মফস্বল শহরে বড় হয়েছি। পরবর্তীতে মহানগরী ঢাকায় এসেছি বেশ ক’বছর হলো। বর্তমানে গৃহিণী। ঢাকা শহরে একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে চাকরি করেছিলাম। এর আগে, জামালপুরে বাচ্চাদের একটি স্কুলে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছিল।
ঢাকায় মাত্র চার মাস কাজ করেছি স্কুলটিতে। যে স্কুলে কাজ শুরু করি সেটি ছিল বিশেষ (অটিস্টিক) শিশুদের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আগের কোন অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও শুধু আমার সেবামূলক কাজ করার একান্ত ইচ্ছার কথা জেনে বিশেষ অনুরোধে আমাকে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল সেই স্কুলে। আমার কর্মস্থলে আমাকে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশু সম্পর্কে এবং এসব শিশুদের নিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে সে বিষয়ে একটি প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়।
এক মাসের ওরিয়েন্টেশনের পর আমি জানতে পারি সন্তান কেন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হয় বা হতে পারে। হলে কতদিন/ মাস/ বয়স থেকে তা বোঝা যায়। আরও জানলাম কীভাবে তাদেরকে একটি সুন্দর, স্বাভাবিক ও স্বাবলম্বী জীবন গড়তে শিক্ষকদের কী কী ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আমি খুব আনন্দের সাথে আমার প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষ করে কাজে যোগদান করার সুযোগ পেয়ে নিজেকে মনে মনে একজন ‘লাকি উইমেন’ ভেবে মনের অজান্তেই আমার নিজেকে নিয়ে গর্ব হল। সাধারণত এ ধরণের প্রতিষ্ঠানে অধিকাংশ শিক্ষকই নারী হয়ে থাকেন।
অন্য প্রসঙ্গে আসি। ব্যাঘাত ঘটলো আমার এই সুন্দর, পবিত্র কাজ শুরু করার পর থেকে। লক্ষ্য করলাম সমাজের অনেকেই আমার কাজটিকে সম্মানজনক মনে করছেন না। বরং তাদের চোখে এমন পবিত্র একটি কাজ অনেক ছোট আর অবহেলার। কেউ কেউ আবার এখানে আমার শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রশ্ন তুলে কটু বাক্য ব্যায় করতেও বেশ আগ্রহী ছিলেন। আমাকে দেখলেই তাদের কপালে ভাজ ফেলে, মুখে ও মনে নানা প্রশ্ন জেগে উঠতো। না কিছু জানার জন্য নয়! শুধুমাত্র আমার কাজটিকে অসম্মান করার উদ্দেশে তাদের কপালে এত বড় বড় ভাজ আর এত প্রশ্ন! আসুন তাঁদের মানসিকতার কিছু পরিচয় দেওয়া যাক।
তাঁদের প্রশ্ন: আচ্ছা এ ধরনের কাজ করতে কি কোন একাডেমিক যোগ্যতা লাগে? প্রশ্নকারীই আবার উত্তরদাতা- ভ্রু কুচকে মনে হয় কোন রকম জোড়াতালি দেওয়া সার্টিফিকেট হলেই এসব কাজ পাওয়া যায়।
প্রশ্ন দুই: এখানে আসলে কি শেখানো হয়? যা শোখানো হয় তা কি কোন কাজে আসে? নাকি শুধুই ব্যাবসা? আমি ঠান্ডা গলায় উত্তর দেই – হয়তো বা গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য মহৎ নাও হতে পারে। আমি এ পেশায় একদম নতুন। তবে আমার কাছে আমার প্রতিষ্ঠানটিকে নেতিবাচক মনে হয়নি।
প্রশ্ন তিন: আচ্ছা বাচ্চাগুলোর টয়লেট করানো, শরীর টরীর খারাপ হলে বমি বা ইত্যাদি অন্য যে কাজগুলো এসব কিছুই কি শিক্ষকদেরই করতে হয়? আমার এক কথায় উত্তর – না। 
প্রশ্ন চার: আচ্ছা টাকা পয়সা কেমন দেয়? খুব নাকি কম!! মুখে তিরষ্কারের হাসি মেখে আহারে টিচাররা কত কষ্ট করে বাচ্চাগুলোর জন্য। (উল্লেখ্য যিনি এই প্রশ্ন করেছিলেন তার ডাবল এম. এ পাশ করা সন্তান আবার আমার সম্মানী কত তা জানার উদ্দেশে আমার স্কুলের চেয়ারম্যান স্যারের কাছে ফোনও করেছিল অন্য এক অজুহাতে। দেড় বছর চাকরি করার পর আমি আমার ভয়ানক এক শারীরিক অসুস্থতার কারণে চাকরিটা ছেড়ে দেই। এরপর কিছু মানুষের আরও চাঞ্চল্যকর মন্তব্য – ভাল করেছো। নতুন বিয়ে, বাচ্চা হয়নি এখনো, পরে নিজের বাচ্চা যদি প্রতিবন্ধী হয় তখন কী করতে?
উল্লেখ্য, আমার স্বামী আমাদের যখন বিয়ের কথা হচ্ছিল তখন আমি কোথায় জব করি এটা জানার পর আমাকে বিয়ে করতে বিশেষভাবে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। আমার কাজের প্রতি তার শ্রদ্ধার অভাব আজ অব্দি দেখিনি। যা হোক আমি উনাদের এমন মানসিকতা উপলব্ধি করে কষ্ট পেয়েছি, ব্যথিত হয়েছি কিন্তু হীনমন্য হইনি কখনো।
আমার মনে হয়েছে এমন মানুষদের জন্য লজ্জা হয়, করুণা হয় কিন্ত ঘৃণা হয়না। কারণ আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি যারা মনের দিক থেকে এখনো শিক্ষিত হয়ে ওঠেনি তাদের মন একদিন শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবে। সেদিন তাদের বোধদয় হবে। সেদিন নিশ্চয় তাদের বড়-ছোট বাছ বিচার না করে, ভাল কাজ মন্দ কাজ বোঝার জ্ঞান হবে। তবে সবাই একরকম ভাবে তা বলছি না। আমার পেশা নিয়ে অনেক সাধারণ অসাধারণ মানুষ যথেষ্ট প্রশংসাও করেছে।
কিন্তু আফসোস আমার পরিচিতজনদের মধ্যে তাদের সংখ্যা আসলেই কম। তাই চাকরি ছেড়ে দিলেও, এতদিন পরে কোন রকম ভনিতা না করে বলতে ইচ্ছে করে এ ধরনের হীনমন্য, ছোট মানসিকতার মানুষদের জন্য আমাদের সরকার যদি কিছু করতেন! আমরা জানি আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল সারা বিশ্বের এবং বাংলাদেশের অটিস্টিক শিশুদের অধিকার নিয়ে এবং তাদের মানসিক বিকাশ ও উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।
আমি যখন গণমাধ্যমে দেখি দিনে দিনে আমাদের দেশের অটিস্টিক শিশুদের মানসিক বিকাশজনিত উন্নতি হচ্ছে তখন খুশিতে, তৃপ্তিতে আমার চোখে পানি চলে আসে। পাশাপাশি চিন্তা করি যারা এসব শিশুদের নিয়ে কাজ করছে তাদের সম্মানের কথা, উন্নয়নের কথা। এত সুন্দর, এত পবিত্র, এত ভালবাসার একটি কাজের মূল্যায়ন কি করছে আমাদের সমাজ?
তাই গণমাধ্যমেই বলতে চাই সমাজের যে অংশ এ পেশাকে অবহেলার চোখে দেখছে তাদের নিয়েও সরকার ভাবুক। তাদেরও মানসিক চিকিৎসা প্রয়োজন। তাদের কালো মন সাদা করতে সরকার প্রয়োজনে কাউন্সিলিংসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করুক। যাতে করে বাংলাদেশের মানুষ শুধু পড়ালেখায় শিক্ষিত না হয়ে মন ও মননে শিক্ষিত হয়ে বাংলাদেশকে একটি আলোকিত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে। সেই উদাহরণ সৃষ্টি করাটাই এখন কাম্য।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







