সমুদ্রতীরের গল স্টেডিয়ামে শনিবার প্রভাতের সূর্য কি আভাস নিয়ে ঠিকরে পড়েছিল? সাকিব-মুশফিকদের সেটি জানার কথা নয়। বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররা তখন হয়তো মস্তিষ্কজুড়ে গিজগিজ করতে থাকা পঞ্চমদিনের ‘কী হবে’ ‘কী করা সম্ভব‘ ভাবনা সরিয়ে, একটা লম্বা দিনের রসদ নিতে পর্যাপ্ত বিশ্রামের শেষটুকু সেরে নিচ্ছেন। ঘুমটা তাদের হয়তো ভালোই হয়েছে! পরে তারা যখন গলের সবুজ গালিচায় ফিরলেন, ততক্ষণে সূর্যের তেজ বেড়ে গেছে। সম্ভাবনা নেই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সৃষ্ট কোন ঝড়েরও। শেষ অবধি আবহাওয়ার পূর্বাভাস ঠিকই থাকল, শুধু হেরাথ ঝড়ে হঠাৎ ‘লঙ্কা-ভণ্ড’ হয়ে ধ্বংসস্তূপে টাইগারদের ব্যাটিং। এরপরেই পুরনো প্রশ্নটা নতুন করে ফিরে আসছে, আর কতবার?
সম্ভাবনার পশ্চাতে হাঁটার শুরুটা হয়েছে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ যখন ৩১২ রানে গুটিয়ে গেল। লঙ্কানরা প্রথম ইনিংসে ৪৯৪ রান তুলে ১৮২ রানে এগিয়ে থাকল তখনই। পরে ২৭৪ করে দ্বিতীয় ইনিংস ছেড়ে দিলো। জিততে অসম্ভব এক লক্ষ্য টাইগারদের, ৪৫৭! হাতে চার সেশন। জয় সুদূরকল্পনা হোক, ম্যাচ বাঁচিয়ে আসাটাও চ্যালেঞ্জের। শুক্রবার তামিম-সৌম্য পুরোটা বিকেল কাটিয়ে আসার পর তখন অনেক সম্ভাবনার উঁকি-ঝুঁকি। আবার শঙ্কার ঘনঘটাও কম নয়, এমন অবস্থায় থেকে স্বপ্নের জাল বুনে পরের দিন হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ার ইতিহাসও তো আর কম নয়।
গলেতে সেটাই ঘটল আরেকবার। প্রথমে ৪৫ মিনিটের মাঝে টপঅর্ডারের পাঁচজন নেই, সেখান থেকে মুশফিক-লিটনের ৫৪ রানের প্রতিরোধ। পরে ৭৮ বলের ব্যবধানে বাকি পাঁচের ফেরা। শেষ পর্যন্ত ২৫৯ রানের বড় হারই সঙ্গী।
হেরাথের হাত থেকে কি এমন গোলা ছুটে আসছিল ব্যাটসম্যানদের দিকে? আউটগুলোর দিকে তাকালে লঙ্কান বোলারদের কৃতিত্বটা দিতেই হয়। তাতে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতা কি আড়াল হয়? চোয়ালবদ্ধ লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি হতে পেরেছেন কেউ? শ্রীলঙ্কা যেখানে ম্যাচে ১৯৮.১ ওভার ব্যাটিং করেছে ১৬ উইকেট খরচ করে, বাংলাদেশ সেখানে ১৫৭.৪ ওভারে ২০ উইকেট হারিয়েছে। সেটা হতেই পারে। ম্যাচে উইকেট হারানো ক্রিকেটেরই অংশ। কিন্তু এই হারানোর সঙ্গে যখন জুড়ে যাচ্ছে গত কিছুদিনের সম্ভাবনা আর অপমৃত্যুর দৃশ্যগুলোর পুর্নমঞ্চায়ন, তখন প্রশ্ন উঠবেই।
বাংলাদেশের খেলা শেষ পাঁচটি টেস্ট ম্যাচের দিকে তাকানো যাক। ভারতে হায়দ্রাবাদ টেস্টে হাতে ৭ উইকেট নিয়ে পঞ্চম দিনের ব্যাটিংয়ে এসেছিল বাংলাদেশ। দিনের শুরুতেই উইকেট হারানোর মধ্য দিয়ে এগোতে এগোতে আর মাত্র দেড়শর কাছাকাছি রান যোগ করতে পারে। ম্যাচ জুড়ে ছিল উইকেট ছুঁড়ে আসার মিছিল।
তার আগে ক্রাইস্টচার্চ টেস্টেও উইকেট ছুঁড়ে আসার মিছিলে দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ১৭৩ রানে গুটিয়ে যেয়ে চার দিনেই হার। দৃষ্টিকটু শটের পসরা ছিল সিরিজের প্রথম ম্যাচ ওয়েলিংটন টেস্টেও। প্রথম ইনিংসে ৫৯৫ রানের সংগ্রহ গড়ে পরের ইনিংসে ছুঁড়ে আসার মিছিল। অলআউট ১৬০ রানে। অথচ ওই ম্যাচে আরেকটু ধৈর্য ধরতে পারলে নিউজিল্যান্ডের সামনে ২১৭ এর জায়গায় আরো বাড়তি কিছু লক্ষ্য দেওয়া যেত। ম্যাচটা নিজেদের দিকে টেনে আনা যেত হয়তো।
তার আগে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঢাকা টেস্টে ঐতিহাসিক জয়ের আড়ালে পড়ে যাচ্ছে ব্যাটিং ব্যর্থতার মিছিল। প্রথম ইনিংসে মাত্র ২২০, পরের ইনিংসে ২৯৬! মিরাজের বোলিং তাণ্ডবে ম্যাচটা ১০৮ রানে জেতা গেছে, কিন্তু উইকেট বিলিয়ে আসার বিলাসিতায় লাগাম দেওয়া যায়নি। এই বিলাসিতার দুঃখ বাড়বে ইংলিশদের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টের দিকে তাকালেও। সাতসকালে সাকিবের সেই পাগল পারা শট, বাংলাদেশ ম্যাচটা হেরে যায় মাত্র ২২ রানে।
দিন শেষে তাই কেবল প্রতিপক্ষের কৃতিত্বই নয়, বাংলাদেশের টেস্ট খেলার ধরনও নিজেদের হারের তালিকা বাড়াতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে। কিন্তু দিনের পর দিন ব্যাটসম্যানরা উইকেট ছুঁড়ে আসার বিলাসিতা থেকে সরে আসতে পারছেন না। একই জিনিস বারবার ঘটছে। কখনো লম্বা বিরতি দিয়ে টেস্ট খেলার অজুহাত, কখনো আমি তো এভাবেই ব্যাটিং করে আজকের আমি, কখনো ম্যাচে এসব হয়ই; এভাবেই আড়াল করা হচ্ছে নিজেদের ভুলগুলোকে। সাদা পোশাকে ভালো করতে হলে সবার আগে এই পুনরাবৃত্তিতে লাগাম পড়াতে হবে।
সিরিজের আগে থেকে বলা হচ্ছিল এবারই সেরা সুযোগ। দেশ ছাড়ার আগে অধিনায়ক মুশফিকের বলা কথাটা পরে দলীয় কোরাসই হয়ে যায়। সবাই বিশ্বাস করতে থাকে এবার বড় সুযোগই। সাঙ্গাকারা-জয়াবর্ধনে, ভাস-মুরালিধরনরা নেই; পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাওয়া তরুণ শ্রীলঙ্কা, এবার সেরা সুযোগ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। সেটা যথেষ্ট না হলেও অন্তত নিয়ামক হতে পারতো। সেজন্য প্রতিপক্ষের দুর্বলতার চেয়ে বড় নিয়ামক হওয়ার কথা ছিল নিজেদের শক্তিগুলো। সেটা হলো কই! নিজেদের শক্তি সম্পর্কে কি জানে বাংলাদেশ? টেস্টে ব্যাটিংটা কিভাবে করতে হয়? আগে জানতে হবে, পরে মাঠে টেনে আনতে হবে। পুরনো বাংলাদেশকে আগে নতুন চেহারায় ফেরানো জরুরী। নয়তো আরও একটি হতাশার টেস্টেই হয়তো অপেক্ষা করছে মাইলফলকের শততম টেস্টের লড়াইয়ে। উপলক্ষটা উদযাপনের চেয়ে এখন তাই দুর্ভাবনাই অনেক বেশি!








