বাসস্থান একজন মানুষের মৌলিক চাহিদা। সব মানুষের স্বপ্ন থাকে নিজের একটি সুন্দর বাড়ি। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে ঘরে ফিরে সবাই নিতে চায় একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস। সবাই চায় নিজের বাড়িতে তার পরিবারের বেড়ে ওঠা এবং একইসঙ্গে প্রিয়জনদের নিশ্চিৎ নিরাপত্তা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের মানুষেরও নিজের বাড়ি বা ফ্ল্যাটের চাহিদা আছে।
চাহিদা থাকা সত্ত্বেও উন্নত পশ্চিমা দেশগুলোর মতো বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট ব্যবসা এখনও মানসম্মত হয়ে ওঠেনি এবং প্রতিনিয়ত এ খাতটি বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে। প্রধান যে সমস্যা রয়েছে তা হলো আস্থা এবং স্বচ্ছতা। রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান বা ডেভেলপার এবং বিক্রেতার মধ্যে আস্থার অভাবতো রয়েছেই, ক্রেতাদের সঙ্গেও আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। জমি বা ফ্ল্যাটের আয়তন, মালিকানা, বৈধ কাগজপত্র, দর-দাম সংক্রান্ত সমস্যাগুলো নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে ঝামেলা থেকেই যায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। এসব কারণে বাংলাদেশে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা যেমন নষ্ট হচ্ছে তেমনি একজন মানুষের নিজের বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছে।
এসব সমস্যাগুলো থেকে পরিত্রাণ পেতে কিংবা সমস্যায় পড়তে না চাইলে প্রথমত যা দরকার তা হচ্ছে পরামর্শ ও দিক নির্দেশনা। ভূমি কিংবা বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাট ক্রয় সংক্রান্ত বিষয়ের উপর বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ কোথা থেকে নেয়া যাবে তাও জানা নেই সাধারণ মানুষের। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এমন কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা বা বৈধ কোনো প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশে এতোদিন ছিলো না বললেই চলে। বর্তমানে দেশে এমন অনেক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শদাতা এবং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা ভূমি কিংবা বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাট ক্রয় সংক্রান্ত বিষয়ে নিয়ে সার্বিক সহযোগিতা করে থাকে।
কিছু বিষয় যদি খেয়াল রাখা যায় তবে অনাকাঙ্খিত ঝামেলা এড়ানো সম্ভব। যেমন:
– অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে টাকা পরিশোধের বৈধ মাধ্যমগুলো কী?
– ভবিষ্যতে অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাটের দাম বাড়বে না কমবে?
– দাম ও এলাকা অনুযায়ী কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য উপযুক্ত জায়গা কোনগুলো?
– বিক্রিযোগ্য নির্দিষ্ট অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাটে কোনো ধরনের ঝামেলা আছে কিনা?
– আইনগত কোনো ঝামেলা থাকলে তা সমাধানে কী করণীয়?
ঢাকার একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে ২০ বছর ধরে চাকরি করছেন বেলায়েত হোসেন। ঢাকায় স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন শুরু থেকেই। তিনি বলেন, পাখিরও একটি ঠিকানা আছে অথচ আমাদের মতো মধ্যবিত্ত মানুষের সেই ঠিকানাটুকুও নেই। তিনি আরও বলেন, উপার্জনের সিংহভাগই চলে যায় বাড়িভাড়া আর পাঁচ সদস্যের পরিবারের খাদ্যের জোগান দিতে।
তার মতে, ফ্ল্যাটের যে দাম বেড়েছে তাতে সারাজীবন সৎ পথে আয় করে কারও পক্ষে একটি ফ্ল্যাট কেনা সম্ভব নয়। এছাড়া ফ্ল্যাট বা বাড়ি কেনার জন্য যে ব্যাংক লোন পাওয়া যায় তাতে যে পরিমাণ সুদ আরোপ করা হয় তা একটি ফ্ল্যাটের দ্বিগুণ দাম হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ফ্ল্যাট ব্যবসায়ী আর ব্যাংক লাভবান হচ্ছে। গ্রাহকের কোনো লাভ হচ্ছে না।
ফ্ল্যাটের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বিভিন্ন মাধ্যমে থেকে জানা যায় যে, গত এক দশকে জমি, রড, সিমেন্ট, ইট, বালু, পাথর, রং, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ, গ্লাস, পিভিসি পাইপ, টাইলস ও মোজাইকসহ বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রীর দামও বেড়েছে। এছাড়াও ফ্ল্যাট নিবন্ধন ও ভূমি নিবন্ধনে খরচ বেড়ে যাওয়াও ফ্ল্যাটের দাম বৃদ্ধির জন্য দায়ী।
আরো জানা গেছে, গত এক দশকে জমির দাম বেড়েছে প্রায় ১ হাজার শতাংশ, ইটের দাম বেড়েছে ২০০ শতাংশ, সিমেন্ট ৩০০ ও রড ৩০০ শতাংশ। এ অবস্থায় সরকার এই শিল্পের দিকে সুনজর না দিলে আগামীতে ফ্ল্যাটের দাম আরও বেড়ে যাবে। ফলে মধ্যবিত্ত কেন, উচ্চ মধ্যবিত্তদেরও নিজের ফ্ল্যাটের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি সবসময়ই স্থির আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর তীব্রভাবে আঘাত করে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সমানুপাতিক হারে তাদের আয়ের সঙ্গতি না বাড়ায় তাদের জীবনযাত্রার মান কমে যায়। ফলে তারা নূন্যতম চাহিদা পূরণের দিকে নজর দেয়। সে ক্ষেত্রে ফ্ল্যাট হয়ে ওঠে বিলাসিতা।
অথচ বাসস্থান একটি মৌলিক চাহিদা। জমি বা ফ্ল্যাট মালিকরা বসে থেকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সুবিধা ভোগ করে। তবে সরকার ফ্ল্যাট বা জমির মূল্যবৃদ্ধির ওপর প্রতি চার বছর পর পর করারোপ করে সেই টাকা ফ্ল্যাট নির্মাণে ভর্তুকি দেওয়ার কথা ভাবতে পারে। এতে করে একদিকে যেমন উৎপাদনহীন ভূমি ব্যবসা অনুৎসাহীত হবে, অন্যদিকে মধ্যবিত্ত মানুষের আবাসন সমস্যা কিছুটা সমাধান হতে পারে।
ফ্ল্যাট মালিক, রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর ছলছাতুরি সাধারণ মানুষকে বেকায়দায় ফেলে দেয়। ডিজিটাল বাংলাদেশে রিয়েল এস্টেটের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড যদি ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পাদন করা যায় তবে ঝামেলা অনেকটাই দূর হবে বলে আশার করা যায়।
নিচের সুবিধাগুলো যদি একটি প্ল্যাটফর্মে নিশ্চিৎ করা যায় তবে ঝামেলাবিহীন অ্যাপার্টমেন্ট বা বাড়ির ক্রয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি একটি টেকসই পরিবেশ তৈরি হবে বাংলাদেশে।
– এলাকাভিত্তিক অ্যাপার্টমেন্ট বা বাড়ির দামের পার্থক্য, ছবি এবং অন্যান্য তথ্যাদি।
– অ্যাপার্টমেন্ট বা বাড়ির মূল ছবি, অনুমোদিত তথ্যাদি এবং আনুষঙ্গিক কাগজপত্র।
– অ্যাপার্টমেন্ট বা বাড়ি ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষের জন্য বিশেষজ্ঞ পরামর্শ।
– অ্যাপার্টমেন্ট বা বাড়ি সংক্রান্ত যেকোন প্রশ্নের উত্তর, দলিল, নিবন্ধনের কাগজপত্র পর্যালোচনার সুযোগ।
সারাজীবনের জমানো টাকা দিয়ে শেষ বয়সে এসে একজন মানুষ তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে একটি সুন্দর-সাজানো ফ্ল্যাট কেনেন। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। ফ্ল্যাটের বৈধতা, কাগজপত্রে ঝামেলা, ফ্ল্যাট হস্তান্তর সংক্রান্ত ছলছাতুরির বেড়াজালে পড়ে স্বপ্ন দেখা এসব মানুষ নিঃস্ব হয়ে যায়। এসব কারণে ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এবং ফ্ল্যাট মালিকগণ।
এখন শুধুমাত্র অসাধু ব্যবসায়ী ও চক্রের কারণে সহজেই কেউ ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সরকারের উপযুক্ত পদক্ষেপই পারে এসব সমস্যা সমাধান করতে। পাশাপাশি দরকার ফ্ল্যাট ক্রয় সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম।









