রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশে থেকে যাওয়া নিয়ে বিশ্বব্যাংকের দেয়া প্রস্তাব পুরোপুরি প্রত্যাখান করেছে বাংলাদেশ সরকার। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এ বিষয়টি জানিয়েছেন, সেই সঙ্গে তিনি এও বলেছেন যে, বিষয়টি নিয়ে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে চাপে রাখতে পারে।
সম্প্রতি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কাছে বিশ্বব্যাংক তাদের প্রস্তাবিত ‘রিফিউজি পলিসি রিভিউ ফ্রেমওয়ার্ক’টি মতামতের জন্য পাঠায়। ওই বৈশ্বিক ফ্রেমওয়ার্কের তিনটি উদ্দেশ্য হচ্ছে‑ ১. উদ্বাস্তু ও হোস্ট কমিউনিটির জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করা ২. উদ্বাস্তুরা যে দেশে অবস্থান করছে সেই সমাজে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া অথবা তাদের ফেরত পাঠানো এবং ৩. দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, যাতে করে নতুন উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দেওয়া সম্ভব হয়।
৩১ জুলাইয়ের মধ্যে ওই ফ্রেমওয়ার্কের বিষয়ে কোনো মতামত না জানালে, বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক বলে ধরে নেবে বলেও উল্লেখ ছিল বিশ্বব্যাংকের চিঠিতে। অবশেষ বাংলাদেশ রোহিঙ্গাসহ সব উদ্বাস্তু বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে।
পুরোপুরি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ একটা দেশের পক্ষে ১ মিলিয়নের অধিক রোহিঙ্গার দীর্ঘমেয়াদে চাপ সামাল দেয়া অসম্ভব। তারপরেও রোহিঙ্গাদের প্রতি বাংলাদেশের মানবিক আচরণ ও আশ্রয় সারাবিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু এখন রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন খুবই জরুরি।
রোহিঙ্গাদের জন্য সবচেয়ে বেশি সম্পদ ব্যয় করছে বাংলাদেশ এবং অন্যান্য অনেক দেশ তাদের দেখ-ভালের জন্য জাতিসংঘকে অর্থ প্রদান করে। এই অর্থ প্রদানের পরিমাণ দিন দিন কমে আসছে এবং এর ফলে বাড়তি বোঝা বাংলাদেশের ওপর চাপানোর একটি চেষ্টা আছে বিদেশিদের। এমনকি তারা রোহিঙ্গাদের জন্য সাহায্যের পরিবর্তে ঋণ দেবারও চেষ্টা করছে! সেইসঙ্গে বিদেশি অর্থদাতারা চাইছে রোহিঙ্গাদের উপার্জনের ব্যবস্থা, যাতে করে নিজেদের ব্যয় তারা নিজেরাই মেটাতে পারে। এছাড়া তাদের জন্য শিক্ষা, দক্ষতা বৃদ্ধি, অবাধ চলাচলের বিষয়েও তারা জোর দিচ্ছে। এজন্য রোহিঙ্গাদের সিভিল নিবন্ধন অর্থাৎ পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধনসহ অন্যান্য বিষয় চালু করার প্রস্তাব করছে তারা।
এছাড়া জাতিসংঘ ও মানবধিকার সংগঠনগুলো রোহিঙ্গাদের ওপর চলা জাতিগত নিধন নিয়ে সোচ্চার হলেও প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারকে সেইভাবে চাপ দিচ্ছে না। নিজ নিজ ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে চীন ও ভারত রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের গণহত্যা নিয়ে একেবারে চুপ, উল্টো চীন জাতিসংঘের ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিবৃতিতে সোচ্চার হলেও তাদের ফান্ডেড সংগঠন আইএমএফ ঠিকই মিয়ানমারকে অর্থসহায়তা দিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন রোহিঙ্গাদের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও ইউরোপের দেশসমূহ মিয়ানমারে বিনিয়োগ করছে। এমনকি ভাসানচরে তাদের স্থানান্তরেও বাধা দিচ্ছে তারা। এ বিষয়গুলোতে প্রয়োজন আরও সতর্ক কূটনৈতিক পদক্ষেপ।
আমাদের আশাবাদ বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের মানবিক সঙ্কটের বিষয়ে যথাযথ নজর দেবার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনে প্রয়োজনীয় যা যা করণীয় তা করবে। যাতে করে বর্তমানে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে ঘিরে সামাজিক, পরিবেশ ও অর্থনেতিক যে চাপ তৈরি হয়েছে তা থেকে মুক্ত হবে বাংলাদেশ।








