প্রথমেই বালোতেল্লিকে তাড়িয়েছিলেন ইয়ুর্গেন ক্লপ। কারণ একটাই, অনিয়ন্ত্রিত জীবনাচার। সেটা আবার পছন্দ হয়নি ইতালিয়ান ব্যাডবয়ের। তার অনেক মন্তব্য লিভারপুলের জন্য ছিল অস্বস্তিকর।
লিভারপুলকে নিয়ে এখনও ক্ষোভ কমেনি বালোতেল্লির, ‘লিভারপুলে আমি দুজন কোচ পেয়েছিলাম। একজন ব্রেন্ডন রজার্স, আরেকজন ইয়ুর্গেন ক্লপ। কেউ আমার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করেননি। তাই ক্লাবটাকে আমার ভাল লাগে না।’
জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ
২০১০ সালে যোগ দিয়ে পরের মৌসুমে ছেড়েছেন বার্সেলোনা। কেন, কী কারণে, কার কারণে ছেড়েছেন; সেটা নিয়ে পরে একটা বইও লিখে ফেলেছেন ইব্রাহিমোভিচ। বড় স্বপ্ন নিয়ে বার্সায় যোগ দেয়ার পরও কেন কাতালান শিবিরে থিতু হতে পারলেন না সেজন্য মেসি এবং তৎকালীন বার্সা কোচকেই দায়ী করেছেন এই সুইডিশ।
মূলত মেসির কারণেই নাকি ইব্রাকে বেশিরভাগ সময় সাইডবেঞ্চে কাটাতে হয়েছে। সরাসরিই এমন দাবি করেছেন বার্সার সাবেক ফরোয়ার্ড। আর্জেন্টাইন অধিনায়ক তাকে সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং পজিশনে খেলতে দিতেন না বলে অভিযোগ ইব্রার। মেসি ও বার্সাকে নিয়ে পরে অনেক বাঁকা কথাই বলেছেন তিনি।

‘অনেক স্বপ্ন নিয়ে বার্সায় আসার পর আমার মনে হল যেন আয়াক্সের স্কুল জীবনে ফিরে গেছি। মেসি, ইনিয়েস্তা, জাভিদের মত বড় বড় তারকাদের আচরণ ছিল অনেকটা বাচ্চা ছেলেদের মত। পুরো ফুটবল বিশ্ব তাদের পারলে মাথায় করে নাচে। আমার মাথায় ঢুকতো না তাদের এই তারকা খ্যাতির কারণ। পুরো ব্যাপারটাই ছিল একটা ন্যাকামি। বার্সা তাদের তালে নেচে রসদই যোগাত।’
দানি আলভেজ
জাভি-ইনিয়েস্তাদের পাস থেকে যতটা না গোল করেছেন লিওনলে মেসি, ফুটবল জাদুকরকে দিয়ে তার থেকেও বেশি গোল করানোর অবদানটা দানি আলভেজের। রক্ষণের ডানপ্রান্ত থেকে বুলেট গতিতে আক্রমণে উঠে মেসিকে দিয়ে গোল করানোটাই ছিল ব্রাজিলিয়ান রাইটব্যাকের কাজ।
হঠাতই আলভেজের সঙ্গে চুক্তি না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় বার্সা কর্তৃপক্ষ। আলভেজও অবশ্য সেটার জন্য দায়ি। জাভি-ইনিয়েস্তার চুক্তির মত চাওয়া ছিল তারও। সেটা পাননি। পরে ক্লাব তাকে ছেড়ে দেয়। ক্ষোভ নিয়েই ফ্রি-ট্রান্সফারে জুভেন্টাসে পাড়ি জমান আলভেজ। জুভদের হয়ে অসাধারণ পারফরম্যান্সে বার্সা কর্তাদের বুকে জ্বালা তো বাড়িয়েছেনই, সঙ্গে তার অনুপস্থিতিতে কাতালান ক্লাবটির রক্ষণ হয়ে উঠেছে বেহুলার বাসর ঘর। বার্সাকে নানা সময় খোঁচা দিতে মুখ থামেনি এই ব্রাজিলিয়ানের।

আলভেজ এখন খেলছেন পিএসজিতে। নেইমারকে বার্সা থেকে প্যারিসের ক্লাবটিতে নিয়ে আসার পেছনে পালন করেছেন প্রত্যক্ষ ভূমিকা। আলভেজ এখন বার্সেলোনার জাতীয় শত্রু।
কেন বার্সেলোনা ছেড়েছিলেন সেটার কারণ হিসেবে আলভেজের দাবি, ‘একটা সময় আমি বুঝতে পারলাম সুরটা কোথাও কেটে গেছে। আমাকে সেখানে আর আগের মত ভালোবাসছে না কেউ। তাই বার্সা ছাড়লাম। আর বিনামূল্যে দল ছাড়তে পারাটা ছিল তাদের মুখে একটা ঘুষি মারার মত। যারা বার্সা ক্লাবটা চালান তারা জানেন না কীভাবে খেলোয়াড়দের সঙ্গে আচরণ করতে হয়। সেখানে থাকার কোন যুক্তিই দেখিনি তাই।’








