জাতিগত নিধনের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে বৈঠকে বসতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের কর্মকর্তারা। জটিল এই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে এ সপ্তাহেই আলোচনায় বসবে তারা। তবে, লাখো রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরানোর এই প্রক্রিয়া ঠিক কখন শুরু হবে, তার সুস্পষ্ট কোনো দিনক্ষণ এখনও নির্ধারণ করতে পারেনি দেশ দুটি।
যদিও, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে হওয়া এ বিষয়ে চুক্তিতে আগামী ২২ জানুয়ারির মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরানোর কাজ শুরুর ডেডলাইন রয়েছে। তবে এই সময়ের মধ্যেই যে তা শুরু হচ্ছে না, সেটা অনেকটাই স্পষ্ট। এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরাও।
বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি জানিয়েছেন, এমন জটিল কর্মপদ্ধতির ডেডলাইন মেনে চলা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। তাই ২২ জানুয়ারির পরেও তা শুরু হতে পারে।
এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, ঠিক কবে থেকে এই রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবে? অবশ্য এই প্রক্রিয়া নিয়েও সংশয় কম নয়। নভেম্বরের চুক্তির পর মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একে ‘অকল্পনীয়’ অভিহিত করে বলেছিলে, যেই দেশ এখনও রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন চালানোর কথাই স্বীকার করে না, সেই দেশেই আবার কিভাবে ফিরে যাবে তারা?
গত ২৩ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার একটি চুক্তিতে পৌঁছায়। পরে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধানের জন্য দেশ দুটি ৩০ সদস্যের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি) গঠন করে।
মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও তাদের মদদপুষ্ট উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের হামলা-নির্যাতনের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বহু দশকের দমন-পীড়নের এই ধারা সম্প্রতি চূড়ান্ত রূপ নেয় গত বছরের ২৫ আগস্ট। এরপর থেকে ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বিশ্বের সবচেয়ে নিপিড়িত এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হত্যা-ধর্ষণের মতো নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়।
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে আগামী সোমবার ও মঙ্গলবার প্রথম পর্বের বৈঠক শুরু করবে জেডব্লিউজি। ২২ জানুয়ারির আগে প্রথম ১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে তাদের নিজ দেশের রাখাইন রাজ্যে প্রত্যাবসনের প্রক্রিয়া শুরুর ডেডলাইন নির্ধারিত রয়েছে।
দুই দেশই এই প্রক্রিয়াকে স্বেচ্ছাধীন বলে অভিহিত করেন, অর্থাৎ শরণার্থীরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিবে তারা নিজ দেশ, মানে রাখাইনে ফিরে যেতে চায়, নাকি বাংলাদেশেই থাকতে চায়।
এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পরবর্তী মাস থেকে শুরু করার ব্যাপারে দেশ দুটি ঐক্যমতে পৌঁছেছিলো নভেম্বর মাসে। তবে, এজন্য দুই দেশই প্রথম পর্যায়ে যে রোহিঙ্গাদের ফেরাবে; সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় বিধিব্যবস্থা তৈরি করতে পারেনি।
বাংলাদেশি কর্মকর্তারা জানান, আসন্ন বৈঠকে কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের ক্ষেত্রে সমাধানে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। মিয়ানমারের প্রতিনিধির কাছে এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে প্রয়োজনীয় প্রত্যাবাসন ফর্মের নমুনা বিষয়ে স্পষ্ট হতে চাইবেন তারা। যা তারা ইতিমধ্যেই মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পেয়েছেন।
এই ফর্মেও কিছু অসঙ্গতি রয়েছে, যার মধ্যে শরণার্থীদের তালিকার ক্ষেত্রে তাদের ‘জাতীয়তার’ প্রশ্ন একটি, বাংলাদেশি কর্মকর্তারা জানান।
বাংলাদেশের রিফিউজি রিলিফ এন্ড রিপেট্রিয়েশন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, “আমাদের এই ‘জাতীয়তা’ ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে হবে: এই শরণার্থীদের জাতীয়তা কি? এরা কি রোহিঙ্গা, না অন্য কিছু? আমরা এই অসঙ্গতির বিষয়ে আলোচনা করবো এবং সাধারণ সম্মতির ভিত্তিতে একটি প্রত্যাবসন ফর্ম প্রস্তুত করবো।” আরএফএ-সংশ্লিষ্ট অনলাইন নিউজ সার্ভিস বেনারনিউজ-কে বলেন তিনি।
জেডব্লিউজি’র বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের অন্যতম আবুল কালাম আরও বলেন, “পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে একটি প্রত্যাবসন ফর্ম পাওয়ার পর ফিরে যেতে ইচ্ছুকদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ শুরু করবো। প্রয়োজন হলে এই ফর্ম পূরণের জন্য লোক নিয়োগ করবো।’’
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বায়োমেট্রিক এবং অন্যান্য তথ্যের ডাটাবেজ রয়েছে বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন বিভাগে, এমনটি জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক ডাইরেক্টর জেনারেল ইন-চার্জ মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরী।
এই ডাটাবেজ থেকে, ১ লাখ রোহিঙ্গার নামের তালিকা পাঠানো হবে। সেখানে রাখাইনে তাদের আবাসের ঠিকানাও উল্লেখ থাকবে। মিয়ানমার সরকারের কাছে এই তালিকা পাঠানো হবে বলে জানান তিনি।
মঞ্জুরুল করিম বেনারনিউজকে বলেন, এরপর মিয়ানমার যাচাই করে নিশ্চিত হবে, তালিকায় থাকা মানুষরা আসলে মিয়ানমারেই বসবাস করতো কিনা। মিয়ানমারের যাচাই শেষে, রোহিঙ্গাদের কাছে আমরা জানতে চাইবো, তারা রাখাইনে ফিরে যেতে ইচ্ছুক কিনা।
“আমাদের প্রস্তাবনা হলো: পরবর্তী পদক্ষেপে ফিরে যেতে ইচ্ছুকদের নাম ও অন্যান্য তথ্য দিয়ে আমরা প্রত্যাবসন ফর্মগুলো পূরণ করবো। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের ভিন্ন চিন্তা থাকতে পারে। তাই জেডব্লিউজি বৈঠকে আমরা আমাদের প্রস্তাবনা বিষয়ে আলোচনা করবো এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার কর্মপদ্ধতি বিষয়টি চূড়ান্ত করবো।”
এছাড়াও, এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) ভূমিকা কি হবে, তাও আলোচনা করবে জেডব্লিউজি। নভেম্বরে দেশ দুটি যে চুক্তি স্বাক্ষর করে, তাতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় ইউএনএইচসিআরকে অন্তর্ভূক্ত করার আহ্বান ছিলো।
গত নভেম্বরের সেই চুক্তিতে এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে দুই মাসের ডেডলাইন নির্ধারণ করা হয়।
মঞ্জুরুল করিম খান বলেন, “প্রত্যাবাসন চুক্তিতে উল্লেখিত টাইমফ্রেমে ২২ জানুয়ারির আগে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর কথা থাকলেও তা হওয়ার কোনো সুযোগ আমি দেখি না।
“কিন্তু এর মানে এই নয় যে জানুয়ারির ২২ তারিখের পর এই প্রত্যাবাসন শুরু করা যাবে না। প্রত্যাবাসনের মতো একটি জটিল প্রক্রিয়া সবসময় একটি ডেডলাইনের মধ্যে সম্পন্ন করা যায় না।”
প্রত্যাবাসনের প্রথম ধাপে ১ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরানোর টার্গেট রয়েছে। আর বাংলাদেশের বদ্ধ-নোংরা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে ১০ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম আশ্রয় নিয়েছে। যারা রাখাইন রাজ্যে বিভিন্ন সময় সহিংসতার শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
জাতিসংঘের হিসেবে এই রোহিঙ্গাদের কমপক্ষে ৬ লাখ ৫৫ হাজার রোহিঙ্গা ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে শুরু হওয়া সামরিক অভিযানের মুখে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। স্থানীয়দের হিসাবে যে সংখ্যা ৭ লাখ ছাড়িয়েছে। সরকারি নিরাপত্তা চৌকিতে আরাকান রোহিঙ্গা সেলভেশন আর্মি (আরসা) জঙ্গিদের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ওই অভিযান শুরু হয়।
এর আগে মিয়ানমার ঘোষণা দেয়, তারা ফিরতে ইচ্ছুক ৫ হাজার রোহিঙ্গাদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা তৈরি করেছে। এবং তারা বাংলাদেশের কাছ থেকে ‘প্রত্যাবসনের যোগ্য’ রোহিঙ্গাদের তালিকা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে।
শুরুতে, উত্তরাংশের রাখাইন রাজ্যের তাং পিয়ো লেত ওয়ায়ে এবং এনগা খু ইয়া গ্রামের দুইটি রিসেপশন সেন্টার রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করা হবে বলে জানান মিয়ানমার কর্মকর্তারা।








