চট্টগ্রাম থেকে: দুপুরের পর দর্শক বাড়তে থাকল জহুর আহমেদে। গ্যালারির মুখগুলো তাকিয়ে বাংলাদেশের বোলারদের দিকে। পরে ২২ গজে জুটি যত বড় হচ্ছিল, কুশল-ধনঞ্জয়া জুটিতে আক্ষেপ যত বাড়ছিল, মুখগুলোয় ফুটে ওঠা শুকনো প্রতিচ্ছবিই তখন মাঠের আসল চিত্রটা বলে দিচ্ছিল। রানের খাতা খোলার আগেই করুনারত্নে ফিরলেও পরের দুই ব্যাটসম্যানের প্রতিরোধে টাইগারদের করা ৫১৩ রানকে শক্ত চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে লঙ্কানরা। দ্বিতীয় দিন শেষ করেছে এক উইকেটে ১৮৭ রানের চওড়া হাসি নিয়ে।
বাংলাদেশ: প্রথম ইনিংস- ৫১৩; শ্রীলঙ্কা: প্রথম ইনিংস ১৮৭/১ (কুশল ১০৪*, ধনঞ্জয়া ৮৩*)
তাইজুল-মিরাজ-সানজামুলের প্রাণান্ত চেষ্টা বিফলে গেছে। শুরুতেই ব্রেক-থ্রু এনে দেয়া মিরাজ পরে আর আগ্রাসী হতে পারেননি। পড়ন্ত বিকেলে তাইজুল টানা তিন ওভারে তিনটি সম্ভাবনা জাগালেও আবেদনে সাড়া দেননি আম্পায়ার। ইনিংসের দুটি রিভিউ খোয়া গেছে শেষ ঘণ্টায়। লঙ্কানদের দুটি অবশিষ্ট।
মাহমুদউল্লাহ প্রথম তিন ওভার করান তিন বোলারকে দিয়ে। তাতে সাফল্যও আসে। মোস্তাফিজ-সানজামুলকে এক ওভার করে করানোর পর মিরাজকে আনেন। ইনিংসের তৃতীয় ওভারের তৃতীয় বলেই এই অফস্পিনার ফেরান করুনারত্নেকে। ত্রয়োদশ ওভারে আক্রমণে আসেন তাইজুল। এই চার বোলারকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ৪৫ ওভার পর্যন্ত টেনেছেন অধিনায়ক। দিনের খেলা শেষের আগের ওভারে আসেন পঞ্চম বোলার মোসাদ্দেক। শেষটায় আবার তাইজুল।
বাংলাদেশের শুরুটা ছিল বেশ আক্রমণাত্মক। ইনিংস সূচনায় তামিম দ্রুত রান তুলে যে মেজাজ এনে দিয়েছিলেন সেটার প্রতিফলন দেখা গেছে অন্য ব্যাটসম্যানদের মধ্যেও। ওভারপ্রতি চারের (৩.৯৫) কাছাকাছি রান তুলে শ্রীলঙ্কার মাথায় পাঁচশর বোঝা চাপিয়েছে টাইগাররা। বড় সংগ্রহকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে পরে আক্রমণাত্মক মেজাজ দেখিয়েছে লঙ্কানরাও। তাদের রানরেট ৩.৮৯।

কঠিন পথ পাড়ি দিতে নেমে লঙ্কান ব্যাটসম্যানরা অবশ্য শুরুটা একদমই ধীরগতিতে করেছিলেন। প্রথম ৯ ওভারে ২১ রান। পরের ৬ ওভারে খোলস ছাড়ার চেষ্টা করে তারা, আক্রমণাত্মক হয়ে তুলে নেয় ২৯ রান। ১৫ ওভারে ফিফটি স্পর্শ করে চা-বিরতিতে যান কুশল ও ধনঞ্জয়া। কিন্তু শেষ সেশনে সব পাল্টে যায়, ৩৩ ওভারে তারা তোলেন ১৩৭ রান।
বড় রানকে চ্যালেঞ্জ জানাতে থিতু হওয়ার নীতি অনুসরণ করতে গিয়ে শুরুতেই উইকেট দিয়েছিলেন করুনারত্নে। দুই প্রান্ত থেকে প্রথম দুটি ওভার মেডেন পান মোস্তাফিজ ও সানজামুল। বাঁহাতি ব্যাটসম্যানকে ফেরাতে মোস্তাফিজকে বিরতি দিয়ে অধিনায়ক মিরাজকে ডাকেন ইনিংসের তৃতীয় ওভারেই।

তাতে প্রথম দুই বল ডট দেয়ার পর মিরাজ তৃতীয় বলেই পেয়ে যান সাফল্য। ৯ বল খেলে রানের খাতা খোলার আগেই স্লিপে ইমরুলের হাতে ক্যাচ দেন এ ওপেনার। পরে আর কোন উইকেট না পড়াটা আক্ষেপই বাড়িয়েছে কেবল।
বৃহস্পতিবার দিনের শুরুটাও হয় আক্ষেপ সঙ্গী করে। ৪ উইকেটে ৩৭৪ রান নিয়ে শুরু করা বাংলাদেশ কতদূর যাবে, সেই আলোচনা ছাপিয়ে আগ্রহের কেন্দ্রে ছিলেন মুমিনুল হক। ডাবল সেঞ্চুরির সুযোগ তার। কিন্তু গ্যালারির গুটিকয় দর্শক নড়েচড়ে বসার আগেই আউট এই বাঁহাতি। এদিন কেবল একটি সিঙ্গেল নিতে পেরেছেন তিনি। ফেরার সময় ওই ডাবল সেঞ্চুরি ২৪ রান দূরে।

আগেরদিন ২০৩ বল খেলা মুমিনুল দ্বিতীয় দিনে খেলতে পারলেন মাত্র ১১ বল। লেগস্টাম্প বরাবর রঙ্গনা হেরাথের ঝুলিয়ে দেয়া বলে স্কোরিং শট খেলতে গিয়ে ফরোয়ার্ড শর্টলেগে ক্যাচ দিয়েছেন।
তবে ডাবল সেঞ্চুরির আক্ষেপ নিয়ে মুমিনল ফিরে গেলেও দলীয় সংগ্রহ নিয়ে প্রত্যাশা পূরণ করেছেন মাহমুদউল্লাহ-সানজামুল জুটি। মাঝে মাহমুদউল্লাহ ও মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতকে সংগ্রামও করতে হয়েছে। সুরাঙ্গা লাকমালের বল কোনটি নিচু হয়েছে, কোনটি লাফিয়ে উঠেছে। অন্যপ্রান্ত থেকে বারবার একই জায়গায় বল করে চাপ বাড়িয়ে গেছেন হেরাথ। মুমিনুলের পর ফিরিয়েছেন মোসাদ্দেককে (৮)।
উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে এসে বড় শট খেলতে গিয়ে ক্যাচ দেন মিডঅনে। দিনের প্রথম সেশনের দ্বিতীয় ঘণ্টায় আক্ষেপ হয়ে থেকেছে মিরাজের রানআউট। দারুণ ব্যাটিং করতে থাকা এ ডানহাতি মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে তৃতীয় রান নিতে গিয়ে কাটা পড়েন। দুই রান নিয়েছিলেন খুব সহজে। ফিল্ডারের হাত থেকে থ্রো আসতে যতটুকু সময় লাগে। নিজেই কল করে সেই সময়ের মধ্যে পৌঁছাতে পারেননি লক্ষ্যে। দর্শনীয় একটি স্ট্রেইট ড্রাইভে চার ও একটি ছক্কায় ১৯ বলে ২০ রান করে ফেরেন ডানহাতি অলরাউন্ডার।

দল পাঁচশ পেরোলেও অধিনায়কের আক্ষেপ থেকেছে। টেস্টে প্রথম সেঞ্চুরির স্বপ্ন দেখা মাহমুদউল্লাহ ৮৩ করে অপরাজিত থাকেন সঙ্গীর অভাবে। ৭ চার ও ২ ছয়ে ১৩৪ বলের লড়াকু ইনিংস তার।
লঙ্কানদের হয়ে লাকমাল ও হেরাথ ৩টি করে উইকেট নিয়ে সফল। ২টি উইকেট নিয়েছেন সান্দাকান। একটি গেছে পেরেরার ঝুলিতে। বোলারদের ঘুরে দাঁড়ানোটাই হয়ত প্রেরণা যুগিয়েছে কুশল-ধনঞ্জয়াদের। কুশল তৃতীয় দিনের শুরুতেই সেঞ্চুরিতে রূপ দিতে চাইবেন তার ৮৩ রানের ইনিংসকে। ধনঞ্জয়া ১২৭ বলে ১০৪ করে আছেন ব্যাট আরও চওয়া করার নেশায়। তাদের থামিয়ে পাল্টা আঘাতের চেষ্টায় সফল হওয়ার চ্যালেঞ্জ এখন মিরাজ-মোস্তাফিজদের।







