পুলিশের হাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ফাহমিদুল হক লাঞ্ছিত হওয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিভাগের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তারা।
এছাড়াও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক রেহনুমা আহমেদসহ ফাহমিদুল হক ও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি বাকী বিল্লাহকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
দুই প্রতিবাদ অনুষ্ঠান থেকেই নিপীড়ক ও হামলাকারীদের সনাক্ত করে রাষ্ট্রীয় আইনে বিচারের দাবি করা হয়।
বুধবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধন শেষে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করে। মিছিলটি অপরাজেয় বাংলা থেকে শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থান প্রদক্ষিণ করে অপরাজেয় বাংলায় এসে শেষ হয়।
মানববন্ধনে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতিরসহ সভাপতি মীর আরশাদুল হকের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন ওই বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন ও শিক্ষার্থীরা।
গীতি আরা নাসরীন বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স একশ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যতিক্রমী ইতিহাসের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক সদস্যের সংগ্রামের ইতিহাস জড়িত। যার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মাধ্যমে সেইসব সংগ্রাম, ইতিহাসের কথা স্মরণ করে রাখা হয়েছে। কিন্তু আজকে সেসব স্থাপনাতে শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করতে গেলে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। আর শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে শিক্ষকরা লাঞ্ছিত হয়েছে। আমরা শিক্ষার্থীদের অভিভাবক। কিন্তু আজকে আমরা, শিক্ষার্থীরাসহ কেউ নিরাপদে নেই।
তিনি আরো বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের অনেককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে তাদের তুলে নেওয়া হয়েছে। এখন তারা কোথায়? বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীর অভিভাবক এসে যাতে আমাদেরকে বলতে না পারে যে তাদের সন্তানকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এধরনের কথা যাতে আর শুনতে না হয়। এজন্য প্রশাসনের কাছে আহ্বান জানাই। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।
মানববন্ধনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মাসুদ আল মাহদী বলেন, আমরা এরকম মানববন্ধন অনেক করেছি। কিন্তু একটি ঘটনারও বিচার হয়নি। শিক্ষকরাও নির্যাতন, নিপীড়নের শিকার আজকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি লাইকও দেয়া যায় না। অর্থাৎ মত প্রকাশের কোনো স্বাধীনতা নেই। সব জায়গাতে হস্তক্ষেপ করে রাখা হয়েছে। আমরা এখন ফ্যাসিবাদী সরকার শেখ হাসিনার অধীনে বাস করছি।’
এ সময় মানববন্ধনে আরো বক্তব্য রাখেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী কাজী আনিস, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক রুশদ ফরিদি সহ আরো অনেকে।
কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক রেহনুমা আহমেদসহ ফাহমিদুল হক ও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি বাকী বিল্লাহকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানানো হয়। পাশাপাশি নিপীড়ক ও হামলাকারীদের সনাক্ত করে রাষ্ট্রীয় আইনে বিচারের দাবি করা হয়।
বুধবার দুপুর ১২টায় জাহাঙ্গীরনগরের ‘শিক্ষক-শিক্ষার্থী ঐক্য মঞ্চ’ ব্যানারে সমাজবিজ্ঞান অনুষদ ভবনের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও অনুষদ প্রদক্ষিণ শেষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়।
পরে সেখানে মিছিল পরবর্তী একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশের আয়োজন করে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ঐক্য মঞ্চ। সমাবেশে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, কোটার কারণে সরকারি চাকরিতে একধরনের অরাজকতা বিরাজ করছে। সরকার সহজেই এর সংস্কার না করে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর যে ভাষণ দিয়েছেন তা সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর রাগের বহিঃপ্রকাশ করে। এই রাগের কারণেই পরবর্তীতে ছাত্রলীগ-পুলিশ সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে।
‘শিক্ষক-শিক্ষার্থী ঐক্য মঞ্চ’র আহ্বায়ক অধ্যাপক নাসিম আখতার হোসাইন বলেন, ‘১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়ে যায়নি। নতুন প্রজন্ম অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে। সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন প্রজন্ম সংগ্রাম করে যাচ্ছে।’
প্রধানমন্ত্রী কোটা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেও নতুন প্রজন্মের সাথে ভাওতাবাজির আশ্রয় নিয়েছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নাসিম আখতার হোসাইন আরও বলেন, ন্যায্যতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বিভাজিত সমাজে কোটার প্রয়োজন হয়। তার মানে এই নয় সর্বক্ষেত্রে কোটা থাকতে হবে।
এ সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধের কসম করে বলেন, যারা বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে মেধাবীদের সুযোগ না দিতে চায় তারাইতো মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধাচারণ করছেন। একই সাথে সরকারকে দমন-নিপীড়ন বন্ধ করে কোটা সংস্কারে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম, অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস, অধ্যাপক আনোয়রুল্লাহ ভূঁইয়া, সহযোগী অধ্যাপক আনিছা পারভীন জলি, সহযোগী অধ্যাপক রায়হান রাইন, সহযোগী অধ্যাপক শরমিন্দ নীলোর্মীসহ শতাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন।








