লেখক, গীতিকার, নির্মাতা, সাংবাদিক। এমন বহুগুণে গুণান্বিত ইশতিয়াক আহমেদ। ১১টি বই লিখেছেন। ‘কারণে অকারণে’, ‘কেউ’, ‘তোর কারণে’সহ লিখেছেন বেশকিছু জনপ্রিয় গান। অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৮ তে আসছে তার নতুন বই ‘ল্যান্ডফোন’। চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে লেখালেখি ও অন্যান্য প্রসঙ্গে কথা বলেছেন ইশতিয়াক আহমেদ।
প্রতি মেলায় আপনার একটি করে উপন্যাস বের হয়। এবার মেলায় কী আসছে?
২০০৯ সাল থেকে প্রতি মেলায় একটি করে বই আসে। প্রথম দিকে গল্পের বই বের করতাম। ২০১৩ সাল থেকে উপন্যাস লিখছি। এবারও উপন্যাস আসবে। নাম ‘ল্যান্ডফোন’। দেশ পাবলিকেশন্স থেকে। বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ।
ল্যান্ডফোনের বিষয়বস্তু নিয়ে বলুন।
আমার সব উপন্যাসে কোনো না কোনো ভাবে প্রেম থাকে। এবার পুরোটাই প্রেমের উপন্যাস লিখতে চেয়েছি। প্রেমকে প্রাধান্য দিয়েছি।
ল্যান্ডফোন মূলত দুই জোড়া মানুষের গল্প। দুজনের জীবনে প্রেম আসবে আসবে করেও আসে নাই। অন্য দুজনের প্রেম অল্পতেই হয়ে গেছে। এদের দুজনের জার্নিটাই উপন্যাস। আর প্রধান দুই চরিত্রের পরিচয়ের সূত্রে আছে ল্যান্ডফোন।
আপনার অন্য উপন্যাসগুলো থেকে ল্যান্ডফোন যেই দিক দিয়ে ভিন্ন?
আমি ভিন্ন কিছু লিখিনা। আর দশজন যা লেখে আমিও তার চেয়ে আলাদা নই। বরং তাদের চেয়ে পিছিয়ে। তবে বিষয় বৈচিত্রের দিক থেকে আমার সবগুলো উপন্যাসই একটা থেকে অন্যটায় বিস্তর ফারাক থাকে। এর আগে আমি নানাভাবে অভিযুক্ত হয়েছি। কেউ বলে আপনার উপন্যাস হচ্ছেনা, কেউ বলেন উপন্যাস আর একটু বড় হয়ে থাকে।
আমি প্রত্যেকের মতামতকে গুরুত্ব দেই। পাঠকের মতামত শুনে তাৎক্ষনিক কোনো রিঅ্যাকশন দেখাই না, কিন্তু তাদের মতামত নিয়ে ভাবি। কেননা পাঠক পড়েই তো মত দিয়েছেন। আমি খুব গুরুত্ব দেই সেসব কথার।
আমার লেখা নিয়ে আরেকটা অভিযোগ ছিল, চরিত্র বেশি থাকে। ফলে এবার চরিত্র কম নিয়েছি। কম সংখ্যক চরিত্র নিয়ে তাদের গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। খুব সহজ, সাধারণ একটা গল্প নিয়ে এগিয়েছে ল্যান্ডফোন। তবে চরিত্রগুলোর খেলা আছে অনেক।

প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় লেখক-পাঠক মিথস্ক্রিয়া বৃদ্ধি পেয়েছে। পাঠকদের প্রত্যাশা মেটানোর জন্য কতটা সচেতন থাকেন?
একটি কথা আমি বারবার বলার চেষ্টা করি। আমার আপত্তির জায়গা হলো, আমি আসলে লেখক না। গল্প বলতে চাওয়া একজন। আমি লেখক হলে লেখায় সাহিত্যের প্রচুর প্রয়োগ থাকতো। আমার লেখায় সাহিত্যের প্রচুর প্রয়োগ নাই। ইলিশ মাছের আশের মতো চকচকে প্রেমিকার চোখ, ডাবের ভেতরের নরম অংশের মতো শান্ত তার মুখ- টাইপ উপমা পাওয়া যায় না। আমি যা লিখি বলে যাওয়া গল্প। আপনাকে বা অন্য কাউকে যা বলতে পারি সেটাই লিখি। সেটাই আমার উপন্যাস। এই গল্পটাই আমি জনে জনে বলতে পারি না বলে বইতে লিখি।
সবসময় মনে করি আমার যদি প্রতিভা থাকে এবং লেখায় ভেরিয়েশন থাকে তাহলে পাঠক আপনা আপনি পড়বে। ভেরিয়েশন নিয়েই এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছি। নিজের মধ্যে ভাংচুর চালাচ্ছি। নিজেকে নবায়ন করার জন্য কষ্ট করছি। যে কারণে উপন্যাসের বিষয়গুলোকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গা নিয়ে লিখছি। যেমন আমার প্রথম দিকের চরিত্রে ছিল রাজনীতি, ক্যাডার কেন্দ্রিক। সবাই ভেবেছিল আমি এসব নিয়েই লিখব। এখন সেখান থেকে সরে এসেছি। শুধু বিষয় বস্তু নয়, আমার ভাষার জায়গাও পরিবর্তন করেছি।
ল্যান্ডফোন অনেক বেশি ঘরোয়া গল্প। আমি সময় নিয়ে লিখেছি। সময় নেওয়ার কারণ হলো, ঐ জায়গাগুলো আমি দেখতে চেয়েছি। সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয়গুলোও খেয়াল করেছি। আমার দৈনন্দিন দেখার যে চোখ সেই দেখার সমন্বয় করেছি ল্যান্ডফোনে।
শিশুদের জন্য বই লিখেছেন একসময়। এখন লিখছেন না?
শিশুদের জন্য এখনো লিখি। যেহেতু নানা কারণে আমার জায়গা কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে, গানের সাথে সম্পৃক্ততা বেড়েছে। অফিস করতে হয়, নির্মাণে সময় দিচ্ছি। এতদিকে সময় দিতে গিয়ে আমার লেখার জায়গাটা সীমিত হয়ে গেছে। মেলার জন্য বই ছাড়া আর কিছু লেখা হয় না।
আপনার সমসাময়িক অনেক লেখক একাধিক বই করছেন। আপনি প্রতি মেলায় একটা করে বই লিখছেন?
হ্যাঁ। একাধিক বই নিয়ে আসতে পারি। বছরে চার পাঁচজন প্রকাশককে বিনীতভাবে না করতে হয়। আমি একটা প্রকাশনী থেকে বই করি, একটা বইতেই থাকতে চাই আরও কয়েকবছর। আমি এই ক্ষেত্রে বহুগামী না। একটা প্রকাশনী থেকে টানা পাঁচ বছর বই করেছি। ফয়সাল আরেফিন দীপন ভাই থাকলে হয়তো অনেকদিন জাগৃতি থেকেই বই করতাম। এখন দেশের সাথে কাজ করছি। অনেক প্রকাশক যোগাযোগ করেন, পাণ্ডুলিপি চান।
আমি আসলে নিজেকে দেখার চেষ্টা করি সবসময়। আমার দৌড় আমি জানি। একাধিক বই বের হয়েছে এমন পরিচয়ে আমি গৌরববোধ করি না।
এছাড়া দুইটা বই লিখতে গেলে দুইটার মান সমান কখনোই হবে না। একটা না একটা অপেক্ষাকৃত খারাপ হবেই। দেখা গেল মার্কেটিংয়ের কারণে আমার খারাপ বইটার প্রচার বেশি হলো। বেশিরভাগ পাঠক খারাপ বইটা নিলো। আলটিমেটলি আমার প্রতি পাঠকের আস্থার জায়গাটা কমে যাবে। সেই রিস্কটা আমি নিতে চাই না। আমার অত সময়ও নেই।
আপনি নিজেকে লেখক পরিচয় দিতে নারাজ। কবে নাগাদ নিজেকে লেখক হিসেবে পরিচয় দেবেন?
না। আমি কখনো লেখক হিসেবে পরিচয় দিতে চাইনা। কারণ, আপনি জোর করে লেখক হতে পারবেন না। পাঠক আপনাকে বলবে। আসলে জীবনে এত বেশি লেখক দেখেছি যাদের লেখক মনে হয়নি। তারা লেখক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে এবং মানুষ পরিচয়টা গ্রহণও করছে। এই কারণে লেখক পরিচয় দিতে খুব বেশি আগ্রহ বোধ করি না। আমি সন্মাণিতবোধ করি গল্প বলতে চাওয়া একজন মানুষ হিসেবে।

চলচ্চিত্র নির্মাণভাবনা আছে, এমনটা বলছিলেন। কবে আপনাকে চলচ্চিত্র নির্মাণে দেখা যাবে?
সেটা হয়তো কোনও একদিনের গল্প। যেদিন খুব দুরে। এমনিতে ডকুমেন্টারি, মিউজিক ভিডিও, শর্টফিল্ম বানিয়েছি কিছু। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ডকুমেন্টারি বানাচ্ছি কারণ এতে বড় একটা ফিনান্সিয়াল সাপোর্ট পাওয়া যায়। এছাড়া মিউজিক ভিডিও এবং শর্টফিল্ম বানানোর কারণ হলো, আমার নির্মাণের একটা টার্গেট তৈরি হয়েছে। কখনও সিনেমা বানাতে চাই সেই লক্ষ্যে।
আমি কারও অ্যাসিস্ট করি নাই, আমার কোনো শিক্ষক নাই। তাই শিক্ষক হিসেবে ধরে নিয়েছি আমার ভুলগুলোকে। একটা কাজ করি, সেই কাজের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেই। পরের কাজে ভুল থেকে বের হয়ে আসতে চেষ্টা করি। এ ক্ষেত্রে ভুলই আমার বড় শিক্ষক। শিখতে শিখতে যখন মনে হবে সেই জায়গাটায় এসেছি তখনেই চলচ্চিত্রে হাত দেব।
এছাড়া এখন আমাদের ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা স্থির না। দিনদিন স্থির হচ্ছে। চার পাঁচ বছর পর হয়তো হাত দিব।
আপনার সাম্প্রতিক ব্যস্ততা কী নিয়ে?
সাংবাদিকতা করছি দৈনিক আমাদের সময়ে।গান লিখছি। নির্মাণের সাথে আছি। মেলায় বছরে একটা করে বই লিখছি।
এবছর আপনার একটা গান খুব শ্রোতাপ্রিয়তা পেয়েছে। কারণে অকারণে। লেখক হতে চাননি বলছিলেন, তবে কি গীতিকার হতে চেয়েছিলেন?
আমি গীতিকারও হতে চাইনি। কিন্তু খুব করে চাইতাম আমার একটা গান সঞ্জীব চৌধুরী গাইবে। যেহেতু সঞ্জীব চৌধুরীর কাছে যেতে হলে আগে গীতিকার হতে হবে। সেই টার্গেট থেকে একটা গান লিখেছিলাম। এসআই টুটুল ভাইয়ের সুরে সেটা আঁখি আলমগীর গাইলেন। সেই গান রিলিজের বছরই আমার দূভার্গ্য সঞ্জীব দা মারা যান। ফলে আমার লক্ষ্যের মৃত্যু ঘটে। এর মধ্যে লুৎফর হাসানের জন্য কিছু গান লিখি। অন্যান্য জায়গায়ও এরপর লিখি। লিখতে লিখতে এটা একটা নিয়মিত জায়গায় চলে যায়। তবে প্রশংসিত হলেও বড় আকারে জনপ্রিয় হয়নি কোনও গান। এ বছরের শুরুতে এসে সেটা ঘুচিয়ে দেয় মিনার রহমানের গাওয়া, কারণে অকারণে। এবছর আরেকটা বড় কাজ হয়েছে। সেটা হলো, আমার লেখা গান গেয়েছে বলিউডের আরমান মালিক। আর নতুন বছরে বেলাল খানের সুরে আসছে মিনার রহমানের আরেকটি গান ঢাকামুখী ট্রেন । এসব করতে করতে গান আমার সঙ্গে চলছে বা আমি গানের সঙ্গে। গীতিকার হওয়ার জায়গা থেকে না, সময় এবং মনের চাহিদা থেকেই গান চলছে।
আপনি না হতে চেয়েও অনেক কিছু হয়ে গেছেন। কেমন লাগে?
ভয় করে। না হতে গিয়ে যেহেতু এগুলো হয়ে গেছি, আবার মনে হয় যা হতে চাইছি তাই হতে পারবো না। দেখা গেল, সিনেমা বানানোর চাওয়াটাই হয়তো পুরণ হবে না।
সিনেমা একটা, না অনেক বানাবেন?
প্রথমে একটা বানাবো। একটা বানানোর পর যদি মনে হয় আমাকে দিয়ে হবে তাহলে থাকবো। দর্শক আমাকে প্রত্যাখ্যান করলে সরে যাবো। আমি কখনো কিছু নিয়ে মাটি কামড়ে বাঁচতে চাইনি।
আপনার লেখায় নগর জীবন যত বেশি পাওয়া যায়, গ্রামীণ জীবন সেভাবে পাওয়া যায় না। কারণ কী?
আমার যখন দেখার চোখ তৈরি হয়েছে তখন থেকেই আমি শহরে। বেড়ে ওঠাটা যদিও গ্রামে। কিন্তু তখন দেখার চোখ তৈরি হয়নি। মানুষ দেখার, গল্পের প্লট নিয়ে যখন ভাবতে শিখেছি ততদিনে শহর আমাকে আকড়ে ধরে ফেলেছে। নাগরিকতা আমাকে বন্দি করে ফেলেছে তার জালে।
আর আমার একটা আপত্তিও আছে, গল্প লিখতে গেলে, উপন্যাস লিখতে গেলই কেন প্রত্যন্ত গ্রামের কথা লিখতে হবে, শুধু অভাবী মানুষের কথা লিখতে হবে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা লিখতে হবে? আমার শহরেই তো অনেক গল্প আছে। আমি আমাদের সময়ের গল্প বলতে চাই। জোর করে গ্রাম, জোর করে আবেগ, জোর করে কাঁদানোর চেষ্টা আমার গল্পে নেই। লেখায় আরোপিত দারিদ্র ও আবেগ তৈরি করতে চাই না। এগুলো সচেতনভাবে এড়িয়ে চলি।

তাই বলে আমি গ্রামের গল্প যে লিখি না তা না। শিল্পী স্টুডিওতে আলোর নিচে না আসা এক পেশার মানুষের গল্প আছে। তারা হলো ডুবুরি। এরা এমন অদ্ভুত সম্প্রদায় যারা দুর্ঘটনার জন্য অপেক্ষা কর। দুর্ঘটনা না হলে এদের অন্নের সংস্থান না। আমার মনে হয়েছে এই গল্পটা মানুষকে জানানো দরকার। কিন্তু যাদের নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে তাদের নিয়ে লিখতে আগ্রহ বোধ করি না। সেই লেখার মধ্যে থাকতে চাই না।
ফরাসি কবি আন্দ্রে জিদের একটা কথা আছে, ‘পৃথিবীর সব গল্প বলা হয়ে গেছে।’
তাই এখন যা চলছে তা মূলত উপস্থাপনার বৈচিত্র। আমি আমার মতো করে গল্পটা উপস্থাপন করার চেষ্টা করি। সেটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শহুরে হয়ে যায়। বিস্তৃতভাবে কখনো শহর, কখনো শহরের ভেতরের মানুষদের গল্প উঠে আসে। আমি নগর থেকে বের হতে পারি না। বর্ণনার ক্ষেত্রে কাশফুলের চেয়ে বিলবোর্ডে কাশফুলের ছবি আমাকে বেশি টানে। মিথ্যা কল্পনা দিয়ে আমার বই সাজাতে চাই না।







