‘সব আছে আগের মতোই, শুধু মানুষটা নেই। ঘুম থেকে উঠেই বাবাকে মিস করি, কারণ সবার আগে আব্বার চেহারা দেখেই দিন শুরু হতো। বাসার বাইরে থাকলে প্রতিদিন দুপুর ২টা বাজলে বাবা ফোন দিতেন, কোথায় আছি। রাত দশটা বাজলে ফোন দিয়ে খবর নিতেন, বাসায় কখন যাবো। ফিরে একসঙ্গে খাবো। কোনো কোনো দিন রাত ১১টা-১২টা বাজলেও দেখতাম আমাদের জন্য বসে আছেন একসঙ্গে টেবিলে বসে খাবেন বলে। এই ব্যাপারগুলো খুব মিস করি।’
নায়করাজ রাজ্জাকের ৭৮তম জন্মদিনে চ্যানেল আইয়ে এসে এভাবেই বাবাকে নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন পুত্র সম্রাট।
মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বাংলা সিনেমা নিয়ে ভেবেছেন নায়করাজ। এমনটাই জানিয়ে সম্রাট বলেন, আব্বা মারা গেছেন সোমবার। তার আগের দিন রবিবার উনার সাথে কথা হচ্ছিলো। আমার একটা সিনেমায় তাঁর অভিনয়ের কথা। আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি এতো মোটা হয়ে যাচ্ছেন তাহলে চরিত্রটা কীভাবে করবেন? এমন প্রশ্নে তিনি বলেছিলেন, আমার চরিত্রটা কী সেটা তুমি আমাকে লিখে দিও। আর অভিনয়ের আগে ১৫ দিন সময় দিও, দেখবে এরমধ্যে আমি ফিট হয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবো!
এমন একজন সিনেমাপ্রেমী মানুষের জন্য বাংলাদেশ, কিংবা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি কিছুই করতে পারছে না বলেও মন্তব্য করলেন সম্রাট। তার ভাষ্য, ৫ দশকের বেশি সময় বাবা সিনেমাকে দিয়েছেন। অথচ তার মৃত্যুর পর আমরা কিছুই করতে পারছি না। বাংলাদেশ কিংবা এই সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিও তার জন্য কিছুই করতে পারছে না। ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক নেতা এসেছেন, চেয়ারে বসেছেন, পাওয়ার নিয়ে চলছেন। কিন্তু বাবা কখনো পাওয়ার নিয়ে চলেননি, পাওয়ারের পিছু ছুটেননি। বরং কাজ করে গেছেন। কারণ তিনি ছিলেন একজন শিল্পী।
সবার প্রতি প্রশ্ন রেখে সম্রাট বলেন, বাবার সামগ্রিক জীবন মূলত একজন শিল্পীর জীবন। কিন্তু তাকে কী আমরা তাঁর ঠিক প্রাপ্য দিতে পেরেছি? যে মানুষটা গোটা জীবন সিনেমার জন্য ব্যয় করেছেন, এতো সেক্রিফাইস করেছেন এই ইন্ডাস্ট্রির জন্য অথচ আজ তাকে নিয়ে চ্যানেল আইসহ দুয়েকটি টিভি চ্যানেল, কয়েকটি পত্রিকা লেখার মধ্য দিয়ে তাঁকে স্মরণ করলো। জাতি হিসেবে আমাদের উপলব্ধি করা উচিত, তাঁর কর্ম হিসেবে তাঁকে স্মরণ করার এতোটুকুই কী যথেষ্ঠ? এতোটুকু যদি না করতে পারি, তাহলে আমার মনে হয় এই ইন্ডাস্ট্রিতে শিল্পী হয়ে আসার কোনে মানে হয় না। কারণ, উনার মতো মানুষকে যদি মূল্যায়ণ না করা হয়, ঠিকভাবে স্মরণ না করা হয় তাহলে উনার পরে আমরা যারা আসছি, তাদেরতো কোনো পাত্তায় নেই।
১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন রাজ্জাক। স্বাধীনতার আগে ১৯৬৪ সালে ভারত ছেড়ে স্ত্রী লক্ষ্মী এবং একমাত্র সন্তান বাপ্পারাজকে নিয়ে অনিশ্চিত গন্তব্য ঢাকায় আসেন। পরবর্তীতে কষ্ট এবং মেধার অসামান্য সমন্বয়ে নিজেকে চলচ্চিত্রে প্রতিষ্ঠিত করেন নায়করাজ হিসেবে। ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
প্রায় ৫০ বছরের অভিনয় জীবনে বেহুলা, আগুন নিয়ে খেলা, এতটুকু আশা, নীল আকাশের নীচে, জীবন থেকে নেয়া, অবুঝ মন, রংবাজ, ওরা ১১জন, আলোর মিছিল, অশিক্ষিত, ছটির ঘণ্টা, বড় ভালো লোক ছিল, ও আমার দেশের মাটিসহ প্রায় ৫০০টি বাংলা ও উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ১৬টি চলচ্চিত্রের পরিচালক রাজ্জাকের মালিকানাধীন রাজলক্ষী প্রোডাকশনের ব্যানার থেকে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের কয়েক দশকের প্রধান অভিনেতা হিসেবে বিবেচিত রাজ্জাক মোট পাঁচবার শ্রেষ্ঠ অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। সংস্কৃতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০১৫ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করেন।








