বিএনপি আয়োজিত ‘মিয়ানমারের গণহত্যা ও বাংলাদেশের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় আলোচকরা বলেন, চলমান রোহিঙ্গা সংকট সমাধান করতে হলে বাংলাদেশকে প্রয়োজনে শক্তি প্রদর্শন করতে হবে। তারা বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতি এমন এক অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে, শত কান্নাকাটি করেও কিছু হবে না, তাই এখানে প্রয়োজনে নিজস্ব সামরিক শক্তি দেখাতে হবে। তবে এর অর্থ মিয়ানমারের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া নয়।
রোববার বিকেলে রাজধানীর ‘হোলে লেকশো’তে ‘মিয়ানমারের গণহত্যা ও বাংলাদেশের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম. সেরাজুল ইসলাম। বক্তব্য রাখেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বাক মাহমুদুর রহমান মান্না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দিলারা জামান, অর্থনীতিবিদ মাহমুদ উল্লাহ, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ, কবি আব্দুল হাই শিকদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আকতার হোসেন, অধ্যাপক সদরুল আমিন প্রমুখ।
আলোচনায় অধ্যাপক আসিফ নজরুল বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে চোখ রেখে নিজস্ব শক্তি প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকারকে বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অনুধাবন করে রাষ্ট্রের নিজস্ব শক্তি প্রদর্শন করতে হবে। এর মানে যুদ্ধ করা নয়। কিন্তু মিয়ানমারের হেলিকপ্টার বারবার আমার দেশের সীমারেখায় ঢুকে পড়বে আর কিছু বলবো না, এটি হতে পারে না। হেলিকপ্টার ভূপাতিত না করলেও গুলি ছুড়তে হবে। বোঝাতে হবে আমাদেরও ক্ষমতা আছে।
আসিফ নজরুল বলেন, সবকিছুতেই ভীত হয়ে নরম হলে সবাই পেয়ে বসবে। এখন রোহিঙ্গাদের পাঠানো হচ্ছে, পরবর্তীতে অবৈধ বাংলাদেশি অজুহাতে অন্য প্রতিবেশিরাও অনুপ্রবেশ ঘটাবে।
রোহিঙ্গা সংটকে বাংলাদেশের জন্য গভীরতম সংকট অভিহিত করে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘অল্প বা মোটামুটি দীর্ঘ সময়ে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো যাবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে। সরকার বলতে পারছে না ঠিক কতদিনের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো যাবে। এর মধ্যে নির্বাচন চলে এলে অনেক রকম খেলা শুরু হবে। এর আগেই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করতে হবে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে শক্ত অবস্থান দেখাতে হবে বাংলাদেশকে।’
এসময় তিনি টেকনাফের স্থানীয় এমপি আব্দুর রহমান বদির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘ওইখানে একটা নেতা আছে, যিনি বিভিন্ন চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। এরই মধ্যে খবর এসেছে তিনি অনেক রোহিঙ্গাকে জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়েছেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে অন্তত ৪ লক্ষ রোহিঙ্গাকে যদি জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া হয়। ভোটে সেটি অনেক প্রভাব ফেলবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ভারত ও চীনের অবস্থান বিষয়টিকে জটিল করে তুলছে। মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপের বিকল্প নেই। ভারত ও চীনকে অবশ্যই তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে। জাতিসংঘের সিকিউরিটি কাউন্সিলকে ধন্যবাদ যে তারা এই বিষয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছে।’
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহমুদ হাসান বলেন, সংকট সমাধানে কফি আনানের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। রোহিঙ্গাদের ফেরত নিয়ে অবশ্যই মিয়ানমার সরকারকে তাদের নাগরিকত্ব দিতে হবে।
রোহিঙ্গারা এদেশে দীর্ঘদিন অবস্থান করলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে মন্তব্য করে মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ৫ থেকে ১০ বছরের যে রোহিঙ্গা শিশু রয়েছে তাদের পুনর্বাসন করতে না পারলে তারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। যেহেতু তারা লেখাপড়ার সুযোগ পাবে না তারা যেকোন ক্রাইমে জড়িয়ে পড়বে। কারণ তাদের বাবা-মাকে মেরে ফেলা হয়েছে। তাদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিশোধ স্পৃহা রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করতে বিএনপির মধ্যে একটি দল গঠন করে বিভিন্ন দেশে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানোর পরামর্শ দেন তিনি।
‘বিএনপিকে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি করে চীন, ভারত, রাশিয়াসহ বহির্বিশ্বে মিশনে নামতে হবে। সরকার বিএনপির সঙ্গে না এলেও পৃথকভাবে বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে হবে।’
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্পেন, ফ্রান্স, ইরান, সৌদি আরব, ডেনমার্ক, সুইডেন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রিটেন, মালদ্বীপ, জাপান ও কুয়েতের কূটনীতিক এবং জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা। তবে চীন, ভারত এবং রাশিয়ার কোন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না।
সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর সঞ্চালনায় গোলটেবিল আলোচনায় বিএনপি নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, রিয়াজ রহমান, সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, আবদুস সালাম, এম মোরশেদ খান, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন, নিতাই রায় চৌধুরী, সুকোমল বড়ুয়া, মুজিবুর রহমান সরোয়ার, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল প্রমুখ।







