‘শপথই শেষ কথা নয়। প্রয়োজন শপথের চর্চা, অনুশীলন ও লালন। শপথের প্রতিটি শব্দ শরীরের অস্থি-মজ্জা-রক্তে একীভূত করে ফেলতে হবে।’
দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হিশেবে শপথ নেয়ার পর নবনিযুক্ত তিন বিচারপতিকে দেয়া সংবর্ধনায় একথা বলেছেন বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম।
রোববার আপিল বিভাগের আদালত কক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে দেয়া সংবর্ধনায় বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম বলেন, ‘আমি শপথ নিয়েছি, আইন অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সহিত আমার কর্তব্য পালনের। বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ এবং দেশের সংবিধান ও আইনের রক্ষণ-সমর্থন ও নিরাপত্তাবিধানের। ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে সকলের প্রতি আইন-অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করার। আমি দৃড় ভাবে বিশ্বাস করি শপথ বানীই শেষ কথা নয়। প্রয়োজন শপথের চর্চা, অনুশীলন ও লালন। শপথের প্রতিটি শব্দ শরীরের অস্থি-মজ্জা- রক্তে একীভূত করে ফেলতে হবে। আমি আন্তরিক ভাবে চেষ্টা করবো শপথের চর্চা ও লালন করতে।
বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ-লালন ব্যতিত বাংলাদেশের সংবিধানের রক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান সম্ভব নয়। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মননে ও মগজে না রেখে সংবিধান ব্যখ্যা করলে সিদ্ধান্ত ভুল হওয়াই স্বাভাবিক। তাই আমি মনে করি সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকার্য পরিচালনা করতে গেলে সংবিধান ও আইনের ব্যাখ্যা প্রদান করতে হবে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে ধারণ করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বিচার বিভাগের দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন, ইতিমধ্যেই তা সব মহলে প্রশংসিত হয়েছে। তাই আসুন আমরা সবাই মিলে আমাদের এই বিচার অঙ্গণকে কলুষমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত করতে জোরালো ভূমিকা পালন করি। আমরা দুর্নীতি বলতে সাধারণত আর্থিক দুর্নীতিকে বুঝে থাকি। কিন্তু দুর্নীতির আরেকটি রূপ আছে, সেটি হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি (ইন্টেলেকচুয়াল করাপশন)। আমরা এই দুর্নীতির কথা কেউ বলি না।’
অনুষ্ঠানে নবনিযুক্ত বিচারপতি বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে বার এবং বেঞ্চ একে অপরের পরিপূরক। নানা আলোচনা সমালোচনার পরেও নিপিড়ীত মানুষের একমাত্র ভরসাস্থল এই (আদালত) অঙ্গন। আজকের দিনে পরম করুনাময়ের কাছে প্রার্থনা এই যে, তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শক্তি। তোমার সেবার মহান দুঃখ সহিবারে দাও ভক্তি।’
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নবনিযুক্ত বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী এই অঙ্গণ থেকে দুর্নীতি দূর করার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, নিশ্চয়ই আমরা তার সাথী হব। আর ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় অবশ্যই সচেষ্ট থাকব।’
অনুষ্ঠানে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন আপিল বিভাগের নবনিযুক্ত তিনজন বিচারপতির কর্মময় জীবন ও তাদের পারিবারিক পরিচিত তুলে ধরে তদের আগামী দিনের সাফল্য কামনা করেন।
এদিকে বিচারক নিয়োগে জ্যেষ্ঠতার প্রসঙ্গ তুলে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত বিভিন্ন সময়ের নেতৃবৃন্দের মত এবং চিন্তার পার্থক্য থাকলেও সকলেই সবসময় এ মর্মে একমত থেকেছেন যে, বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে যেন সর্বাবস্থায় জ্যেষ্ঠতা বজায় থাকে। আমাদের বিচার প্রশাসনে শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে এটি অত্যন্ত জরুরি। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, জ্যেষ্ঠতা বিষয়ে সুদীর্ঘকাল ধরে আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দের ‘কনসিস্টেন্ট ভিউ’ যেন যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়।’
আপিল বিভাগের নবনিযুক্ত তিনজন বিচারপতিকে দেয়া সংবর্ধনায় প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, আপিল বিভাগের বিচারপতি মো: নুরুজ্জামান, বিচারপতি ওবায়দুল হাসান সহ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে রোববার আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সচিব (দায়িত্বপ্রাপ্ত) মাে: গোলাম সারওয়ার স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে আপিল বিভাগের চার জন বিচারপতির নিয়োগের বিষয় জানানো হয়। ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘সংবিধানের ৯৫ (১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে কর্মরত বিচারপতি বোরহান উদ্দিন, বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান, বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারক নিয়ােগ করিয়াছেন। এই নিয়ােগ শপথ গ্রহণের তারিখ থেকে কার্যকর হইবে।’
এরপর প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে আপিল বিভাগে নিয়োগ পাওয়া বিচারপতি বোরহান উদ্দিন, বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথকে শপথ বাক্য পাঠ করান। এসময় সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা উপস্থিত ছিলেন। তবে আপিল বিভাগে নিয়োগ পাওয়া বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান করোনায় আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালের চিকিৎসাধীন বলে তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান আজ হয়নি।








