ড্যানিশ উদ্ভাবক পিটার ম্যাডসেনের নিজের বানানো সাবমেরিনে চড়ে ১০ আগস্ট কোপেনহেগেন উপকূল থেকে রওনা হতে দেখা যায় সুইডেনের ৩০ বছর বয়সী সাংবাদিক কিম ওয়ালকে। তারপর থেকেই তিনি উধাও।
নিখোঁজ কিমকে খুঁজতে শুরু হয় দীর্ঘ উদ্ধার অভিযান। এর মাঝেই গত ২১ আগস্ট এক সাইকেল আরোহী ডেনমার্কের উপকূলে পানিতে ভাসতে দেখেন একটি মৃতদেহ, যার শুধু মাথা নয়, নানা অঙ্গও কেটে নেয়া হয়েছে।
সাথে সাথেই ধারণা করা হয় বিকৃত ওই মৃতদেহটি নিখোঁজ সাংবাদিক কিমেরই। কিন্তু ব্যাপারটি নিশ্চিত হতে আরও সময় নেয় পুলিশ। বুধবার লাশটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সনাক্ত করে সেটি ওই সাংবাদিকের বলেই নিশ্চিত করা হয়।
এর আগেই অবশ্য খুঁজে পাওয়া যায় পিটার ম্যাডসেনকে, যার সঙ্গে কিমকে শেষ দেখা গিয়েছিল। তবে পিটারের ভাষ্য, সাবমেরিনে থাকা অবস্থায় একটি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় কিমের। অসাবধানতা বা অবহেলায় মৃত্যুর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।
এর মধ্য দিয়ে সুইডিশ সাংবাদিক কিম ওয়াল অন্তর্ধান ও হত্যা রহস্যের সমাধান হওয়ার কথা থাকলেও সমাধান তো হয়ইনি, উল্টো ঘনীভূত হয়েছে। এই রহস্য পুরো স্ক্যান্ডিনেভিয়াকে হতবাক করে দিয়েছে। সৃষ্টি করেছে নতুন আরও হাজারটা প্রশ্ন।
ফ্রিল্যান্স সংবাদিক হিসেবে কিম ওয়াল ছিল যথেষ্ট সম্মানিত একটা নাম। সর্বশেষ তিনি পিটার ম্যাডসেনের তৈরি ৪০ টনি সাবমেরিনের ওপর একটা ফিচার লিখছিলেন। সাবমেরিনটির নাম ইউসিথ্রি নটিলাস। ২০০৮ সালে ক্রাউডফান্ডিং-এর (বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অল্প অল্প টাকা তুলে বড় অঙ্ক জমা করা) মাধ্যমে এর জন্য অর্থ যোগান পিটার। এরপর সাবমেরিনটি তৈরি করেন।
এই সাবমেরিন সম্পর্কে ভালোভাবে জানতেই পিটারের সঙ্গে ইউসিথ্রি নটিলাসে চড়ে রওনা দিয়েছিলেন কিম।
এর আগে কিম ওয়াল সংবাদ সংগ্রহ করতে নর্থ কোরিয়া, সাউথ প্যাসিফিক, উগান্ডা ও হাইতি সফরে গেছেন। সাংবাদিকতা করেছেন নিউইয়র্ক টাইমস, গার্ডিয়ান, ভাইস এবং সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের মতো বাঘাবাঘা পত্রিকার জন্য।
কী ঘটেছিল
কিম ওয়াল ১০ আগস্ট স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টার দিকে পিটার ম্যাডসেনের সঙ্গে কোপেনহেগেনের রেফশালিওন বন্দরে দেখা করেন। সেখানেই নটিলাসে চড়েন তিনি। ওইদিনই পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সাড়ে ৮টার দিকে সূর্যাস্তের একটু আগে সাবমেরিনের টাওয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ওই দু’জনের ছবি তোলে একটি প্রমোদতরীর যাত্রী।
সেটাই কিমকে বেঁচে থাকা অবস্থায় শেষ দেখা যাওয়ার প্রমাণ।
অনেক দেরি হয়ে গেলেও বাড়ি না ফেরায় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে কিমকে নিখোঁজ হিসেবে থানায় রিপোর্ট করেন তার বয়ফ্রেন্ড।
সাবমেরিনটিতে স্যাটেলাইট ট্র্যাকিংয়ের সরঞ্জাম না থাকায় নিখোঁজ হওয়ার রিপোর্ট দায়েরের পর টানা কয়েক ঘণ্টা সেটা খুঁজে বেড়ায় উদ্ধারকারী দলগুলো। অবশেষে ১১ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সুইডেন ও ডেনমার্কের মাঝে অবস্থিত একটি লাইটহাউজ থেকে সাবমেরিনটি দেখতে পাওয়ার তথ্য জানানো হয়।
পরে অবশ্য আরেকটি বাণিজ্যিক জাহাজও জানায়, ১০ আগস্ট মাঝরাতের দিকে তারা অন্ধকার অবস্থায় সাবমেরিনটিকে প্রায় ৩০ মাইল দূর থেকে দেখেছিল।
খোঁজ পাওয়ার পর কাছাকাছি গিয়ে অবশেষে পিটারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। কিন্তু প্রথমবার দেখা যাওয়ার রিপোর্টের আধঘণ্টা পরই সাবমেরিনটি ডুবে যায়। পরে উদ্ধারকারী দল তা উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসে।
কিন্তু এতকিছুর পরও কিম ওয়ালের মৃত্যুর বিষয়টি অস্পষ্টই থেকে গেছে। পিটারের জবানবন্দী অনুযায়ী, সাবমেরিনে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল, যার কারণে মারা যান কিম। তখন পিটার তাকে কোগে উপসাগরের কোনো একটা জায়গায় পানিতে বাসিয়ে দেন। তবে দুর্ঘটনাটা আসলে কী ছিল বা কিম কীভাবে মারা গেলেন, এর কিছুই পরিষ্কারভাবে জানাননি পিটার।
রহস্য আরও জট পাকালো যখন পরীক্ষা করে দেখা গেল, মৃতদেহের মাথা, হাত, পা ইচ্ছাকৃতভাবে কেটে ফেলা হয়েছে, কোনোভাবে ছিঁড়ে আলাদা হয়ে যায়নি। কোপেনহেগেন পুলিশ প্রধান জেনস মোলার ২১ আগস্ট মৃতদেহটি উদ্ধারের পর আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান। তখনো লাশটি কিমের বলে সনাক্ত করা হয়নি।

দু’দিন পর পুলিশ জানায়, ডিএনএ পরীক্ষায় দেহাবশেষের সঙ্গে কিমের টুথব্রাশ থেকে নেয়া নমুনা মিলে গেছে। ডুবে যাওয়া সাবমেরিনে পাওয়া রক্তের আলামতও কিম ওয়ালের বলে নিশ্চিত করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।
বিবিসি জানায়, বিকৃত মৃতদেহটি পানিতে সহজে যেন ডুবে যায়, সেজন্য এর সঙ্গে ধাতুর সরঞ্জাম বেঁধে দেয়া হয়েছিল। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিমের দেহে যেসব ক্ষত আর আলামত পাওয়া গেছে, তা থেকে মনে করা হচ্ছে, কিমের দেহ থেকে বাতাস জোর করে বের করে ফেলা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত আর কোনো তথ্য পিটার ম্যাডসেনের মুখ থেকে বের করতে পারেনি পুলিশ। তার আইনজীবী জানিয়েছেন, তিনি কোনো ধরণের দোষ স্বীকার করেননি এবং ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের পরও নিজের বক্তব্য পাল্টাবেন না পিটার।
তাই এতকিছুর পরও সুইডিশ সাংবাদিক কিম ওয়ালের মৃত্যু রহস্য যেই তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে গেল।








