‘সাদকাতুল ফিতর’ আরবী শব্দ। এর র্অথ ফিতরের দান। ফিতর বলতে ঈদুল ফিতরকে বোঝানো হয়ছে। র্অথাৎ ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেয়া দানকে ‘সাদকাতুল ফিতর’ বলা হয়। একে যাকাতুল ফিতর বা ফেতরাও বলা হয়।
সাদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। ইবনে ওমর রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদকাতুল ফিতর আবশ্যক করেছেন। এর পরমিাণ হলো, এক সা যব বা এক সা খেজুর। ছোট-বড়, স্বাধীন-পরাধীন সবার ওপরই এটা আবশ্যক। (বুখারী: ১৫১২) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা মুসলিমদের ওপর আবশ্যক করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা আদেশ করেছেন, তা আল্লাহ তাআলা র্কতৃক আদেশ করার সমতুল্য। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, ‘যে রাসূলের হুকুম মান্য করল, সে আল্লাহর হুকুমই মান্য করল। আর যে পৃষ্ঠ প্রর্দশন করল, আমি আপনাকে তাদের জন্য র্পযবক্ষেণকারী নিযুক্ত করে পাঠাইনি।’ (সূরা নিসা: ৮০)
ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, প্রত্যেক সার্মথ্যবান মুসলমানের ওপর সাদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। ‘সার্মথ্যবান’ শব্দের ব্যাখ্যা হলো, প্রয়োজনের থেকে অতিরিক্তি (ব্যবহৃত, ঋণ ইত্যাদি) যাকাতের নেসাব পরিমাণ সম্পদের (৭.৫ ভরি র্স্বণ বা ৫২.৫ ভরি রৌপ্যর) মালিক হওয়া। তবে যাকাতের ন্যায় এক্ষেত্রে এক বৎসর অতিক্রান্ত হওয়া জরুরি নয়। অতএব কেউ যদি ঈদের আগের দিনও এই পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, তাকেও তা আদায় করতে হবে। সার্মথ্যবান না হলে সাদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হবে না। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘সর্বোত্তম সদকা সেটাই, যা সার্মথ্যবান কেউ আদায় করে।’ (বুখারী : ১৩৬০) অতএব পুরুষ, নারী সবার ওপর এই সাদকাতুল ফিতর ওয়াজিব।
নিজের পক্ষ থেকে এবং নিজের অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান বা অবিবাহিত মেয়ের পক্ষ থেকে আদায় করা ওয়াজিব। সন্তানের নামে সম্পদ থাকলে সেখান থেকে আদায় করা যাবে। প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের পক্ষ থেকে আদায় করা ওয়াজিব নয়। কোনো ইয়াতিম শিশুর ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়ে থাকলে তার পক্ষ থেকেও আদায় করতে হবে।
সাদকাতুল ফিতর ঈদুল ফিতরের ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়াজিব হয়। কাজেই সেদিন ভোরের আগে যে জন্ম নিয়েছে, বা এই পরমিাণ সম্পদের মালিক হয়েছে, তাকেও এই সদকা আদায় করতে হবে। কেউ যদি সেদিন ভোরের আগে মারা যায়, তার ওপর সদকা ওয়াজিব হবে না। আবার ভোর হওয়ার পর কেউ জন্ম নিলে তার পক্ষ থেকেও সদকা আদায় করা ওয়াজিব হবে না।
ঈদুল ফিতরের দিন সকালে ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে সাদকাতুল ফিতর আদায় করা উত্তম। তবে যাকাতের ন্যায় সেই সময়ের আগেও আদায় করা যেতে পারে। আবার কোনো কারণে সময় মতো আদায় করতে না পারলে পরেও আদায় করা যাবে। কেউ আদায় না করে মৃত্যুবরণ করলে তার পক্ষ থেকে তার উত্তরাধিকারী আদায় করে দিলেও আদায় হয়ে যাবে।
গম, যব, খেজুর, পনির, কিসমিস এই পাঁচ প্রকার শস্যের কথা হাদীসে এসেছে। এই পাঁচ প্রকার শস্য সরাসরি দিলেও হবে, আবার এসবের মূল্য দিলেও হবে। তবে অন্য কোনো শস্য দিতে চাইলে এই পাঁচ প্রকারের কোনো এক প্রকারের মূল্য হিসাব করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে যব, খেজুর, কিসমিস ও পনির দিয়ে দিলে ১ সা বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম, আর গম (বা আটা) দিয়ে দিলে র্অধ সা বা ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম দিতে হবে।
হাদীস শরীফে রয়েছে, ইবনে ওমর রা. বলেন, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদকাতুল ফিতর আবশ্যক করেছেন। এর পরমিাণ হলো, এক সা যব বা এক সা খেজুর। ছোট-বড়, স্বাধীন-পরাধীন সবার ওপরই এটা আবশ্যক।’ (বুখারী : ১৫১২) ইবনে ওমর রা. আরও বলেন, ‘আমরা সদকাতুল ফিতর আদায় করতাম এক সা খাদ্যদ্রব্য দিয়ে। তা এক সা যাব, এক সা খেজুর, এক সা পনীর বা এক সা কিসমিস দিয়ে হত।’ (বুখারী : ১৫০৬)
ইবনে আব্বাস রা. একবার রমজানের শেষ দিকে বসরায় খুতবা প্রদান করেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘তোমাদের রোজার সাদকা আদায় করো। লোকেরা যেন ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি। তখন ইবনে আব্বাস রা. বললেন, এখানে মদীনার কে আছে দাঁড়াও। তোমাদের ভাইদেরকে বলো, তারা তো জানে না। বলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই সাদকা আবশ্যক করেছেন। এক সা খেজুর বা যব অথবা আধা সা গম প্রত্যকে স্বাধীন-দাস, পুরুষ-নারী, ছোট-বড় সবার ওপর ওয়াজিব। (আবূ দাউদ : ১৬২২)
যার কাছে প্রয়োজনের অতরিক্তি পরিমাণ সম্পদ নেই, এমন ফকির বা মিসকিনকে এই সাদকা দেয়া যাবে। পরিবারের কয়েকজনের সাদকা মলিয়ে একজন গরীবকে একসঙ্গে দেয়া যেতে পারে আবার এক জনের সাদকা কয়েকজনকেও দেয়া যেতে পারে।
সাদকাতুল ফিতরের অনেক উপকারিতা রয়েছে। এতে দরিদ্র ব্যক্তির প্রতি সহানুভূতি প্রর্দশন করা হয়, তাছাড়া ঈদের দিনগুলোতে দরিদ্র ব্যক্তিরা ধনীদের ন্যায় স্বচ্ছলতা বোধ করে। যার ফলে সাদকাতুল ফিতরের ফলে ধনী-গরীব সবার জন্য ঈদ আনন্দদায়ক হয়। সবচেয়ে বড় উপকার হলো সাদকাতুল ফিতরের মাধ্যমে সিয়াম অবস্থায় ঘটে যাওয়া ক্রটিগুলোর কাফ্ফারা করা হয়। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব করেছেন। অশ্লীল ও অনর্থক কথাবার্তার কারণে সিয়ামে ঘটে যাওয়া ত্রটি–বিচ্যুতিগুলো দূর করার জন্য ও মিসকিনদের খাদ্য প্রদানের জন্য। ঈদের সালাতের আগে আদায় করলে তা সদাকাতুল ফিতর হিসাবে গণ্য হবে। আর ঈদের সালাতের পর আদায় করলে তা অন্যান্য সাধারণ দানের মতো একটি দান হিসাবে গণ্য হবে।’ (আবূ দাউদ: ১৬১১)
ঈদের দিন সকালে ঈদের সালাতের আগে। বুখারীতে বর্ণিত আবূ সাঈদ খুদরী রা. বলেন, ‘আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে সাদকাতুল ফিতর হিসাবে ঈদুল ফিতরের দিন এক সা পরিমাণ খাদ্য আদায় করতাম।’ ইবনে ওমর রা. বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের ঈদের সালাত পড়তে যাওয়ার আগে সাদকাতুল ফিতর আদায় করার আদেশ দিয়েছেন।’ ইবনে উয়াইনা স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে আমর বিন দীনারের সূত্রে ইকরামা র. থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ ঈদের দিন সাদকাতুল ফিতর ঈদের সালাতের আগে আদায় করবে।’ আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়য় সাফল্য লাভ করবে সে, যে শুদ্ধ হয় এবং তার পালনকর্তার নাম স্মরণ করে, অতঃপর সালাত আদায় করে।’ (সূরা আলা: ১৪)
ঈদের এক দিন দুই দিন আগে সাদকাতুল ফিতর আদায় করা। বুখারীতে আছে, নাফে র. বলেন, ইবনে ওমর রা. নিজের এবং ছোট-বড় সন্তানদের পক্ষ থেকে সাদকাতুল ফিতর আদায় করতেন, এমনকি আমার সন্তানদের পক্ষ হতেও। তিনি যাকাতের হকদারদের ঈদের এক দিন বা দুই দিন আগে সাদকাতুল ফিতর দিতেন।
লেখক: মাওলানা মোহাম্মদ বদরুজ্জামান রিয়াদ







