১৯২৩ সাল থেকে আন্তর্জাতিক সমবায় মৈত্রী সংস্থার (আইসিএ) উদ্যোগে প্রতি বছর জুলাইয়ের প্রথম শনিবার উদযাপন করা হয় আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস। জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ঐক্য, দৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তি, সমতা ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমবায় আন্দোলন বেগবান করাই দিবসটির লক্ষ্য।
দিবসটি উপলক্ষ্যে আইসিএ ও জাতিসংঘ যৌথভাবে প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে থাকে। এ বছরের সমবায় দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- ‘চুজ কো-অপারেটিভ, চুজ ইক্যুয়ালিটি’।
দীর্ঘকাল আগে থেকে পালিত হলেও ১৯৯২ সালের ১৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসের প্রথম শনিবারকে আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস ঘোষণা করা হয় (সিদ্ধান্ত ৪৭/৯০)। মূলত এই দিবসটি ঘোষণার অন্তরালে উদ্দেশ্য ছিলো একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক সমবায় জোট গোড়ে তোলা। একশ’টি দেশের ৭৬০ মিলিয়ন সমবায়ীকে এক ছাতার নীচে একত্রিত করা।
১৯৯৪ সালে সিদ্ধান্তে গৃহীত হয় যে,অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য সমবায় অপরিহার্য। আর তাই ১৯৯৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর গৃহীত জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের (৪৯/১৫৫) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি বছরই উল্লিখিত দিন সমবায় দিবস পালনের জন্য সরকার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমবায় সংস্থা, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা বিশেষায়িত এজেন্সিগুলোকে আহ্বান জানানো হয়।
প্রথম থেকেই বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস পালন করছে। প্রকৃত অর্থে সমবায়ের মূল নীতিই হলো সকলের প্রতি সহযোগিতা সুলভ মনোভাবের সঞ্চার ঘটানো। এই সহযোগিতাই আন্তর্জাতিক সমবায় সংস্থার মূল চালিকা শক্তি। বিশ্বের দেশগুলোতে অর্থনৈতিক,সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের জন্য এ সহযোগিতার গুরুত্ব অপরিসীম।
এ উপমহাদেশে সমবায় আন্দোলনের উন্মেষ ঘটেছিলো ১৯০৪ সালে। আজ এই চেতনা অর্থনীতির প্রায় সকল ক্ষেত্রেই বিস্তৃত। বাংলাদেশের সমবায়কে ধরে রাখা হলেও তা কাঙ্খিত সাফল্য লাভ করতে পারেনি। কোটি কোটি মানুষের মাত্র প্রায় লক্ষাধিক লোক সমবায়ের পতাকাতলে সমবেত হতে পেরেছে। যদিও গরীব মেহনতি মানুষের জন্য সমবায় নির্ভরতা অর্জনের জন্য খুবই উপযোগী পন্থা। কারণ, সমবায়ের আবেদন ব্যক্তিকেন্দ্রীক নয় বরং সমষ্ঠিকেন্দ্রীক।
সমবায়ের সম-অংশীদারিত্ব, সমপুঁজি, সমঝোতা ও পারস্পারিক হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশ উৎপাদন বৃদ্ধির যৌথ প্রচেষ্টা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত। আন্তর্জাতিক সমবায় সংস্থা (আই এস এ) এর বিধি বিধান অনুসরণে সমবায় দিবসে সাতরং এর সমবায় পতাকা উত্তোলন, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, কর্মশালা, আলোচনা ও র্যালী আয়োজিত হয়।
সাত রং এর সমাহার রয়েছে সমবায় পতাকায়। সাত রং এর মিশ্রণে জন্ম নেয় সাদা রং। আর সাদা রং হচ্ছে শান্তি ও সৌহাদ্যের প্রতীক। আন্তর্জাতিক সমবায় দিবসের আহ্বান হচ্ছে বিশ্ব শান্তি, ভ্রাতৃত্ব এবং পারস্পারিক সহযোগিতা।
বিশে সর্বপ্রথম সমবায় উদ্যোগ সংগঠিত হয়েছিলো ইংল্যান্ডে। ১৮৪৪ সালে ইংল্যান্ডের রডচেল শহরে ২৮ জন বেকার ও দরিদ্র তাঁতী বেতনভোগী কর্মচারী কারিগর মাত্র ২৮ পাউন্ড মূলধন নিয়ে সমবায় যাত্রা শুরু করে। অতি অল্প সময়ে তাঁরা জীবনযাত্রায় খুঁজে পায় অভূতপূর্ব সাফল্য। এতেই অনুপ্রাণিত হয় অন্যান্যরা। ফলে পর্যায়ক্রমে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে দারিদ্র বিমোচন, আত্মকর্মসংস্থান এবং মানবসম্পদ উন্নয়নসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে সমবায়ের দ্রত প্রসার বিস্তার লাভ করতে থাকে।
স্বল্পবিত্ত সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় মূলধন গঠন ও উৎপাদনমুখি লাভজনক কর্মকান্ড পরিচালনার মাধ্যমে সদস্যদের অর্থনৈতিক কল্যাণ ও জীবনমানের উন্নয়ন সাধন সমবায়ের মূল প্রেরণা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা ও লভ্যাংশের সুষম বন্টন হচ্ছে সমবায়ের ভিত্তি। সর্বপরি এটি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল একটি দেশের জন্য অর্থনৈতিক আন্দোলনের উৎস।
আন্তর্জাতিক কো-অপারেটিভ অ্যালায়েন্সের ২০১৪ সালের ঘোষণা হচ্ছে, সমবায় প্রতিষ্ঠানসমূহ টেকসই উন্নয়ন অর্জনে সক্ষম। ১৯৮৭ সালে টেকসই উন্নয়নের যে সংজ্ঞা দেয়া হয় তাতে উল্লেখ করা হয়, “ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিজস্ব চাহিদা পূরণের দক্ষতায় আপোষ না করে যে উন্নয়ন বর্তমানের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম তা-ই হচ্ছে টেকসই উন্নয়ন।” ইংরেজিতে বলা হয়েছে,Development that meets the needs of the present without compromising the ability of future generations to meet their own needs.
ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে ২০১২ সালের জুন মাসে ১৯২ দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে রিও+২০ ঘোষণা গৃহীত হয়। ১৯৯২ সালে এখানেই ধরিত্রী সম্মেলন (Earth Summit) হয়েছিল এবং তার বিশ বছর পর পুনরায় এমন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে এর নাম রিও+২০ হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে। যে দলিলে এ ঘোষণা আসে তাতে বলা হয়, “আমরা কেমন ভবিষ্যৎ চাই” (The Future We Want)।
রিও+২০ এর দলিলে বলা হয়, প্রত্যেক দেশ সবুজ অর্থনীতি অর্জন করবে। তবে তিনটি মৌলিক বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করতে হবে,তা হচ্ছে অর্থনেতিক, সামাজিক এবং পরিবেশ সংরক্ষণ। জাতিসংঘের অধিবেশনে রিও+২০ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ৩০ সদস্যের ওপেন ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয় যারা (Sustainable Development Goals –Post 2015) এর বিভিন্ন বিষয় ও প্রাধিকারসমূহ চিহ্নিত করেছে।
একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য হিসেবে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১২ টি এজেন্ডা চিহ্নিত করেছে। লক্ষ্যগুলো হল: (১) দারিদ্র বিমোচন, (২) মহিলাদের ক্ষমতায়ন এবং লিঙ্গ-সমতা, (৩) গুণগত শিক্ষা এবং জীবনব্যাপী শিক্ষা, (৪) স্বাস্থ্য সুরক্ষা, ( ৫) খাদ্য-নিরাপত্তা ও উত্তম পুষ্টি, ( ৬) সর্বজনীন পানি প্রাপ্তি ও পরিচ্ছন্নতার সুযোগ, (৭) স্থিতিশীল বিদ্যুৎপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা, (৮) কর্মের সুযোগ, জীবিকার নিশ্চয়তা এবং সমদর্শী উন্নয়ন, (৯) প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনা, (১০) সুশাসন এবং দক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, (১১) স্থিতিশীল এবং শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠা, (১২) বিশ্বজনীন ভালো পরিবেশ ও দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক উন্নয়ন ।
গণমুখী অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশের বিপর্যয় প্রতিরোধ এবং খাদ্য-নিরাপত্তার বলয় সৃষ্টিতে অন্যতম ও উৎকৃষ্ট পদ্ধতি হচ্ছে সমবায়ী উদ্যোগ। তাই সমবায়ী চেতনায় দিতে হবে নতুন উদ্দীপনা, সকল সহযোগিতা, আইন ও বিধিমালা সহজ করে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ। যেমনটি লক্ষ্য করা যায় জার্মানি, ডেনমার্ক, সুইডেন, নিউজিল্যান্ড অথবা অষ্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত বিশ্বে। এ সকল দেশে সমবায় অঙ্গনে বৃহৎ পুঁজির অনুপ্রবেশের ফলে সমবায় সমিতিসমূহ অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে এবং বিশ্ববাজারে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে।
দারিদ্র বিমোচন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশের বিপর্যয় প্রতিরোধ এবং খাদ্য-নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টিতে অন্যতম উৎকৃষ্ট পদ্ধতি সমবায়ী উদ্যোগ। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ সমবায়ের মাধ্যমে তাদের জীবনযাত্রা নির্বাহ করে। বিশ্বের ৩০০ টি সমবায় প্রতিষ্ঠানের সম্পদের পরিমাণ ৩০-৪০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার।
আন্তর্জাতিক সমবায় মৈত্রীর হিসাব অনুসারে, কানাডা, জাপান ও নরওয়েতে প্রতি ৩ জনে ১ সমবায়ী। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানিতে প্রতি ৪ জনে একজন সরাসরি সমবায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
বাংলাদেশে প্রধানত ২৯ ধরনের সমবায় সমিতি আছে যার মধ্যে কৃষি, মৎস্য ও পশুপালন, গৃহায়ণ, পরিবহন, দুগ্ধ উৎপাদন, ঋণ ও সঞ্চয় এবং ক্ষুদ্রঋণদান কর্মসূচি পরিচালনা হচ্ছে উল্লেখযোগ্য। সমবায় সমিতির সংখ্যা প্রায় ১,৮৬,১৯৯ যার সদস্য সংখ্যা প্রায় ৯৩ লক্ষ ৫০ হাজার। এর মধ্যে জাতীয় সমবায় সমিতি ২১ টি, কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি ৪৫৯ টি এবং অবশিষ্ট হচ্ছে প্রাথমিক সমবায় সমিতি। এ সকল সমিতির মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন ও বিতরণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
সমবায় সমিতিসমূহের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ মহিলা সমবায় সমিতি। সমবায়ে মহিলাদের অবদান উল্লেখযোগ্য, তাদের বিচরণ অবারিত ও দৃশ্যমান, যেমন বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড সমর্থিত সমিতিতে, তেমনিভাবে সমবায় অধিদপ্তর কর্তৃক নিবন্ধিত সমিতির তালিকায়।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি হচ্ছে “দেশের মাটি থেকে উত্থিত উন্নয়ন দর্শন” (Home grown development philosophy)। এ আদর্শ অনুসরণ করে অগ্রগতির পথে ধাবিত হচ্ছে দেশ। দেশের সামনে লক্ষ্য হচ্ছে সবার জন্য সমান অর্থনৈতিক সুযোগ, সামাজিক নিরাপত্তা বিধান, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, কর্মসম্পাদনে স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা ও সকল স্তরে সুরক্ষা বিধান।
“বাংলাদেশের সম্ভাবনা অপরিমেয়” এ সত্য বাস্তবায়ন করতে হলে দুটি বিষয়ে জোর দিতে হবে। প্রথমত, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসতেই হবে। দ্বিতীয়ত, সকল কর্মকাণ্ডে সুশাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে সমবায়ের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন অর্জন সম্ভব, এ বার্তা সুপ্রতিষ্ঠিত করাই হচ্ছে সমবায় অধিদপ্তরের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ এবং আর্ন্তজাতিক সমবায় দিবসের অন্যতম আবেদন।







