উপমহাদেশের ‘স্বর্ণকণ্ঠ’ খ্যাত কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোর বর্তমানে সিঙ্গাপুরের জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ১১ সেপ্টেম্বর থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করছেন তিনি। ১২ সেপ্টেম্বর তাঁর বায়োপসি করা হয়েছে। বায়োপসির রিপোর্ট আসার পর তাঁর চিকিৎসার পরবর্তী ধাপ বা পদক্ষেপ শুরু হবে। এড্রিনাল গ্লান্ট ( যেখান থেকে হরমোন উৎপন্ন হয়) বড় হয়ে যাওয়া সংক্রান্ত এক জটিল রোগে আক্রান্ত চিরসবুজ কণ্ঠের অধিকারী জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোর।
এই রোগের কারণে তাঁর শরীর ভেঙে যাওয়াসহ অন্যান্য বিবিধ জটিলতা তৈরি হয়েছে। একই সাথে তিনি কিডনি সমস্যায়ও ভুগছেন। এন্ড্রু কিশোর অসুস্থ এ খবর পান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর তাই স্ব-উদ্যোগেই তিনি বড় বোন হিসেবে এন্ড্রু কিশোরকে সু-চিকিৎসার জন্য দশ লাখ টাকা আর্থিক সম্মাননা হিসেবে প্রদান করেন গত ৮ সেপ্টেম্বর। কিন্তু এ খবর প্রচারিত হওয়ার পরপরই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রচন্ডরকম সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় উঠে। অনেকেই এন্ড্রু কিশোরের মতো সামর্থবান একজন শিল্পীর অর্থ সহায়তা নেওয়া বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। শিল্পীদের অনেকেই অবশ্য ফেসবুকে বলেছেন, এন্ড্রু কিশোর প্রধানমন্ত্রীর নিকট আবেদন-নিবেদন করে দুঃস্থ শিল্পী হিসেবে কোনো অনুদান নেননি। প্রধানমন্ত্রী যা দিয়েছেন সেটা সম্মাননা হিসেবেই দিয়েছেন অর্থাৎ দেশের একজন প্রখ্যাত শিল্পীকে তিনি মূল্যায়ন করেছেন হৃদয় থেকে। যেমনটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেছেন প্রখ্যাত শিল্পী সামিনা চৌধুরী।
তারুণ্যে এন্ড্রু কিশোরের সাথে তাঁর গাওয়া ‘আমার বুকের মধ্যে খানে মন যেখানে হৃদয় যেখানে’ এই অনবদ্য গানটি কালজয়ী এক গান হয়ে অমর অক্ষয় হয়ে আছে। ৮ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে সামিনা চৌধুরী লেখেন-বরেণ্য কন্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোর (‘দা) কে ডাকা হয়েছিল একটা প্রোগ্রামের ব্যাপারে আলাপ করার জন্য! এন্ড্রু ‘দা মাসখানেক ধরে হরমোনের সমস্যায় ভুগছেন এটা উনার ছোটবেলা থেকেই সমস্যা! একারণে ওজন একটু কমে গিয়েছে! স্কিন কালার একটু চেঞ্জ হয়েছে..। এটা জিজ্ঞেস করার পর এবং জানার পর প্রধানমন্ত্রী নিজে থেকে দাদাকে দশ লাখ টাকা পরিমাণ অর্থের একটি চেক দিয়েছেন।
এন্ড্রু ‘দা নিতে না চাইলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাকে বলেন যে চেকটি তিনি বড়বোন হিসেবে দিতে চাইছেন..।! একটা রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী যদি নিজে থেকে কাউকে কিছু দিতে চান সেটা উপেক্ষা করা তাঁকে অসম্মান করা বৈ কি। যথার্থই বলেছেন সামিনা চৌধুরী। তবে এও সত্য একজন সেলিব্রেটি শিল্পী বিপদে-আপদে পড়লে রাষ্ট্রকেই সবার আগে পাশে দাঁড়াতে হবে। সব দেশেই এ উদাহরণ রয়েছে।
উপমহাদেশের সঙ্গীত জগতে এন্ড্রু কিশোর নিঃসন্দেহে অনেক বড় মাপের একজন গুনী কষ্ঠশিল্পী। গত চার দশক ধরে যিনি হাজার হাজার গানে কণ্ঠ দিয়ে শ্রোতাদের হৃদয় প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিয়েছেন। বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বাধিক সফল ও শ্রেষ্ঠ প্লেব্যাক সিঙ্গার তিনি। তাঁর গাওয়া অজস্র গান এখন কালজয়ী হিসেবে চিহ্নিত।
ছোটবেলায় তাঁর গানের সাথে আমাদের পরিচয় মূলত রেডিও দিয়ে। যদ্দুর মনে পড়ে আশির দশকের প্রারম্ভে রেডিওতে তাঁর গাওয়া ‘ধূমধারাক্কা ধুমধাম’ গানটিই প্রথমে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করে। বাদল রহমান পরিচালিত এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী ছবিতে এটি ছিল তাঁর দ্বিতীয় প্লেব্যাক। এর আগে এন্ড্রু কিশোর প্রথম প্লেব্যাক করেন মেইল ট্রেন ছবিতে। এই ছবিতে ‘অচিনপুরের রাজকুমারী নেই যে তাঁর কেউ’ এই গানটিতে প্রথম কণ্ঠ দেন।
আশির দশকে এন্ড্রু কিশোর ভীষণরকম পরিচিত হয়ে উঠেন যখন এজে মিন্টু পরিচালিত প্রতিজ্ঞা ছবিতে প্লেব্যাক করে। খুব সম্ভবত ঐ একই সময়ে তাঁর গাওয়া ‘ওগো বিদেশীনি তোমার চেরী ফুল দাও, আমার শিউরি নাও’ এই গানটিও তরুণদের মুখে মুখে ফিরতে থাকে।
একই সময়কালে প্রতিজ্ঞা ছবিতে ‘এক চোর যায় চলে, এই মন চুরি করে’ এই গানটি তারুণ্যের হৃদয়ে এক অন্যরকম অনুরণন তোলে। আশির দশক মানেই এন্ড্রু কিশোরের এগিয়ে যাওয়ার পালা। আর সে সময় নতুন সিনেমা মানেই তাঁর কণ্ঠের সুপার ডুপার গান। আশির দশকে বেলাল আহমেদ পরিচালিত দুই নয়ন, আকবর কবীর পিন্টু পরিচালিত আঁখিমিলন, মাসুদ পারভেজ পরিচালিত নাগপূর্ণিমা, এজে মিন্টু পরিচালিত মিন্টু আমার নাম, মোহাম্মদ মহীউদ্দিন পরিচালিত বড় ভালো লোক ছিল। এসব ছবি মুক্তি পাওয়ার পর তার গাওয়া গানগুলো মারাত্বক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
এন্ড্রু কিশোর কয়েক হাজার গান গেয়েছেন। প্রেম-বিরহ, রোমান্টিক, আধ্যাত্নিকতা, দেশাত্ববোধক সব ধরনের গানই গেয়েছেন। গানের এক অফুরন্ত ভান্ডার তিনি। একবার এক সাক্ষাৎকারে দেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কনক চাঁপা তাঁর অগ্রজ শিল্পী এন্ড্রু কিশোর সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন এই বলে যে, ‘এন্ড্রু কিশোর! এক বিস্ময়কর দমের নাম, যে দম থেকে সুর ছড়িয়ে পড়ে আকাশে বাতাসে, নদীতে-সাগরে এবং যেখানে- সেখানে, তাদের সবাইকেই জড়ায় সুরের আরামদায়ক উষ্ণতায়।’ আসলে শুধু কনক চাঁপা নয়, এটি সবার মনের কথাই।
এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া জনপ্রিয় গানের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতরো। তাঁর অসংখ্য গান ভীষণ ভীষণ জনপ্রিয়। বড় ভালো লোক ছিল ছবির ‘ডাক দিয়েছেন দয়াল আমারে’, ‘হায়রে মানুষ রঙ্গীন ফানুস,’ আর বেলাল আহমেদ পরিচালিত দুই নয়ন ছবিতে গাওয়া ‘আমার বুকের মধ্যখানে মন যেখানে হৃদয় যেখানে’ ‘আমার সারাদেহ খেওগো মাটি’,-মেলোডিয়াস এই গানগুলো যুগ যুগ ধরে অন্যরকম সজীবতা বহন করছে।
আরও যদি বলি আকবর কবীর পিন্টু পরিচালিত ‘আঁখি মিলন’ ছবির ‘আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে,’ প্রতিহিংসা ছবিতে গাওয়া ‘আজ থেকে সারাজীবন তুমি যে আমার’, স্যারেন্ডার ছবিতে সাবিনা ইয়াসমিনের সাথে গাওয়া ‘সবাইতো ভালবাসা চায়, কেউ পায় কেউ বা হারায়’, চ্যালেঞ্জ ছবিতে গাওয়া ‘ও শবনম তোমারি মতন একটি বউ মোর আছে প্রয়োজন’, প্রাণ সজনী ছবিতে ‘কী যাদু করিলা পিরিতি শিখাইলা’, আলাউদ্দিন আলীর সুরে বউ শাশুড়ি ছবিতে ‘এতদিন পরে কাছে এলে যদি’ অশান্তি ছবিতে গাওয়া ‘কী দিয়া মন কাড়িলা ও বন্ধুরে, অন্তরে পিরিতের আগুন ধরাইলা’ একটি সংসারের গল্প ছবিতে ‘একবার যদি জানতাম আমি অন্তর কোথায় থাকে’, গলি থেকে রাজপথ ছবিতে রুলিয়া রহমানের সাথে গাওয়া ‘আমি গাড়ি কিনি নাই, গাড়ি চড়ার মানুষ নাই এই দু:খ কারে জানাই’, তমিজ উদ্দিন রিজভী পরিচালিত আর্শীবাদ ছবিতে রুনা লায়লার সাথে গাওয়া ‘চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা’।
প্রাণের চেয়ে প্রিয় ছবিতে গাওয়া ‘পড়ে না চোখের পলক’, ভেজা চোখ চবিতে ‘জীবনের গল্প বাকি আছে অল্প’, সাবিনা ইয়াসমিনের সাথে মাইয়ার নাম ময়না ছবিতে ‘ দুই নয়নে তোমায় দেখে নেশা কাটে না’, দুইজীবন ছবিতে রুনা লায়লার সাথে গাওয়া ‘তুমি আজ কথা দিয়েছ জেনেছ ও দুটি মন ঘর বাধবেই’, বিয়ের ফুল ছবিতে কনক চাঁপার সাথে গাওয়া ‘তোমায় দেখলে মনে হয়’, স্বপ্নের বাসর ছবিতে ‘কিছু কিছু মানুষের জীবনে ভালোবাসা চাওয়াটাই ভুল’, কাজের মেয়ে ছবিতে ‘একদিন তোমাকে না দেখলে বড় কষ্ট হয়’, তোমাকে চাই ছবিতে ‘ তোমাকে চাই শুধু তোমাকে চাই, আর কিছু জীবনে পাই না বা পাই’,-এরকম অজস্র গান রয়েছে। যে গানগুলো কণ্ঠসুধা ঢেলে ভরে দিয়েছেন এন্ড্রু কিশোর। মোট আটবার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন এই বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী।
এন্ড্রু কিশোর নিঃসন্দেহে আমাদের জাতীয় সম্পদ। সঙ্গীতে তাঁর অবদান অসামান্য। আমাদের সঙ্গীত জগতকে তিনি সৃমদ্ধ করেছেন নিরন্তর সাধনা আর ভালবাসা দিয়ে। এন্ড্রু কিশোর কে ‘বিস্ময়কর’ এক কণ্ঠশিল্পী বললেও ভুল হবে না। আমরা ইচ্ছে করলেই একজন এন্ড্রু কিশোর তৈরি করতে পারব না। একসময় সিনেমাতে শুধু তাঁর গাওয়া একটি গান দেখার জন্য অনেকেই টিকিট কেটে হলে ঢুকেছেন। এখনও রাস্তা-ঘাটে নির্বিচারে তাঁর গান বাজে।
শ্রমজীবি থেকে শুরু করে সমাজের এলিট শ্রেণী সবার কাছেই তাঁর কণ্ঠ সমান সমাদৃত। কিন্তু সেই শিল্পীর অসুস্থতার সময়ে তাঁর দুঃখ-কষ্টের দিনে আমরা সহমর্মিতার বদলে যেভাবে প্রশ্ন তুললাম, সমালোচনা করলাম-সেটি আমাদের সংস্কৃতির সীমাবদ্ধতা ও সংকটটাকে উন্মোচন করেছে। কিছু হলেই না জেনে শুনে আমাদের মধ্যে এখন লাঠি নিয়ে তেড়ে আসার এক ধরনের ভয়ংকর বাজে প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
আমাদের শিল্পী বা এই জগতের কেউই সমাজের মহা ক্ষমতাবান কেউ নন। কেউ ব্যাংক লুটপাটকারী, দুর্নীতিবাজ বলেও খ্যাত বা স্বীকৃত নন। শুধু পেশাকে আঁকড়ে ধরেই তারা সবাই আমাদের সাংস্কৃতিক জগতকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। একটা সময় আমাদের সাংস্কৃতিক জগতের গুনী ব্যক্তিদের দুঃসময়ে খুব একটা খবর কেউ রাখতেন না। কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ব্যতিক্রম। অনেকটা যেঁচে তিনি খবর রাখেন এবং সহযোগিতার হাত বাড়ান। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন ভিন্ন দলের সমর্থক হওয়ার পরও প্রধানমন্ত্রী তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার কারণে দেশের আরেক প্রখ্যাত সুরকার আলাউদ্দিন আলী চরমভাবে আর্থিক অনটনের শিকার হয়েছেন। তাঁর পাশেও প্রধানমন্ত্রী দাঁড়িয়েছেন। এরকম আরও অনেক অনেক উদাহরণ আছে। আমাদের সঙ্গীতাঙ্গনে একজন এন্ড্রু কিশোর বা একজন সুরকার আলাউদ্দিন আলী বা একজন রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিনের যে অবদান তাঁদেরকে বাঁচাতে দশ লাখ কেন দশ কোটি টাকা দিলেও কী রাষ্ট্রের ঋণ শোধ হয়? প্রধানমন্ত্রীর মমতাময়ী হাত থেকে চিকিৎসার জন্য দশ লাখ টাকা নিয়ে এন্ড্রু কিশোর ভুল করেননি। বরং আমরাই তাঁকে অপমান অসম্মানিত করে ভুল করলাম।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







