মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতন অস্বীকার এবং রাখাইনে সেনা অভিযান বৈধ ঘোষণার প্রতিবাদে ‘ফ্রিডম অব ডাবলিন সিটি’ খেতাবের তালিকা থেকে ভোটের মাধ্যমে মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চি’র নাম সরিয়ে দিয়েছেন আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন শহরের কাউন্সিলররা।
সু চি’কে এই খেতাব দেয়ার প্রতিবাদে গত নভেম্বরে পপ তারকা বব গেল্ডফ তার ‘ফ্রিডম অব ডাবলিন’ পুরস্কার ফিরিয়ে দেন।
আয়ারল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার তথ্য অনুসারে বিবিসি জানায়, ৬২ জন কাউন্সিলরের মধ্যে সু চি’কে ‘ফ্রিডম অব ডাবলিন’-এর তালিকা থেকে অপসারণের পক্ষে ভোট দেন ৫৯ জন।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো হত্যাযজ্ঞের মুখেও নীরব থাকার অভিযোগ রয়েছে শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সু চি’র বিরুদ্ধে। এ অভিযোগে এর আগে নভেম্বরে তার ‘ফ্রিডম অব দ্য সিটি’ খেতাবও প্রত্যাহার করে নেয় ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড সিটি কাউন্সিল। সু চি’র শিক্ষাকেন্দ্র অক্সফোর্ডের সেইন্ট হিউ’স কলেজ থেকে তার ছবিও সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর বহুদিন ধরে চলমান সংঘর্ষ-সহিংসতা সঙ্কট সমাধানে ২০১৬ সালের আগস্টে গঠিত হয় অ্যাডভাইজরি কমিশন অন রাখাইন স্টেট। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে ওই কমিশন এক বছরের তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের প্রধান অং সান সু চির কাছে জমা দেয় চলতি বছরের ২৪ আগস্ট।
৬৩ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদন জমা দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই ২৪ আগস্ট দিবাগত রাতে ত্রিশটি পুলিশ ও সেনাচৌকিতে রহস্যজনক হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় নিহত হয় নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্য। তারপরই হামলার জন্য রোহিঙ্গা ‘জঙ্গি’দের দায়ী করে জবাব হিসেবে সেনাবাহিনী পুরো অঞ্চলে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে।
সেনাবাহিনীর ওই হামলায় এখনও পর্যন্ত প্রায় হাজারখানেক মানুষ মারা গেছে, আর প্রাণভয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে পাড়ি জমাচ্ছে বাংলাদেশে। নৌপথে পালিয়ে আসার পথে নৌকাডুবিতেও বাড়ছে মৃতের সংখ্যা।
সেনাবাহিনীর হামলা ও সহিংসতার মাত্রার ভয়াবহতার কারণে জাতিসংঘ একে ‘পাঠ্যবইয়ে যোগ করার মতো জাতিগত নিধনের উদাহরণ’ বলে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে একে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ‘জাতিগত নিধন কর্মসূচি’ বলে বর্ণনা করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন না করার উদ্দেশ্যেই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এই হত্যাকাণ্ড শুরু করে।
জাতিসংঘের হিসেব মতে, রাখাইনের বিভিন্ন গ্রামে সেনাবাহিনী ও সরকার সমর্থিত বাহিনীর হামলা থেকে বাঁচতে আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৬ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স (মেডিসিনস স্যানস ফ্রন্তিয়েরস – এমএসএফ) এক জরিপে জানিয়েছে, গত ২৫ আগস্ট থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর সময়টার মধ্যে অন্তত অন্তত ৯ হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তবে একেবারে কাটছাঁট করা হিসেবেও সংখ্যাটি ৬ হাজার ৭শ’র কম নয়, বরং বেশি। নিহতদের মধ্যে কমপক্ষে ৭৩০ জন পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।







