মিয়ানমার সফররত পোপ ফ্রান্সিস এখনও পর্যন্ত ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ করেননি। তবে দেশটির জনগণকে প্রতিশোধপরায়ন না হওয়া এবং জাতিগত নিধন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীকে সমূলে বিনাশে মেতে ওঠা মিয়ানমারে প্রায় দেড় লাখ ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের এক সমাবেশে এই আহ্বান জানান পোপ।
বুধবার ইয়াংগুনে এই বিপুল সংখ্যক ভক্ত-অনুসারির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে পোপ বলেন, ‘আমি জানি মিয়ানমারে অনেকেই সহিংসতার ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। আমরা ভাবি ক্ষোভ এবং প্রতিশোধ এই ক্ষত নিরাময় করে। কিন্তু প্রতিশোধের পথ যিশুর দেখানো পথ নয়।’
বিবিসি’র প্রতিবেদনে জানা যায়, মিয়ানমার সফরে পোপ যেন ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার না করেন সেজন্য তাকে সতর্ক করেছিলো দেশটির ক্যাথলিক নেতারা। কারণ ক্যাথলিক নেতাদের আশঙ্কা ছিলো রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে মানতে নারাজ মিয়ানমার সরকার ও উগ্রপন্থী বৌদ্ধরা এই শব্দে নাখোশ হতে পারে। বৌদ্ধ ধর্মপ্রধান দেশটিতে পোপের মুখে রোহিঙ্গা শব্দ যেন সেখানে বসবাসরত ৬ লাখ ক্যাথলিককে বিপদে না ফেলে সেজন্যই শীর্ষ ধর্মগুরুকে সতর্ক করেছিলো তার বার্মিজ শিষ্যরা।
এই পরিস্থিতিতে পোপের বুধবারের বক্তব্যকে ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর মতে, ক্যাথলিক সমাবেশে সরাসরি রোহিঙ্গা নিধন বন্ধে কোনো বক্তব্য না দিয়ে পোপ এই বক্তব্যের মাধ্যমে আসলে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অধিকার সুরক্ষার দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তবে রোহিঙ্গা নিধন বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সরব প্রতিবাদের এই সময়ে পোপের সরাসরি মন্তব্য না পেয়ে হতাশ মানবাধিকার কর্মীরা।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া শাখার উপ-পরিচালক ফিল রবার্টসন বলেন, ‘পোপ শক্তিশালী অবস্থানে থেকেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি বলার সুযোগ হাতছাড়া করলেন। তার এই নিরবতা কার্যত মিয়ানমার সেনা ও অং সান সু চির রোহিঙ্গা নিধনের অস্বীকারকে প্রশ্রয় দিলো।’
২৭ তারিখ মিয়ানমার সফর শুরু করেন পোপ ফ্রান্সিস। এই প্রথমবারের মতো কোনো পোপ দেশটি সফর করছেন। সোমবার মিয়ানমারে পৌঁছেই সন্ধ্যায় ইয়াংগুনে দেশটির সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে দেখা করেন পোপ ফ্রান্সিস। এই সেনাপ্রধানের অধীনে সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনে ২৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত ৬ লাখ ২০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে।
মিয়ানমার সরকার রাখাইন রাজ্যের অধিবাসী সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীকে কখনোই তাদের নিজস্ব নৃতাত্ত্বিক ‘রোহিঙ্গা’ নামে স্বীকৃতি দেয়নি। এমনকি দেশটির বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর তালিকায়ও নেই রোহিঙ্গারা। বরাবরই তাদেরকে ‘মিয়ানমারের মুসলিম অধিবাসী’, ‘অবৈধ জনগোষ্ঠী’ এবং অনেক সময় ‘বাঙালি’ বলেও পরিচয় দেয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্বও নেই।
এমন পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে সফরে এসে মিয়ানমার সফরকালে দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের কথা বলতে গিয়ে পোপ ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করেন কি না, সবার দৃষ্টি রয়েছে সেদিকেই। যদিও পোপ রোহিঙ্গাদের রোহিঙ্গা নামে সম্বোধন করবেন– এমন সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তাদের মতে, তিনি ‘রোহিঙ্গা’ নামটি ব্যবহার করলে কিছু ক্ষেত্রে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।







