একটা সেলফি। দামি শীতবস্ত্র পরা ১০-১২ জন ভদ্রলোক কিংবা ভদ্রমহিলা। কেউ কেউ ক্লোজআপ হাসি দিয়ে ভি চিহ্ন দেখাচ্ছেন। যার জন্য গরম কাপড়, তার অবস্থা কাহিল। এটা কোনো গল্পের শুরু নয়। আমার নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। চ্যানেল আই এ ন্যাশনাল ডেস্কে কাজ করার সুবাদে বিভিন্ন জেলার খবরগুলো প্রতিদিনই চেক করতে হয়। শীত আসলে প্রতিনিধিদের পাঠানো ভিডিও-চিত্রে এসব দেখি। হাসি। রাগ হয়।
এবার পরিস্থিতি একটু অন্যরকম। ইতোমধ্যে কয়েকটি জেলায় ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম তাপমাত্রা রেকর্ড করা হলেও সেলফিওয়ালাদের নড়াচড়া কম। আর এমপি কিংবা সরকারি ত্রাণেরও খবর নেই!
গত কয়েকদিনে বিভিন্ন জেলা থেকে আমাদের জেলা প্রতিনিধিরা নিউজ কাভার করে পাঠাচ্ছেন। দেশের উত্তরাঞ্চলে শীতের প্রকোপ বেশি হওয়ায় রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী থেকে প্রতিদিনই নিউজ আসছে।
এর মধ্যে বেশির ভাগ নিউজে শীতের তীব্রতার পাশাপাশি যে খবরটি উঠে এসেছে সেটি হচ্ছে ত্রাণের অভাবে শীতার্তরা কষ্ট পাচ্ছেন। কনকনে এই শীতে সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত কোনো শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়নি অনেক জেলায়। বেশিরভাগ এলাকায় খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন ছিন্নমূল মানুষ। আমাদের দিনাজপুর এবং কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানিয়েছেন, এরই মধ্যে শীতের তীব্রতায় দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে।
কুড়িগ্রামে শীতজনিত রোগে মারা গেছে ২ শিশু! এসব শুনতে শুনতে আমি ব্যথিত হই। আজব এই দেশটার ক্ষমতাবান মানুষগুলোকে নিয়ে চিন্তা করতে থাকি। ভাবি, আমিওতো শহুরে মানুষ। তাহলে আমি কী করতে পারি? আমি লিখতে পারি। মানুষকে জানাতে পারি। সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারি। আমার বিশ্বাস এই লেখা বিত্তবানরা কিংবা কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পড়ার পরে যত দ্রুত সম্ভব ভুক্তভোগীদের মাঝে শীতবস্ত্র নিয়ে হাজির হবে।
লেখাটা শুরু করেছিলাম সেলফি দিয়ে। সেলফিতে আমার আপত্তি নেই। আপনি যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের হয়ে ত্রাণ দিতে যান, তাহলে সেই তথ্য আপনাকে ক্যামেরাবন্দি করতে হয়। এটা আমার আজানা নয়। এর কারণ হল আপনি বা আপনারা যে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, সেটা সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান কেতাবি ভাষায় যাকে স্পন্সর বলা হয়, তাদের দেখাতে হয়। শুধু তাই নয়, ভালো কাজ সাধারণ মানুষ ছবিতে কিংবা ভিডিও দেখে জানবে, সেটা দোষের কিছু নয়। দোষ হয় তখন, যখন আপনি দুই টাকা দিয়ে হাজার টাকা দেয়ার ভান করেন। নিজে আয় করেন লাখ টাকা। এই উদাহরণ আমার ভুরি ভুরি জানা আছে। প্রতারণার এই শহরে নাম সর্বস্ব অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যারা শীতার্তদের পাশে দাঁড়াতে কনসার্টের আয়োজন করে। ফেসবুক পাতায় ইভেন্ট খুলে বসে। তারপর ওই দুই টাকা দিয়ে লাখ টাকা পকেটে পুরে হাজার টাকা দেয়ার ভাব করে। আমার এই লজ্জা দেয়া তাদের উদ্দেশ্য করে।
আবার শীত প্রসঙ্গে ফিরে যাই। উদ্দেশ্য একটাই। দুর্দশা বোঝানো। বেশ কিছু প্রতিনিধি ফোনে আমাকে জানিয়েছেন যে তারা যখন সংবাদ সংগ্রহ করতে যান তখন ছিন্নমূল মানুষের ভিড় জমে যায়। সবার ধারণা বুঝি ত্রাণ এসেছে। উত্তরাঞ্চল থেকে একজন প্রতিনিধি বললেন, ছবি তুলতে গেলেই শীতার্তদের আর্তি, ‘ক্যামরা (ক্যামেরা) নিয়া আচ্ছেন বাহে…। এডা গরম কাপড় ধরি আনলেন না ক্যা! শীতোত হামরা মরব্যার ধচ্ছি।’ চ্যানেল আই নিউজ এবং অনলাইন পড়ে জানতে পারলাম সোমবার ভোরে তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা ছিল সর্বনিম্ন ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস! নীলফামারীতেও ৩ ডিগ্রি, কুড়িগ্রামে ৩ দশমিক ১ এবং দিনাজপুরে ৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সঙ্গে শৈত্য প্রবাহে সেখানকার জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে।
এই অবস্থার ভেতর শীতবস্ত্র বিতরণের খবর পেয়েছি বলে স্মরণ করতে পারছি না। অথচ গত বছর আমার মনে আছে ত্রাণ বিতরণের নিউজ নিয়ে আলাদা কম্পাইল রিপোর্ট বানাতে হয়েছে। আমরা সংগত কারণেই নিউজগুলো প্রচার করতাম। অন্তত প্রচারের লোভে কেউ কেউ ত্রাণ দিক। ছুটে যাক মানুষের কাছে। কিন্তু এবার কেউ মাঠে নেই কেন? এবার কিন্তু মাঠে জনপ্রতিনিধিদের আগে যাওয়ার কথা। কারণ সামনে নির্বাচন। তারা তো নেইই; কর্পোরেট হাউসগুলোরও বিশেষ করে মোবাইল কোম্পানি বা বেসরকারি ব্যাংকগুলোর এবার কোন ত্রাণ তৎপরতা চোখে পড়ছে না। বিত্তশালীদের ব্যক্তি উদ্যোগেও কোন ত্রাণ তৎপরতা নেই। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ত্রাণের খবর যেটুকু আসছে সেগুলো উল্লেখ করার মতো নয়। অনেক জেলা থেকে নাকি আবার ত্রাণের জন্য সরকারি বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। সেসব বরাদ্দ কবে মিলবে কে জানে। শীত পালানোর পর?
রোহিঙ্গারা যখন বাংলাদেশে আসল তখন আমরা গণমাধ্যমের সুবাদে দেখেছি সেখানে কত ত্রাণ গেছে। ট্রাকের বহর নিয়েও যেতে দেখেছি অনেক জনপ্রতিনিধিদের। মন্ত্রী এমপিওরা বসে থাকতেন কক্সবাজারে গিয়ে। কর্পোরেট হাউস আর বিত্তশালীরা রীতিমতো পিকনিক আমেজে কক্সবাজারে গিয়ে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিয়েছেন। সেটা দোষের কিছু না। মানবতার কারণে সেটা বাংলাদেশ করেছে। বাংলাদেশের মানুষ করেছে। তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেশী দেশের মানুষের জন্য যদি আমরা এতো কিছু করতে পারি, তাহলে নিজের দেশের জন্য কেন নয়? সব ত্রাণ যদি রোহিঙ্গাদের দখলেই চলে যায় তাহলে আমার দেশের ছিন্নমূল মানুষ কী অপরাধ করল?
এই লেখা পড়তে পড়তে আপনি ভাবতে পারেন মানুষের কী এতই শীত কাপড়ের অভাব পড়েছে? গ্রামের লোকেরা কি খালি গায়ে আছে? যদি এমন ভেবে থাকেন, তবে আপনার জানার পিপাসা মেটানোর প্রয়োজন বোধ করছি। হাতে আইফোন কিংবা ল্যাপটপ সামনে নিয়ে হিটার চালানো রুমে বসে ফেসবুক চালাতে চালাতে এটা মনে হতেই পারে। ভুলে যাওয়ারই কথা এই বাংলাদেশের ৭০ কিংবা ৮০ শতাংশ মানুষ দরিদ্র। ভুলে যাওয়ারই কথা তারা প্রতি বছর দামী দামী গরম কাপড় কিনতে পারেন না। না জানারই কথা এই মুহূর্তে দিনাজপুরের যেকোনো ঘরে উঁকি দিলে কাশি, হাঁপানি কিংবা শ্বাস কষ্টের একজন হলেও রোগী দেখা যাবে। যিনি হাতুড়ে ডাক্তারের ওষুধ কিংবা সিরাপ খাচ্ছেন। কেউ কেউ সেটাও পাচ্ছেন না। আমার এই লেখা তাদের জন্য। আপনাকে লজ্জা দিতে নয়।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








