পরদিন সকালে আমরা আবার বেড়িয়ে পড়লাম। আমরা সুন্দর ছোট্ট আঁকাবাঁকা থিম্পু চু’র উপর তেমনি ছোট্ট নান্দনিক ব্রিজ পার হয়ে গেলাম তাদের লোকশিল্প জাদুঘর পরিদর্শনে। ঐতিহ্যের নানা উপকরণসমৃদ্ধ জাদুঘর পরিদর্শন শেষে আঁকাবাঁকা রাস্তা আর পাহাড় ছাড়িয়ে এলাম এক বৌদ্ধ মন্দিরে। ভুটানের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী। সুন্দর এই মন্দিরের উপরে সোনালী রঙের মিনার। লনে হাজারো কবুতর উড়াউড়ি করছে। কিছু দেশি বিদেশি পর্যটক ঘোরাঘুরি করছে। চলছে প্রার্থনা।
মৃদু ঘণ্টা বাজিয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করে এক অপরূপ সুরমূর্ছনার তালে তালে সবাই মন্দিরের বেদীর চারপাশে ঘুরছেন। জুতা খোলার বাহুল্য নেই, অংশগ্রহণে কোনো কড়াকড়ি নেই। যে যার মত অংশগ্রহণ করছেন, কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন। কিন্তু ভক্তিভাব ও উপাসনার কোনো তালভঙ্গ হচ্ছে না। ওদের ধর্ম ও ধর্ম পালনও কত উদার, কত একোমোডেটিভ! রোদ উপেক্ষা করে চলল আমাদের ছবি তোলা আর মন্দির-দর্শন পর্ব।
এরপর আমাদের গন্তব্য বুদ্ধ পয়েন্টে। ২ হাজার ফুট উঁচু পাহাড় কেটে সমতল করে তৈরি হচ্ছে বুদ্ধ পয়েন্ট। ওপরে ২০০ ফুট উঁচু বুদ্ধমূর্তি। সোনা রঙের এই মূর্তিটির গায়ে যখন সূর্যের আলো পড়ে তখন মনে হয় গৌতম বুদ্ধের শরীর থেকে যেন জ্যোতি বেরুচ্ছে। ধর্মভীরু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা অবনত মস্তকে তাদের শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন। চারপাশের পাহাড়গুলোর সৌন্দর্য এখান থেকে উপভোগ করার মতো। চারপাশে বিশাল প্রাচীর বেষ্টিত সুউচ্চ গম্বুজওয়ালা এই বৌদ্ধমন্দির। রয়েছে নানা দেশের পর্যটকের সমারোহ। ১৬৭ ফিট এর বিশালাকৃতি বুদ্ধাকে দেখে নিজেকে তুচ্ছ মনে হচ্ছিল তখন। পুরো শহরটাকে চোখে পড়ে এখান থেকে। উপর থেকে শহরটিকে অনেক সুন্দর লাগছিল। বাড়িগুলিকে মনে হচ্ছিল সারি সারি ম্যাচবাক্সের মত।
এখানকার বাড়িগুলি খুব উঁচু নয়। তবে উপরে ছাদের রঙ ম্যাচবাক্সের বারুদের রঙের মত। কোনো কোনোটি আবার সবুজ। মেঘ পাহাড়ের গায়ে গায়ে ঘুমিয়ে আছে। থিম্পু শহর যেন ছবির মত সাজানো। রাজধানী, অথচ বিশাল অট্টালিকা নেই। বাড়িগুলি ইট কাঠের তৈরি। দুইতলা বা তিনতলা বাড়িগুলিতে টিনের ছাদ আর প্রতি বাড়িতেই Zorig Chosum চিত্রকর্মের দেখা মেলে। শহরে নেই ট্র্যাফিক জ্যাম। ভিক্ষুক নেই। চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই নেই, অপরাধ নেই। একজন পুলিশের সঙ্গে কথা হলো। তিনি জানালেন, তার ১০ বছরের চাকরি জীবনে তেমন কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দেখেননি। এখানে যদি কোনো মারামারির ঘটনা ঘটে, পরবর্তীসময়ে উভয় পক্ষ ব্যাকুল হয় কার আগে কে ক্ষমা চাইবে, ঘটনার সুরাহা কীভাবে হবে-তার জন্য। একেবারে ছোটকাল থেকেই স্কুলগুলোতে নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হয়। শেখানো হয় পরিচ্ছন্নতা।
স্কুল-কলেজ-বাসগৃহ পরিস্কার রাখা প্রত্যেকের কারিকুলামের অংশ। এ ছাড়া সপ্তাহে একদিন তাদের নিয়ম করে শহর কোনো একটি অংশে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নিতে হয়। তাইতো এখানকার বাড়ি-ঘর, বৌদ্ধমঠ, রাস্তা-ঘাট সব কিছুই ঝকঝকে ছবির মত। আসার পথে আমরা জাতীয় গ্রন্থাগার, ভুটান সচিবালয়, রাজার বাড়ির চারপাশে গাড়ি নিয়ে ঘুরলাম।
তাহমিদের সঙ্গে পূর্বসম্পর্কের সূত্র ধরে আমরা এ দিন মধ্যাহ্নভোজের নিমন্ত্রণ পেয়েছিলাম ভুটানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত যিষ্ণু রায়চৌধুরীর বাসভবনে। পাহাড়ের পাদদেশে রাষ্ট্রদূত মহোদয়ের বাসভনটি অসম্ভব সুন্দর। আমরা সেখানে পৌঁছানোর পরই বৃষ্টি শুরু হলো। ভদ্রলোক আমাদের এই বিশাল বাহিনীকে প্রথমে আপেল জুস ও মোমো দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। এরপর নানা পদের বাহারি আইটেমসহযোগে হলো ভুরিভোজ। শাক-সবজি, মাছ, মাংস, ডাল সবজি-কোনো কিছুরই ঘাটতি ছিল না। ভুটান সম্পর্কে, ভুটানের মানুষ সম্পর্কে অনেক তথ্য আমরা তার কাছ থেকে জানতে পারলাম। খাওয়া-দাওয়া শেষে আমরা বৃষ্টি মাথায় নিয়েই ছুটলাম এক দুর্গম এলাকার পাহাড়ি ঝর্ণা দেখতে। প্রায় দুই ঘণ্টা চলার পর আমরা নির্ধারিত স্থানে পৌঁছোই। শহর থেকে দূরে নির্জনে বন-নদী-ঝর্ণার অপরূপ রূপে মুগ্ধ হয়ে আমার আবার রওনা হলাম শহর অভিমুখে।
এখানে ঘটল একটি মজার ঘটনা। আশেপাশে কোথাও কোনো টয়লেট আছে কি-না জানতে চাইলে তাশিজি তাৎক্ষণিক মাথা নেড়ে বলে ‘বুশ’-‘বুশ’! প্রথমে আমরা বুঝতে পারিনি। পরে যখন বুঝলাম সে জঙ্গলে যাবার কথা বলছে, তখন আমরা হেসেই লুটোপুটি। পুরো ভ্রমণে আমাদের ‘কি-ওয়ার্ডে’ পরিণত হলো-বুশ-বুশ! বাচ্চারাও কারণে-অকারণে বুশ-বুশ বলে উঠত। যেহেতু আমরা অনেক বেশি জায়গায় এবং দুর্গম এলাকায় ঘুরেছি, কাজেই আমাদের সবাইকেই ‘বুশ’-এর অভিজ্ঞতা নিতে হয়েছে।
ফেরার পথে আমরা গেলাম পাহাড়ের মাথায় থিম্পু ভিউপয়েন্টে একঝলকে থিম্পুর মনোরম ভিউ দেখলাম। পাহাড় থেকে নেমে এসে হেঁটে ঘুরলাম থিম্পু ডাউনটাউন। সুবন্যিস্ত দোকানপাট আছে। কিন্তু তাতে তেমন খরিদ্দার নেই। বেশিরভাগ দোকান মেয়েরাই চালায়। রাস্তাঘাটে, দোকানে পুরুষের তুলনায় মেয়েদের বেশি দেখা গেছে। জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি। প্রায় সব পণ্যই ভারত থেকে আমদানি করা। আমদানির কারণে এইসব পণ্যের মূল্য অধিক পড়ে যায়। এখানে দরাদরি নেই। সব জিনিস একদামে বিক্রি হয়। যেন ‘ভদ্র লোকের এক কথা!’
প্রায় সব ভুটানির পোশাক একই রকম। পুরুষের পোশাক ‘ঘো’ বা ‘গো’ (gho) আর নারীর পোশাক ‘কিরা’ (kira)। ‘গো’ হল অনেকটা জোব্বার মতো হাঁটু-ছাড়ান পোশাক, কিন্তু তাকে হাঁটু পর্যন্ত ঝুল রেখে কোমরের কাছে তুলে কাপড়ের ফিতের মতো বেল্ট ‘কেরা’ (kera) দিয়ে আটকে রাখা হয়। কোমরের কাছে জোব্বাটা ফুলে থেকে বড়ো পকেটের কাজ করে। জোব্বার প্রান্তদুটো মেলে পেছনে নিতম্বের দিকে। ‘গো’র হাতা দুটো হাতের আঙুল ছাড়ানো লম্বা আর ঢিলে। কব্জির কাছে হাতা শেষ হয়েছে গোল হয়ে। শেষ অংশের অন্তত চার ইঞ্চি কিন্তু সাদা, পোশাকের রঙ যেমনই হোক না কেন। পোশাকের আরেক অঙ্গ হাঁটু পর্যন্ত লম্বা মোজা। ব্যতিক্রম চোখে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে না।
কিরা বেশ বড়ো একটা বস্ত্রখণ্ড। পরার জন্য কিছু ভাঁজ ও প্যাঁচ আছে। কিরার জন্যও কেরা বা কোমরবন্ধনী দরকার। ‘গো’র মতো এর হাতাও লম্বা, গোলাকার এবং কবজি পর্যন্ত গুটিয়ে রাখা হয়। ‘গো’ আর ‘কিরা’ ভুটানিদের ঐতিহ্যবাহী জাতীয় পোশাক। পথেঘাটে অধিকাংশ নারী-পুরুষকে এই পোশাকই পরতে দেখেছি। ব্যতিক্রম নেই বললেই চলে।
এখানে রাস্তায় হাঁটতে ভীষণ ভালো লেগেছে। প্রতি পদে নিজেকে সামলে চলতে হয় না। লোকজনের মধ্যে শিক্ষা, স্বচ্ছলতা আছে, দেখলেই সভ্য-ভব্য মনে হয়। ছিমছাম গোছালো এই দেশটি তার প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষকে সর্বদা সুখে রাখতে চায়। নিজেরা বিদ্যুৎ এতই উৎপাদন করেছে যে, দেশের বিদ্যুতের চাহিদা মিটিয়েও ভুটান ভারতের কাছে বিদ্যুৎ রফতানি করে থাকে। প্রচুর খাদ্যশস্য উৎপন্ন হওয়ায় দেশটি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। দেশটির কোথাও কোন অভাব বা অনুযোগের চাপ নেই। পাহাড়ের সারিতে সারিতে একই ধরনের ঐতিহ্যবাহী নকশায় নির্মিত বাড়ির বাসিন্দারা যেন নিজেদের জীবন নিয়ে পৃথিবীর বুকে ছোট্ট এই দেশটিকে জন্মে ভীষণ গর্বিত।
রাতের খাওয়া সারলাম ফোক মিউজিয়ামের পাশে বিখ্যাত এক ভুটানি রেস্টুরেন্টে। মেনু আগেই বলা ছিল। আমাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল ভুটানি সব খাবার চেখে দেখা। বলা ভালো, এ ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা সুখকর হয়নি। প্রায় আট-দশটি আইটেমের কোনোটিই আমাদের কাছে ভালো লাগেনি। লবণছাড়া চাল ভাজা, ভুট্টা ভাজাও আমাদের খুব একটা টানেনি। কিন্তু আমাদের সঙ্গী ভুটানি গাড়িচালক তাশিজিকে অনেক আনন্দ করে খেতে দেখলাম।
একজন তো বলেই বসল, ব্যাটা মনে হয় ঈদের খাবার খাচ্ছে! বাচ্চারাও এই খাবার গলাধকরণ করতে পারল না। ওদিকে সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে। রাতে হোটেলে ফিরে অগত্যা পাউরুটি আর জেলি দিয়ে বাচ্চাদের শান্ত করতে হলো। এর মধ্যে আমাকে চমকে দিয়ে একটি কেক কাটার আয়োজন করা হয়। ফেসবুক সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে, আমার জন্মদিনের কথা! অনেক রঙ্গ-তামাশার মধ্যে দিয়ে জন্মদিনের উৎসবও পালন করা হয়।








