লন্ডনের গ্রেনফেল টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের আবাসন নিয়ে আপত্তি তুলেছে অভিজাত ‘স্বার্থপররা’। লন্ডনের অন্যতম আরাধ্য বিলাসবহুল এলাকায় ক্ষতিগ্রস্তদের ফ্ল্যাট দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার ১ সপ্তাহ পার হলেও আক্রান্ত অনেককেই নিজ গাড়িতে বা পার্কে ঘুমাতে হচ্ছে। (সূত্র: ডেইলি মেইল অনলাইন)
লন্ডনের নর্থ কেনসিংটনের গ্রেনফল টাওয়ার থেকে দেড় মাইল দূরের নতুন এই ফ্ল্যাটগুলোতে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রায় অর্ধেক মানুষ, ২৫০ জন আবাসনের সুবিধা পাচ্ছে। পশ্চিম লন্ডনের নটিংহিলের কাছে লাটিমার রোডে ২৪তলা গ্রেনফেল টাওয়ারে গত ১৪ জুন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৭৯ জন মারা যায়।
অভিজাত কেনসিংটন রো ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির কাছ থেকে কর্পোরেশন অব লন্ডন এই ফ্ল্যাটগুলো কিনেছে।
ডেভেলপার এসটি এডওয়ার্ড জানায়, এই ৬৮টি ফ্ল্যাট ‘কেনা দামেই’ বিক্রি করেছেন তারা, যার বাজারমূল্য ১৬০ মিলিয়ন পাউন্ড। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তুমুল সমালোচিত কর্পোরেশন অব লন্ডন সামাজিক আবাসন হিসেবেই তা পরিচালনা করবে বলে জানিয়েছে।

কেনসিংটন ডেভেলপমেন্টের অ্যাপার্টমেন্টগুলোর বাজারমূল্য বর্তমানে ১.৫ মিলিয়ন পাউন্ড থেকে ৮.৫ মিলিয়ন পাউন্ড। বহুল কাঙিক্ষত বিলাসবহুল কমপ্লেক্সটি লাখপতিদের আবাসস্থল। এখানে সিনেমা হল, সুইমিং পুল, জিম, স্পা’র সুব্যবস্থা আছে।

আগামী মাসের জুলাইয়ের শেষ নাগাদ ক্ষতিগ্রস্তরা ডেভেলপমেন্ট অন কেসিংটন হাই স্ট্রিটে থাকতে পারবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফ্ল্যাটের কাজ সম্পন্ন হবে বলেও জানানো হয়েছে। সময়মতো কাজ শেষ করার নিশ্চয়তার জন্য সরকার অতিরিক্ত অর্থও খরচ করছে।
তবে কেনসিংটনের বর্তমান বাসিন্দাদের অনেকেই দুর্গতদের আবাসনের ক্ষেত্রে বিরক্ত, কারণ তারা ‘এর জন্য কঠোর পরিশ্রম করেনি’। বাসিন্দাদের একজন মারিয়া, যিনি ২ বছর আগে এখানে ফ্ল্যাট কিনেছেন, গার্ডিয়ানকে বলেন, এটা খুবই অন্যায়। এখানে বাস করার জন্য আমাদের অনেক অর্থ খরচ করতে হয় এবং আমরা এর জন্য কঠোর পরিশ্রম করি। এখন এই লোকগুলো এখানে আসছে যারা এমনকি সার্ভিস চার্জও দেবে না।

অপর একজন ‘নির্মম’ বাসিন্দা বলেন, অগ্নিকাণ্ডে সব হারানো অনেক পরিবার একে টাকা কামানোর পন্থা হিসেবে ব্যবহার করবে এবং তা প্রাইভেট মার্কেটে ভাড়া দেবে।
এই কমপ্লেক্সের ১ ব্যাডরুমের ফ্ল্যাটে থাকা নিক বলেন, গ্রেনফল টাওয়ারের আসল ভাড়াটেরা কারা? এটা ধারণা করা যায় ওই ফ্ল্যাটগুলোর অধিকাংশেরই সাবলেট ছিলো। সেখানে ভাড়াটে হিসেবে যাদের নাম ছিলো তারা নতুন আবাসস্থল পাবে। তারা এগুলো তা প্রাইভেট মার্কেটে ভাড়া দেবে।

তবে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি অনুভূতিপ্রবণ অনেকেই এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। দুই মাস আগে এখানে আসা এজে বলেন, অগ্নিকাণ্ডটি ভয়াবহ ছিলো, সেখানে আমার বন্ধুবান্ধবও ছিলো। সবাইকে সমান ভাবে দেখা উচিত বলে অভিমত তার। জেমি পলও জানান, এখানে অনেক খালি ফ্ল্যাট রয়েছে। যারা বাড়ির মূল্য নিয়ে উদ্বিগ্ন তারা স্বার্থপর ছাড়া আর কিছু নয়।
অগ্নিকাণ্ডের পর যথাযথ ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় ও জাতীয় সরকারের ব্যর্থতার জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে ক্ষমা চাওয়ার কিছুক্ষণ আগেই গ্রেনফল টাওয়ারের বেঁচে যাওয়াদের জন্য এই ৬৮টি ফ্ল্যাট দেওয়ার ঘোষণা আসে। ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যার্থে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের আহ্বানের পর এই উদ্যোগ। তবে নিকটজনদের হারানো অনেকের কাছে এই খবর আর কতটা সুখকর?

গতবছরেই পুনসংস্কার করা ১৯৭৪ সালের গ্রেনফল টাওয়ারের চতুর্থ তলায় একটি ফ্রিজ বিস্ফোরিত হলে অগ্নিকান্ডটি ঘটে। আগুনে পুড়ে অনেকের শোচনীয় মৃত্যু হয়। অনেকেই পালাতে চেয়ে বা জানালা দিয়ে নিজে বা সন্তানদের ছুঁড়ে ফেলেও বাঁচাতে পারেনি। প্রচন্ড উত্তাপ ও ধোয়ায় মারা যান তারা।
দুর্গতদের সাহায্য করতে বিশৃঙ্খলার জন্য কেনসিংটন কাউন্সিল সমালোচিত হয়। ৫০ লাখ ইমার্জেন্সি ফান্ডের ৩লাখ পাউন্ডেরও বেশি আক্রান্ত পরিবারকে দেয়া হয়েছে। ১০০ জনের অধিকজনকে হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে অর্থসাহায্য পেতেও ঝামেলা পোহানো এবং খুবই সামান্য কিছু পাওয়ার অভিযোগ অনেকের।

কেনসিংটনের নতুন লেবার পার্টির এমপি এমা ডেন্ট কোয়াড ক্ষতিগ্রস্তদের চরম দুরাবস্থার কথা উল্লেখ করে তাদের দেখভালের, আবাসনের ব্যবস্থা করা উচিত বলেন। গাড়ি বা পার্কে ঘুমানোর মতো ঘটনাকে ভয়াবহ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গ্রেনফল ফায়ার রেসপন্স টিম জানায়, এখন পর্যন্ত ৬ লাখ ৭৫ হাজার ২০০ পাউন্ড অর্থ ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। প্রত্যেককে ৫০০ পাউন্ড করে নগদ এবং ৫ হাজার পাউন্ড ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেয়া হয়েছে। এর বাইরেও প্রয়োজনে অর্থ দিচ্ছে কেনসিংটন এবং চেলসি কাউন্সিল।







