— একটা মেয়ের গলায় জুতার মালা
— এরপর তাঁর গায়ের কাপড় টেনে হিঁচড়ে বিবস্ত্র করা
— সেই দৃশ্য ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়ে সামাজিক ভাবে মেয়েটাকে আরও কয়েক দফায় হেয় করার চেষ্টা
ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনেকেই এটিকে মেলাচ্ছেন ‘গ্রাম্য শালিসের ভয়াবহতা’র সঙ্গে। প্রতিপক্ষ এইখানে দৃশ্যত পুরুষ নয়।
এই ন্যক্কারজনক ঘটনার শিকার বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের একজন নেত্রী।
তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি হলের আরেকটি ছাত্রীর সঙ্গে ‘কোটা বিরোধী আন্দোলন’ নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হবার এক পর্যায়ে ওই ছাত্রীর পা কেটে দিয়েছেন’। কেউ বলছেন, ‘রেগে গিয়ে ওই ছাত্রী জানালায় লাথি মারলে গ্লাস ভেঙ্গে তাঁর পা কেটে যায়।’ আরেক পক্ষের দাবী, ছাত্রলীগের অভিযুক্ত নেত্রী জনৈক ছাত্রীর পায়ের রগ কেটে দিয়েছেন। যদিও পায়ের রগ কাটা বিষয়টা এখন পর্যন্ত গুজব হিসেবেই জানা যাচ্ছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কবি সুফিয়া কামাল ছাত্রী হলে মঙ্গলবার মধ্যরাতে (বুধবার) যখন একাধিক শিক্ষার্থী সংগঠিত হয়ে ওই ছাত্রলীগ নেত্রীর উপরে চড়াও হয়, সেখানে উপস্থিত ছিলেন হলের আবাসিক শিক্ষিকারা সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর পর্যন্ত।
আমার মনে হয়, এই বর্বরচিত ঘটনায় তিনটা জিনিস কঠিন আলোচনা ও চিন্তার দাবী রাখে।
এক, রাজনৈতিক নীল নকশা?
সংঘবদ্ধ হয়ে জুতার মালা বানিয়ে নিয়ে এসে এমন আক্রমণ সাধারণত গ্রামে ফতোয়াবাজ বা ধর্ম নিয়ে বাণিজ্য করা গোষ্ঠীর কাজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে কোন মেয়েকে এইভাবে সামাজিক ভাবে হেনস্থা আগে কখনো করা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এসব শিক্ষার্থী কোন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে যদি এই ধরনের আক্রমণ করে থাকে, তবে সরকারের এইখানে গভীর নজরদারির প্রয়োজন। 
আশির দশকে যে আফগানিস্তানের মেয়েরা স্কার্ট পরত, বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করত, তাঁরা এখন আপাদমস্তক ঢেকে থাকা সমাজের অংশ, পুরুষের হাতের পুতুল, অনেকটা অলিখিত গৃহবন্দী- পরিবর্তিত ধর্ম-ভিত্তিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। বাংলাদেশের মেয়েরা রাজনীতিতে এগিয়ে যাচ্ছে এমন একটি সময়ে রাজনৈতিক নেত্রীর উপরে এমন বর্বরোচিত হামলা -তাও আবার মেয়েদেরই প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে কি একটু হলেও ভিত নাড়িয়ে দেবে না? সংঘবদ্ধ আক্রমণের নামে- মেয়েদেরকে মেয়েদের পেছনে লেলিয়ে দেওয়া কি বৃহত্তর গোষ্ঠীর ভয় দেখানোর কোন কৌশল কিনা খতিয়ে দেখা জরুরী। কারণ, যে মেয়েরা প্রক্টর ও আবাসিক শিক্ষকের সামনে দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের হল নেত্রীকে জুতার মালা দেবার ‘সাহস ও শক্তি’ রাখেন, তারা একজনমাত্র নেত্রীর হাতে জিম্মি ছিলেন এতো বছর, এটা অবিশ্বাস্য। এর অর্থ দাঁড়ায় দুটি বিপরীত রাজনৈতিক দল হলে বিদ্যমান ছিল। কোটা আন্দোলনকে সামনে রেখে পাড়ার দীর্ঘদিনের মোড়লকে ঘাড় মটকে দিয়েছে একাধিক শকুন। এসব শকুন কারা যারা এমন বাজে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করল? এই ঘটনা যে অচিরেই একটা প্রচলন হয়ে উঠবে না তার গ্যারান্টি কে দেবে? এইসব শকুন চিহ্নিত করে বিচার না করলে এমন ঘটনা মহামারীতে রূপ নেবার আশংকা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
দুই, শিক্ষার অবক্ষয়
কবি সুফিয়া কামাল হলের ছাত্রলীগ সভাপতি তাঁর কক্ষে আরেক নেত্রীকে অবরুদ্ধ করে পিটিয়েছে, দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের ছাত্রীর কাজ যদি হয় পেটানো, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা ও ‘স্ট্যাটাস’ কোথায় গিয়ে নেমেছে এটা চিন্তার বিষয়। আগে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত সব শ্রেণীর শিক্ষার্থী এখানে পড়ত। এরা সবাই মেধাবী, কিন্তু আরও মেধাবী হয়ে উঠত একে অপরের কাছ থেকে শিখে। আদবকেতা, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, দৈনন্দিন জীবনের টানপোড়েন, ভদ্রতা, মানবিকতা, মায়া-স্নেহ মমতা, ভালোবাসা, বন্ধন— এইগুলা একসঙ্গে একই বিত্তের সব মানুষের সাধারণত থাকেনা। বিভিন্ন বিত্তের শিক্ষার্থীর মেলবন্ধনে আমরা যা শিখি ভার্সিটি লাইফ থেকে, এর কোন পরিপূরক (অলটারনেটিভ) নেই। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তের একটা বিশাল অংশ বিদেশী ও দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়মুখী হওয়াতে একটা ছেদ পড়ে গেছে। শিক্ষার প্রকৃত বোধে ভাটা নেমে এসেছে। এটা এখন ‘মাছের বাজার’ বা গঞ্জের হাটে বসা ‘সার্কাস’ দল হয়ে গেছে।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে যে এখনকার বিশ্ববিদ্যালয় জেনারেশন ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রে পাস করা জেনারেশন। যে ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পাস, অবক্ষয় তার যেমন হয়েছে, যে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন কেনেনি কিংবা কিনতে পারেনি, জিপিএ কমে গিয়ে সেও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এইখানে অবক্ষয় নিয়ে গোটা জাতি অবগত।
সেই অবক্ষয়ের গঞ্জে হাঁট বসল। হাঁটে এক নেত্রীর বিচার হল। কিন্তু এমনভাবে বিচার হল যে সার্কাসে শেয়ালের চেয়ে শকুনের ক্ষমতা, দম্ভ, অমানবিকতা, মধ্যযুগীয় বর্বরতা আরও কয়েকগুণ বেশি আকারে ফুটে উঠলো।
তিন, সামাজিক অবক্ষয়
মেয়েটির গলায় জুতার মালা পরিয়ে তাঁকে বিবস্ত্র করার ভিডিওটা দেখার পরে আমার হাত পা কেঁপে উঠেছে, টপটপ বৃষ্টিতে ল্যাপটপ ভিজে গেছে। মনে হবে হয়ত হত্যারও উদ্দেশ্য ছিল।
এই মেয়েটা ছাত্রলীগের না হয়ে ছাত্রদল বা শিবিরের বা সাধারণ যে কেউ হলেও আমার দুঃখের, আতঙ্কের কিছু কম হত না।
সবচেয়ে খারাপ লাগছে সামাজিক গণমাধ্যমে নেওয়া বেশ কিছু প্রগতিশীল মানুষের অবস্থান। কয়দিন আগে চার বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণের আসামী যখন ক্রসফায়ারে পড়ল, তখন আমার ফেসবুক বন্ধুরা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে যা লিখেছেন তার সারমর্ম, ‘অপরাধ যদি করে থাকে… বিচার হবে আদালতে, প্লাস আইন শৃঙ্খলা বাহিনী বিনা বিচারে এভাবে শাস্তি দিতে পারে না।’
এই মেয়েটার বেলায় তারা অনেকেই সুর ঘুরিয়ে বলছেন, ‘এই মেয়েটা বাড়াবাড়ি করেছে, তাই উচিৎ শিক্ষা পেয়েছে।’
একটু মধ্যম পন্থা অবলম্বন করে কেউ বলছেন, ‘মেয়েটা কিন্তু ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছিল হলে, খুব খারাপ ব্যবহার করত সবার সঙ্গে, কোটা আন্দোলনের ওই মুহূর্তে তার এতো খবরদারি করা ঠিক হয় নাই, তারপরেও এইভাবে জুতার মালা না দিলেই পারত।’
আর চরমপন্থা অবলম্বনকারীরা বলছেন,
— এর চরিত্র ভালো না —বে — খা— প
— কি ভাবছিলা, সুন্দরী দেইখা পার পায়া যাবা?
—চেহারার দেমাগে মাটিতে পা পড়ে না, এক্কেরে ডাইরেক্ট জুতার মালা
যেন চরিত্র ভালো না হলেই একটা মেয়ের গলায় জুতার মালা দেওয়া জায়েজ? এই দেশে কতগুলা ধর্ষকের গলায় মেয়েরা জুতার মালা দিয়েছে, জানতে চাই। যেন চেহারা সুন্দর হওয়ার কারণেই জুতার মালাটা অনিবার্য ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এবং হাউস টিউটরদের উপেক্ষা করে তাদের সামনে প্রতিবাদকারী মেয়েরা যে মধ্যযুগীয় কায়দায় ছাত্রলীগের নেত্রীকে জুতার মালা পরান, পথে ঘাটে বাসে প্রতিদিন যে তাদের সহপাঠীরা যৌন হয়রানির শিকার হন, এসবের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়ে কখনো এইভাবে ফুঁসে উঠেনি। কেবল একটি মেয়ের পা কেটে যাবার কারণে তারা এতোটা বর্বরতার সূত্রপাত ঘটাল?
সংশপ্তকের দেশ যেন এই দেশ না হয়ে ওঠে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







