অবরোধবাসিনী বইটি যেমন শুনিয়েছে সেই সময়ে চলমান একটি অন্ধকার সময়ের গল্প, তেমনই সুলতানার স্বপ্ন দেখিয়েছে নতুন দিনের স্বপ্ন। এমনই ছিল বেগম রোকেয়ার লেখনী। লেখনীর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন নারী কোন জড়বস্তু নয়, মানব সন্তান।
তার লেখাগুলোই ঘর থেকে বের করে এনেছে অনেক নারীকে, দেখিয়েছে আলোর দিশা। তবে এই সময়ে এসেও ১শ’ বছর পুরনো সেই সব লেখা পাঠের প্রয়োজনীয়তা একেবারেই কমে যায়নি বলে অনেকে মনে করছেন। বরং তাদের মতে, কয়েকটি বিশেষ দিকে নজর দিলে বোঝা যায় কখনো কখনো সেই প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।
সেকথাই বলছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সহকারি অধ্যাপক হুমায়ূন কবীর। চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন: বেগম রোকেয়ার সেই সময়ে যেসব বিষয় নিয়ে লিখেছেন সেসব দিকে সমাজের পরিবর্তন অনেকটা হয়েছে, কিন্তু পুরোপুরি হয়নি। কিছু জায়গায় বরং নারীদের জন্য আরো বেশি অবরোধ তৈরি হয়েছে।

তবে অবরোধবাসিনীতে বেগম রোকেয়া যে পর্দার কথা বলেছেন, সেটা ছাড়িয়ে এখন নারীর জন্য বড় বোঝা হয়ে উঠেছে মানসিক পর্দা। তেমনটাই মনে করেন এই শিক্ষক। তিনি বলেন: এখানে মূল সমস্যাটা রয়ে যাচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থায়। মানসিক বিকাশের জন্য যে পড়াশোনা সেখানেই আমাদের সমস্যা আছে। ফলে শুধু নারীরা নয়, কোন মানুষই এখনো মানসিক পর্দা থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যার কারণে ধর্ম নিয়েও প্রকৃত জ্ঞান তাদের নেই। ফলে অবরোধগুলো ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়নি।
তারপরও কিছু নারী বাইরে বেরিয়ে আসছে। সেটা কেউ কেউ রোকেয়ার লেখনীতে উদ্বুদ্ধ হয়ে নারী উন্নয়নের জন্য, আবার কেউ কেউ পুনরায় দাসত্ব বরণ করবার জন্য। যেমন কোন প্রতিষ্ঠানে নারীর জন্য ড্রেস কোড ঠিক করে দেওয়া হচ্ছে আবার কেউ কেউ সৌন্দর্য বাড়াতে কসমেটিক সার্জারি করছেন। সেগুলোও দাসত্বেরই ফল। ফলে পরিবর্তন এলেও সেটা আশানুরূপ নয়, এমনই মনে করেন হূমায়ুন কবীর।
তিনি বলেন: এজন্য প্রয়োজন শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজে সাহিত্যে নারী বিষয়ে পড়ানোর সময়ে রোকেয়া সম্পর্কে পড়ানো হয়। তবে শুধু রোকেয়া বিষয়ে এখানে কোন কোর্স নেই। আমাদের আলোচনায় ছিল সব ফ্যাকাল্টিতে রোকেয়া বিষয়ে কোর্স চালু করার। সেটা এখনো চালু হয়নি। নিশ্চয়ই হবে।
ছোট থেকেই শিক্ষাব্যবস্থায় রোকেয়ার চর্চা আরো বেশি আনা উচিত বলে মনে করেন তিনি। এ বিষয়ে হুমায়ূন কবীর বলেন: রোকেয়ার চর্চা শুরু করা উচিত প্রাথমিক পর্যায় থেকে। তাহলে ছেলে-মেয়ে সবার মধ্যেই সচেতনতার বিষয়গুলো আসবে। তাছাড়া বিশেষ দিনকে কেন্দ্র করেই আলোচনা বা লেখালেখিগুলো হয়ে থাকে। এর বাইরেও বিভিন্ন সময়ে তাকে নিয়ে আলোচনা আসা উচিত। সরকারও কোনো পলিসি নিতে পারে রোকেয়ার আদর্শকে তুলে ধরার জন্য। সেই সঙ্গে সেই বিষয়ে কার্যক্রম তৈরি করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে তা না হলে কাজ করতে গেলে বাধার মুখে পড়তে হয়। তার লেখা নিয়ে সেভাবে গবেষণা হয়নি। সেদিকেও নজর দেওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

একই কথা বলছিলেন এনসিটিবির চেয়্যারম্যান নারায়ণচন্দ্র সাহা। তিনি জানান: রোকেয়াকে আরো বেশি বেশি পাঠ্য করে তোলার চেষ্টা রয়েছে। বেগম রোকেয়াকে নিয়ে পাঠ্যপুস্তকে লেখা আছে। কারিকুলামে যখনই পরিবর্তন আসে তখন সেখানে আরো বেশি সংযোজন ও পরিমার্জন করার বিষয়গুলো উঠে আসে। সেভাবেই রোকেয়াকে পাঠ্যপুস্তকে আরো বেশি অন্তর্ভূক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম মনে করেন: এখনো রোকেয়ার লেখা বা চিন্তাভাবনা পাঠ শুধু প্রাসঙ্গিক নয় বরং আরো জরুরি হয়ে উঠেছে। সেটা শুধু নারীর জন্য নয় পুরুষের জন্যও।
তিনি বলেন: বেগম রোকেয়া বলেছেন- ওঠো জাগো কন্যা জায়া ভগিনী, তোমরা সমস্বরে বলো আমরা মানুষ। এখন মেয়েরা পাইলট হয়ে শান্তিরক্ষা মিশনে চলে যাচ্ছে, এভারেস্টে যাচ্ছে, রাষ্ট্র পরিচালনায় আছে, চ্যালেঞ্জিং পেশা সাংবাদিকতায় আসছে। তারপরও আমরা এখনও সেই মানুষই হয়ে উঠতে পারিনি।

‘বেগম রোকেয়া বলে এসেছেন নারী মানব সন্তান, আর এখন বিশ্বব্যাপি সবাই নারীকে মানুষ হিসেবে দেখার কথা বলছেন। তার সব লেখায় তিনি বলেছেন- নারী পুরুষ আমাদের দুটি চাকা। এটা এখন একুশ শতকেরও মূল কথা। স্যাটায়ারের মধ্য দিয়ে তিনি অনেক কথা বলেছেন। অবরোধ প্রথার বিরুদ্ধে তিনি কথা বলেছেন। রোকেয়া শুধু নারীর জন্য না, সবার জন্য। এসডিজি অর্জনেও আজ নারীকে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে। এখন সরকারও বলছেন, কেউ পেছনে পড়ে থাকবে না। তাই রোকেয়াকে আরো বেশি পাঠ্যসূচিতে আনা জরুরি।’
তিনি বলেন: পাঠ্যসূচিতে রোকেয়া পাঠ অন্তর্ভূক্ত করে শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই তার লেখার সঙ্গে পরিচিত করে তুলতে হবে। তাকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা যেতে পারে। রোকেয়া পদক চালু রয়েছে এটা একটা স্বীকৃতি। সামাজিক অগ্রগতির জন্য রোকেয়াকে আরো বেশি বেশি সামনে আনা দরকার।







