মাধ্যমিক পর্যায়ে পাবলিক পরীক্ষায় নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষা বাতিল করার চিন্তা ভাবনা করছে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষামন্ত্রীর বরাত দিয়ে এ গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত খবর এসেছে। শিক্ষকসহ সুধি মহলে আলোচনা সমালোচনাও শুরু হয়েছে।
নৈর্ব্যক্তিক অভিক্ষা বাতিল করার পেছনে সরকারের চিন্তা সব বিবেচনায় নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কারণ এখন এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে পাবলিক পরীক্ষাগুলোয় ৪০% নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষার মাধ্যমে পরীক্ষার্থীর মেধা যাচাইয়ের চেয়ে বরং তাকে ‘অনৈতিক ভাবে’ পাস করিয়ে দেওয়া কিংবা বেশি নম্বর পাইয়ে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
পরীক্ষায় কথিত নকল না থাকলেও মহামারী আকার ধারণ করেছে নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষায় ফ্রি-স্টাইল দেখাদেখি করার প্রবণতা। এ ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মকর্তাগণও প্রতিকারের চেয়ে কথিত ‘সহযোগিতা’র মনোভাবই বেশি দেখান যা আমাদের পরীক্ষার মানে ধস নামাচ্ছে বলে অনেকের বিশ্বাস।
যেসব স্কুল পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকে, সমীক্ষায় দেখা যায় যে পাসের হার এবং ভালো রেজাল্টের দিক থেকে অন্যদের চেয়ে ওইসব স্কুল বেশ এগিয়ে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে এসব স্কুলের ছেলেমেয়েদের ভালো রেজাল্ট করার পেছনে একটা নীল নকসা কাজ করে। সে অনুযায়ী তারা কেন্দ্র বাছাই বা পরিবর্তন, সিট প্ল্যান এবং পছন্দসই শিক্ষকদের পরীক্ষার ডিউটিতে নিয়ে আসে।
নীল নকসা অনুযায়ীই বিশেষ পরীক্ষায় নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষায় নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তারা উত্তরপত্র তৈরি করে তাদের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করে থাকে। যার অভাবিত ফল দেখা যায় পাবলিক পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশ পাওয়ার পর।
সুতরাং এসএসসিসহ অন্যান্য পাবলিক পরীক্ষায় নৈর্ব্যক্তিক অংশ বাতিলের চিন্তা অবশ্যই সুদূরপ্রসারী, সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত। সরকারের সবকিছুতেই যারা ‘নেতিবাচকতা’র গন্ধ খোঁজেন তাদের দিকে না তাকিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিৎ জাতির বৃহত্তর স্বার্থে তাদের সুচিন্তিত পদক্ষেপকে এগিয়ে নেওয়া।
তা না হলে এমসিকিউ উত্তরের মতো ঘুরে ফিরে কিছু স্কুলই বরাবর শীর্ষ তালিকায় থাকবে। শীর্ষ তালিকায় থাকার জন্য তারা এখন যেরকম অনৈতিক চর্চা করছে, সেটা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। আরো ফুলে-ফেঁপে উঠবে তাদের শিক্ষা বাণিজ্য।
এমন বিবেচনায় পাবলিক পরীক্ষার ভিত্তিতে ‘সেরা স্কুল-কলেজ’ নির্বাচনে এতোদিনের রেওয়াজ তুলে দেওয়ার যে উদ্যোগ মন্ত্রণা্লয় নিয়েছে সেটাকেও শুভ উদ্যোগ বলতে হবে।
শুধুমাত্র রেজাল্টের ভিত্তিতে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ‘সেরা’র মর্যাদা দিয়ে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়ার ফল নিশ্চয়ই ভালো হয়নি। দেশের একশ্রেণীর ব্যবসাবাজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এর সুযোগ নিয়ে পুরো জাতির ঘাড়ে সিন্দাবাদের ভুতের মতো চেপে বসেছে। এরা কোনোভাবে একবার ‘সেরা’ তালিকায় নাম উঠিয়েই শুরু করে দেয় শিক্ষা নিয়ে বেসামাল ব্যবসাবৃত্তি। একশ্রেণীর অভিভাবকও ছেলেমেয়েদের ভালো রেজাল্টের আশায় এদের খপ্পরে পড়ে এখন ‘না পারছে সইতে না পারছে কারো কাছে মুখ ফুটে বলতে’।
‘সেরা’ প্রতিষ্ঠানের তালিকা না করার সিদ্ধান্ত অসুস্থ ও অগ্রহণযোগ্য প্রতিযোগিতা থেকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে অনেকটাই রক্ষা করবে বলে আশা করা যায়। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোও একধরণের মানসিক চাপ থেকে রেহাই পাবে।
মাধ্যমিক পর্যায়ের একজন শিক্ষক হিসেবে সরকারের দুটি সিদ্ধান্তকেই আমি সমর্থন জানাই। আশু বাস্তবায়নও কামনা করছি।
তবে শিক্ষার্থীদের আর গিনিপিগ না বানিয়ে একটা স্থায়ী মান গড়ে তোলাও খুব জরুরি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







