বিভিন্ন ধরনের বই, বই রিভিউ, বইয়ের লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের নিয়ে নানা ধরনের সংবাদ প্রকাশ করছে অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘বই নিউজ টোয়েন্টিফোরডটকম’। শুধুমাত্র বই নিয়ে ব্যতিক্রমী এই ওয়েব পোর্টালের সম্পাদক ও প্রকাশক শ্রাবণ প্রকাশনীর সত্ত্বাধিকারী, ছড়াকার রবীন আহসান।
প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর এই ওয়েব পোর্টালে প্রকাশিত বইয়ের নানা খবর নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে মুদ্রণ সংখ্যা ‘বই নিউজ’। বই নিউজের নানা দিক নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনের সাথে কথা বলেছেন বইনিউজটোয়েন্টিফোরডকমের সম্পাদক রবীন আহসান।
বই নিয়ে নিউজ কেন?
রবীন আহসান: বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু বইয়ের সংবাদ নিয়ে অনলাইন সংবাদমাধ্যমে বইনিউজই প্রথম। ‘বইয়ের দেশ’ পত্রিকা দেখে বইনিউজ পত্রিকা করার একটি পরিকল্পনা প্রথমে মাথায় আসে। ছাপানো পত্রিকা আমরা চালাতে পারবো কি না, টাকা খরচ, ছাপানো পত্রিকা কার কাছে যাবে? এরকম কয়েকটি সমস্যা নিয়ে চিন্তা করতে করতে প্রথমে অনলাইনে কাজ শুরু করি।বই নিউজের ওয়েবসাইটের পথচলা শুরু হয় তিন বছর আগে। যখন বই নিউজের ওয়েবসাইট তৈরির কাজ চলছে, তখন টোয়েন্টিফোরের রমরমা যুগ। কিছু হলেই তার সাথে টোয়েন্টিফোর লাগানো হচ্ছে। কিন্তু আমরা ভাবলাম অন্যভাবে।
এই সময়টাতে অনলাইনে থাকার পরেও আমাদের মনে হয়েছে যে প্রিন্ট ভার্সন দরকার। সেই চিন্তা মাথায় রেখেই আমরা গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি প্রিন্ট সংখ্যা বের করেছিলাম। অনলাইনেই মানুষ এখন বই কম পড়ে। যেহেতু মানুষ বই কম পড়ে, সেক্ষেত্রে অনলাইনে বইনিউটোয়েন্টিফোরডটকমের সাইটেও তেমন উল্লেখযোগ্য পাঠক পড়ছেন না। আমাদের ফেসবুক পাতায় লাইক এখন এক লক্ষ তেরো হাজার। পাঠক কম বলে বিজ্ঞাপন পাওয়াটা কঠিন। অনলাইন বইনিউজটোয়েন্টিফোরডটকমকে কেউ বিজ্ঞাপন দিতে চায় না। এ জন্য প্রিন্ট সংখ্যা বের করে আমাদের বন্ধু-বান্ধব যারা আছেন উপরের লেভেলে তাদের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন পাওয়া গেল। গত ফেব্রুয়ারিতে আমরা বই নিউজের দ্বিতীয় প্রিন্ট সংখ্যা প্রকাশ করি, এটি প্রকাশিত হবার পর আমরা মোটামুটি বেশ ভালো সাড়া পেয়েছি।
বই নিয়ে সংবাদ কম হওয়ার কারণ কি?
রবীন আহসান: আমাদের গণমাধ্যমে পাঁচ থেকে ছয় মাসে একজন ব্যক্তি তারকা বনে যাচ্ছেন। তাকে নিয়ে পত্রিকাতে প্রথম পাতায় স্থান দিয়ে ফলাও করে সংবাদ প্রচার করা হয়ে থাকে। আমাদের এখানকার অনেক লেখক রয়েছেন, যারা গত চল্লিশ বছর ধরে লেখালিখি করছেন, বাংলাদেশের জন্মের সাথে যাদের সম্পর্ক রয়েছে। তাদের নিয়ে কোনো নিউজ নেই। তাদের বই নিয়ে, তাদের জীবন কথা কোথাও প্রকাশিত হচ্ছে না। সব জায়গাতেই নায়ক-নায়কা সম্পর্কিত খবর এত বেশি। এই ধরনের খবর পশ্চিমা দেশগুলোতেও রয়েছে। কিন্তু সেখানে এগুলোর পাশাপাশি লেখকের সংবাদটিও রয়েছে। একটি শিক্ষিত, মুক্ত চিন্তার বিজ্ঞান ভিত্তিক সমাজ তৈরিতে লেখকদের যে ভূমিকা তাকে আরও বহুগুণে কার্যকর করতে গণমাধ্যমের যে দায়িত্ব রয়েছে, সেই দায়িত্ব বাংলাদেশের গণমাধ্যম সেভাবে পালন করছেনা। এক্ষেত্রে চরম অবহেলা রয়েছে।
বাংলাদেশের মূল ধারার যে পত্রপত্রিকা আছে, সেখানে বইয়ের খবর থাকে সাধারণত ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত। ফ্রেব্রুয়ারি মাসকে কেন্দ্র করে সবাই বইয়ের সংবাদ প্রচার করে থাকেন। কিন্তু বাকি সময় গণমাধ্যমে বইয়ের সংবাদ তেমন একটা প্রচারিত হয় না। যিনি বই লেখেন তিনি শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই বই লেখেন না, আর যিনি পাঠক, তিনি শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই বই কেনেন না, সারা বছরই বইয়ের খবরটা থাকা দরকার। আমাদের দেশে যেসব বই প্রকাশিত হয়। সেসব বইয়ের ফলাও প্রচার থাকে না। ফেব্রুয়ারি মাসে দুয়েকটা বইয়ের রিভিউ হয়, এর পরের মাসে তারপরে আর কিছু থাকে না। এদেশের গণমাধ্যমে নিজস্ব প্রকাশনার মাধ্যম শুধু একটি তালিকাভুক্ত লেখক ও তাদের বইকে গুরুত্ব দেয়া হয়। এতে করে বৈষম্যের সৃষ্টি হয়।
বইয়ের দেশের মতো আনন্দ বাজার গ্রুপের অনেকগুলো পত্রিকা যেমন- সানন্দা, আনন্দ আলো ইত্যাদি রয়েছে। এদের রয়েছে আনন্দ বাজার প্রকাশনা। এই প্রতিষ্ঠানটির কাজ হচ্ছে এসব গণমাধ্যমের প্রতিটির মাধ্যমে তারা লেখকদের প্রমোট করছেন, বই প্রমোট করছেন, তালিকাভুক্তদের পাশাপাশি অন্যদেরও প্রমোট করছেন। ওদের প্রকাশনা নিয়মিত বিক্রি হচ্ছে। বিক্রি বাড়ছে। আর অন্য লেখকদের কাছে রাখছে কারণ অন্যদের কাছে না রাখলে এক ঘরে হয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে।কিন্তু বাংলাদেশে এই সংস্কৃতি একদম নেই। যেমন- প্রথম আলো যেটি করছে যে নিজেদের প্রকাশনা করছে, নিজেদের লেখকদের প্রমোট করছে, কিন্তু বাকিদেরকে সেভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে না।
এখন অনলাইন বইনিউজে আমরা গত তিন মাসে যা প্রকাশ করেছি সেগুলো নিয়ে ত্রৈমাসিক একটি মুদ্রণ সংখ্যা করছি। এই মুদ্রণ সংখ্যাটি এক সাথে যেসব পাঠক ফেসবুকে নেই, অনলাইনে নেই, তারাও মুদ্রণ সংখ্যাটি পড়তে পারবেন, পাশপাশি এখনও যারা অনলাইনের বাইরে পত্র-পত্রিকা, বই ইত্যাদি পড়তে ভালোবাসেন তারা বই নিউজটিকে সংগ্রহে রাখতে পারবেন এবং অনেক বছর পর্যন্ত পড়তে পারবেন। এখন নতুন সংখ্যা থেকে আমরা গ্রাহক তৈরি করছি। প্রতিদিন প্রায় ১৭/১৮জন করে নতুন গ্রাহক তৈরি হচ্ছেন। অনলাইনে আমাদের পাঠক চাইলে যেকোনো সময়ই পড়তে পারবেন।
গ্রাহক তৈরির চিন্তার পিছনের কারণ?
রবীন আহসান: এখন আমরা যে বিষয়টি চাচ্ছি যে, বইনিউজের পাঠক বাড়ানো, ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জায়গায় গ্রাহক তৈরি করা। বর্তমানে মানুষ কিনে পত্রিকা পড়বেন এই অভ্যাসটি কমে গেছে। সব কিছু অনলাইন নির্ভর হয়ে গেছে। মানুষ ঘরে বসেই সব কিছু করতে চায়, কেনা-কাটা থেকে শুরু করে সব কিছু সে ঘরে চায়। ফলে আমরা চাচ্ছি যে বইনিউজকে সবার ঘরে পৌঁছে দিতে। সেজন্য চলছে গ্রাহক তৈরির কাজ। মাত্র দুইশো টাকায় আমরা চারটি সংখ্যা দেবো। ক্যুরিয়ার সার্ভিস চার্জসহ, মাত্র দুইশ টাকায় বছরে চারটি সংখ্যাই আমরা গ্রাহকের ঘরে পৌঁছে দেবো। সেজন্য এখন কাজ-কর্ম চলছে।
এখানে বইয়ের খবর, লেখকের খবর, পাঠকের খবর, বুক রিভিউ, বইয়ের আলোচনা, সবকিছু বইয়ের সাথে সম্পর্কিত। এগুলো কিন্তু আস্তে আস্তে একটি বইকে সারা বছর পাঠকের কাছে পরিচিত করে। এবং এর প্রভাব পরে বইমেলায় পড়ে। আমাদের দেশের রীতি হচ্ছে, বইমেলা শুরু হলে আমরা বইয়ের কিছু খবর দিয়ে থাকি। এতে করে সব বইয়ের ফোকাস ঠিক মতো থাকে না। কিছু বই যে সবার পড়া দরকার, সে বিষয়টি চাপা পড়ে যায়। আমরা এখন চাচ্ছি যে কিছু বইয়ের ফোকাস তৈরি করবো।
নির্দিষ্ট বই ও লেখকের উপর ফোকাস বৃদ্ধি কি বই বিক্রি বৃদ্ধির উপর প্রভাব ফেলবে?
রবীন আহসান: এ প্রসঙ্গে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সাম্প্রতিক আলোচিত লেখক কাশেম বিন আবুবকরের কথা। তাকে নিয়ে একটি বিদেশি গণমাধ্যম যখন সংবাদ প্রকাশ করলো, তখন তিনি আমাদের দেশে বেশ গুরুত্ব পেলেন এবং তাকে নিয়ে দেশীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচার শুরু হয়ে গেল। আমাদের এখানে কিন্তু শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ প্রচুর বিক্রি হয়েছে। সেগুলো নিয়ে কিন্তু আমাদের প্রচারণা নেই, বিদেশিদেরও প্রচারণা নেই। প্রচারণার অভাবে সত্যিকারের পাঠকপ্রিয় বইগুলোর নাম পর্দার আড়ালে চলে যাচ্ছে। বই সংক্রান্ত প্রচারণা এবং বইকে এগিয়ে নিতে গণমাধ্যম জরুরি। বিবিসির কালচারাল পাতায় যখন বড় বইয়ের খবর দেয়, তখন হ্যারি পটারের মতো বই হাজার হাজার লাখ লাখ কপি বিক্রি হয়।
গার্ডিয়ান, নিউইয়র্ক টাইমস যখন দেয়, তখন এসব বইয়ের কাটতি বেড়ে যায়।কাশেম বিন আবুবকরই বা কেন এত বছর পরে আলোচনায় আসলো? কেন আরো আগে আসলো না? কেন অন্য দেশের মিডিয়ার মাধ্যমে আসলো? আমাদের দেশের গণমাধ্যমের মাধ্যমে কেন আসলো না? এসব প্রশ্ন করলেই এই বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে বই বিষয়ে আমাদের গণমাধ্যমের অবহেলা রয়েছে।
কাশেম বিন আবু বকরের সংবাদ প্রথম প্রকাশিত হয় এএফপি। রিপোর্টের ধরনটা দেখেন, তিনি কতদিন ধরে লিখছেন, কতগুলো সংস্করণ তার বইয়ের বের হচ্ছে, কোন কোন এলাকায় তার বই পড়া হয়, ফলে ওই রিপোর্টার একটি ডিটেইলস তৈরি করেছেন। তিনি তো আর হঠাৎ লেখক হয় নাই। তার চল্লিশ বছরের লেখালেখি তাকে আজকে এই আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তার মতো একজন ‘ওই সারির’ লেখককে ফোকাস আন্তর্জাতিক মিডিয়া দিয়েছেন, সেটি করতে কিন্তু চল্লিশ বছর লেগেছে তার। আমাদের এখানকার লেখকদেরও যদি আমরা এরকম ফোকাস দিতাম, তাহলে তাদের বইও বিক্রি হতো। সুতরাং লেখক থেকে শুরু করে পাঠক, সবার জন্যই গণমাধ্যম জরুরি।
বই নিউজের ভবিষ্যতের লক্ষ্য কি?
রবীন আহসান: সারা দুনিয়াতে বাঙালি রয়েছে। আমাদের যারা বাঙালি প্রবাসী লেখক, তারা বই নিউজে লিখছেন, তাদের বই এখানে প্রকাশিত হচ্ছে। লেখকদের খবরা-খবরও তারা এখানে পাচ্ছেন। একটি কাগজের পত্রিকাতো আমরা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে পাঠককে পড়াতে পারতাম না। প্রতিনিয়ত পাঠক ও লেখক বৃদ্ধিতে এই অনলাইন পোর্টাল ভূমিকা রাখছে। এই চর্চাটি বাড়তে থাকলে পাঠক, লেখক, প্রকাশকের পাশাপাশি বইয়ের সাথে সম্পর্কিত সবাই লাভবান হবেন।
এখন যেহেতু অনলাইন থেকে ছাপানো পত্রিকার জন্য গ্রাহক পাচ্ছে, অনলাইন থেকে ছাপানো পত্রিকার জন্য বিজ্ঞাপন পাচ্ছে। অনলাইনটি একটি পরিচিতির মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞাপন আসছে, তাই ছাপানো পত্রিকা আমাদের জন্য লাভজনক। এটি শ্রাবণ প্রকাশনীর বই প্রকাশেও প্রভাব ফেলবে এবং আমরা যাদের বইপত্র নিয়ে আলোচনা করছি তাদেরকেও প্রচুর পাঠক তৈরি করে দিতে পারবো। পত্রিকার কারণেই অনেক বইয়ের বিক্রি বাড়বে। গণমাধ্যমে যাতে সব ধরনের লেখক, প্রকাশক, পাঠকের প্রতিফলন ঘটে, এমন চিন্তা মাথায় রেখেই বই নিউজের এই উদ্যোগ। সারাবছর যেসব বই বের হয়, সারা বছর যে লেখকদের সংবাদ থাকা দরকার, এটি মাথায় নিয়েই আমরা কাজ করি।








