অধ্যাপক আহাদুজ্জামান মোহাম্মদ আলী এবং অধ্যাপক আখতার সুলতানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রিয় দুই শিক্ষক। সেই প্রিয় দুই মানুষের ছকেবাঁধা চাকরি জীবন থেকে ছুটি উপলক্ষ্যে অগ্রায়নের আয়োজন করে বিভাগের শিক্ষক, সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা।
শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ড. কাবেরী গায়েনের সভাপতিত্বে অগ্রায়ন অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম, সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক ড. গোলাম রহমানসহ বিভাগের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
অধ্যাপক ড. রোবায়েত ফেরদৌসের সঞ্চালনে এ অনুষ্ঠানে ‘অগ্রায়ন’ শব্দটির ব্যাখ্যা করে কাবেরী গায়েন বলেন, এ বিভাগে আমরা সাধারণত ‘বিদায়’ কথাটি ব্যবহার করি না। এক্ষেত্রে ‘অগ্রায়ন’ শব্দটি ব্যবহার করি। কেননা এই বিভাগ থেকে কেউ কখনো বিদায় নেয় না। তারা জীবনে সামনের দিকে অগ্রসর হন এ কারণেই আমরা ‘বিদায়’ শব্দটি ব্যবহার না করে ‘অগ্রায়ন’ শব্দটি ব্যবহার করি। আজ আমাদের দুজন অত্যন্ত দুজন সম্মানিত শ্রদ্ধেয় শিক্ষককে সম্মাননা জানাচ্ছি। তারা ৩৫ বছর ধরে আমাদের পড়িয়েছেন, আমাদের দেখার চোখকে সৃষ্টি করেছেন।
‘‘আখতার সুলতানা সব সময় বলতেন, শিক্ষকতা কোনো খণ্ডকালীন বিষয় না। এটি একটি পবিত্র দায়িত্ব। এর মাধ্যমে তিনি শুধু এই বিভাগের বর্তমান, সাবেক ও অনাহত শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অমোঘ বাণী। আহাদুজ্জামান স্যার আমাদের ‘ক্রিটিক্যাল স্কুল’সহ অনেক কিছু শিখিয়েছেন যা আমি এখনো মেনে চলি।
স্যার ও ম্যাম সারাজীবন যে শিক্ষা দিয়েছেন তা আমাদের জীবনের পাথেয় হয়ে থাকবে। এসময় তিনি এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত সকলকে ধন্যবাদ জানান।’’
যে দুই শিক্ষকের জন্য এ আয়োজন, তাদের একজন অধ্যাপক আহাদুজ্জামান বলেন, ‘আমি নিজেকে শিক্ষক হিসেবে মনে করি না। আজীবন ছাত্রই রয়ে গেছি আমি। আমি খুব শিক্ষকসুলভ ছিলাম না। আমি অনেকদিন বটতলায় ক্লাস নিয়েছি, মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রদের সঙ্গে গল্প করেছি। সুতরাং আমি কখনোই শিক্ষকসুলভ ছিলাম না। শেখাটা এখনো আমার অব্যাহত রয়েছে। শিক্ষার্থীদের শেখাতে গিয়ে আমি অনেক কিছু শিখেছি, শিখছি।’
অধ্যাপক আখতার সুলতানা বিভাগের ছাত্র-শিক্ষকদের উদ্দেশে বলেন, ‘শিক্ষক ও ছাত্র আমাদের একই লক্ষ্য। সহায়তা ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক দ্বারা সেই লক্ষ্য অর্জন করা যায়। কেউ আমাদের সম্মান করবে এটা নয়, সম্মান অর্জন করতে হয়। ছাত্র-ছাত্রীরা আমাদের ছেলে-মেয়ের মতো। সব সময় তাদের পাশে থাকতে হবে। তাদের সমস্যাগুলো বুঝতে হবে, প্রয়োজনে এগিয়ে যেতে হবে।’
‘‘জোর করে সম্মান আদায় করা যায় না। আজকে তিন দশক পূর্বে যাদের পড়িয়েছি, তারাও এখানে এসেছে। এর চেয়ে বড় সম্পর্ক ও শ্রদ্ধাবোধ আর কি হতে পারে। এই বিভাগ চাইলেও আমি সবার কাছ থেকে কখনো হারিয়ে যাবো না। আমি আছি সব সময়ই তোমাদের পাশে।’’

সারাবাংলা ডট নেটের সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, ‘আহাদ (আহাদুজ্জামান) স্যার সম্পর্কে বলতে গেলে স্বামী বিবেকানন্দের একটি কথা মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘‘বিধাতা আকাশ থেকেও আসেন না বা মাটি ফুঁড়েও আসেন না। ঈশ্বর মানুষের মাঝেই বিরাজ করে।’’ আহাদ স্যারও এমন একজন মানুষ।’
‘‘আমি বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর এক অনুষ্ঠানে তিনি এক আমাদের সাংবাদিকতার বিভিন্ন দিক ও ভবিষ্যত সম্পর্কে বলেছিলেন। যা এখন আমরা বুঝতে পারি। তিনি একজন সুন্দর মানুষ, সুন্দর মনের মানুষ।’’
তিনি যোগ করে বলেন, ‘আখতার সুলতানা ম্যাম এই বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন একজন শিক্ষক, যিনি কোনো ধরনের শিক্ষক রাজনীতি না করে শিক্ষকতা করেছেন। তিনি আমাদের মায়ের মতোই স্নেহ করতে। আমি তাদের দীর্ঘায়ু কামনা করছি।’
সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান বলেন, ‘অবসরগ্রহণ করা মানে হলো খাঁচা থেকে মুক্ত হওয়া। এতদিন ধরে চলতে থাকা অনুশাসন থেকে মুক্ত হওয়া। যেহেতু আখতার সুলতানা ও আহাদুজ্জামান খাঁচা থেকে মুক্ত হচ্ছেন। এখনো যেহেতু তারা আর খাঁচায় বন্দী নেই, তারা এখনো আরো বেশি কিছু দেশকে দিতে হবে।’
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রদীপ প্রজ্বলনের পর দুই শিক্ষককে উত্তরীয় পরিয়ে দেন কাবেরী গায়েন। তাদেরকে একগুচ্ছ বেলীফুল দিয়ে তাদের শুভেচ্ছা জানান বিভাগের প্রভাষক তাহমিনা হক দিনা ও মো. আসাদুজ্জামান কাজল। প্রীতি উপহার তুলে দেন বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল মনসুর আহমেদ ও ড. গীতি আরা নাসরীন।
প্রিয় দুই শিক্ষকের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মফিজুর রহমান ও কাবেরী গায়েন।
অনুষ্ঠানে ২৩টি প্রবন্ধ এবং অধ্যাপক আহাদুজ্জামান মোহাম্মদ আলী ও আখতার সুলতানার দুটি সাক্ষাতকার সমৃদ্ধ ‘অগ্রায়ন জার্নাল’ উন্মোচন করা হয়।
মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শেষ হয় এই আয়োজনের।







