রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো থেকে মোলদোভা পর্যন্ত রাশিয়ার প্রতিবেশি দেশগুলোর জন্য এক ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি করেছে।
ঐতিহাসিকভাবে ফিনল্যান্ড নিরপেক্ষ দেশ। তবে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার কারণে এই দেশটিও এখন শঙ্কিত।
এছাড়া সুইডেনের পাশাপাশি অন্যান্য স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো কখনোই ন্যাটোতে যোগ দেয়ার বিষয়ে সমর্থন না জানালেও, রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ফিনল্যান্ড এবং সুইডেনকে সতর্ক করে বলেন, ন্যাটোতে যোগ দেয়ার মতো যেকোনো পদক্ষেপ সামরিক পরিণতি ডেকে আনতে পারে তাদের জন্যও।
রাশিয়ার এ মন্তব্যে মর্মাহত দুই দেশের জনগণ। এছাড়া এ মন্তব্যের পর থেকেই রাশিয়ার বিমানবাহিনী সুইডেনের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ।
নিরপেক্ষ থেকেও যদি তা রাশিয়া স্বস্তি না দেয় তবে ন্যাটোতে যোগদান করলে তারা তাদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পেতে পারে বলে মন্তব্য এ দুই দেশের জনগণের।
ফিনল্যান্ড মনে করতো রাশিয়ার সাথে তাদের সম্পর্ক ভালো। কিন্তু ইউক্রেন হামলা তাদের এ চিন্তা পরিবর্তন করে দিয়েছে।
রাশিয়ার এই হামলা শুরুর আগে আলেস্কি সেলোনন এবং স্যাম্পো মুহোনেন গীক দম্পতি রাশিয়ার এই হুমকির বিষয়ে আলোচনা করছিলো। যেখানে তারা বলে এই হুমকি থেকে বাঁচতে ন্যাটোর সদস্য হওয়া নিরাপদ বলে ভাবছেন।
তারা তাদের এই বক্তব্য নিয়ে তাদের অন্য তিনজন বন্ধুর সাথে অনলাইনে আলোচনা করেন এবং তাদের মধ্যে পাঁচজন এই বিষয়ে ফিনিশ পার্লামেন্টে একটা পিটিশনের জন্য স্বাক্ষর সংগ্রহ করার পরিকল্পনা করে।
ফিনিশ পার্লামেন্টে কোনো বিষয়ে বিতর্ক উপস্থাপনের জন্য কোনো প্রস্তাবনার পক্ষে ৫০ হাজার স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয়। তারা দশ দিনে ৭০ হাজার স্বাক্ষর গ্রহণ করতে সক্ষম হয়।
তাদের এই পরিকল্পনা ফিনিশ জনগণের মনপুত হয় এবং বিষয়টি বিবেচনা করা এখন সরকারের হাতে রয়েছে বলে জানায় তারা। তাদের সাম্প্রতিক এই ভোট এটাই নির্দেশ করে যে, ফিনল্যান্ডের অধিকাংশ জনগণ তাদের এই চিন্তার সাথে একমত।
তবে ফিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যান্টি কাইকোনেনকে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি এই বিষয়ে সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেন, পরিস্থিতি এখন অনেক কঠিন তাই ন্যাটোতে যোগদান করার বিষয়টি অত্যন্ত যত্নসহকারে বিবেচনা করতে হবে।
ফিনল্যান্ড সরকার ইউক্রেনের সর্বশেষ পরিণতি কী হতে চলছে তার উপর বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে চায়।
ফিনল্যান্ডের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৩৯ সালের ফিনল্যান্ড আক্রমণ যা উইন্টার ওয়ার নামে পরিচিত তার সাথে ইউক্রেন আক্রমণের কিছু মিল রয়েছে।
আত্মবিশ্বাসী জোসেফ স্ট্যালিন তার সেনাবাহিনীকে ফিনল্যান্ডে পাঠায় যেখানে তারা বিশাল গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে তাদের ঠেকাতে সক্ষম হয়।
শেষ পর্যন্ত আলোচনা শুরু হওয়া এবং চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার আগ পর্যন্ত চলেছিলো এই উইন্টার ওয়ার বা শীতকালীন যুদ্ধ। রাশিয়া ফিনল্যান্ডের কিছু অঞ্চল দখলে নিলেও, ফিনিশরা তাদের স্বাধীনতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
ইউক্রেন হামলাতেও অনেক অব্যবস্থাপনা দেখা যায় শুরু থেকে। এই সৈন্যদের সামরিক মহড়ার কথা বলে যুদ্ধে প্রেরণ, এছাড়া শুরু থেকেই রাশিয়ার লজিস্টিক দিকটিও দুর্বল মনে হচ্ছিলো, তাছাড়া সৈন্যদের জন্য খাদ্য, জ্বালানি এবং জলের সরবরাহ অপ্রতুল হওয়ায় তাদের এই অব্যবস্থাপনা দৃষ্টি কেড়েছে সবচেয়ে বেশি।
পশ্চিমা বিশ্লেকরা জানায়, রাশিয়ান সৈন্যদের কাছে মানচিত্রের সরবরাহ ছিলো না, যে কারণে দিকনির্দেশনা পেতে ট্যাঙ্ক চালকদের বারবার থামতে হচ্ছিলো। আধুনিক যুদ্ধের প্রস্তুতি এমন হতে পারে না বলে মন্তব্য তাদের।
তবে এসবের কিছুই এটা নিশ্চিত করে না যে শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জিতবেন না।
তিনি ইতোমধ্যেই ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাঁক্রোকে জানান, তিনি ইউক্রেন সম্পূর্ণ দখল করার আগ অবধি থামবেন না। তবে শঙ্কার বিষয় হলো তিনি প্রচলিত বাহিনী বা যুদ্ধের মাধ্যমে ইউক্রেনকে সমর্পণ করাতে না পারলে কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার করবেন।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের দাবি তিনি ইউক্রেনের জনগণকে নয়া ফ্যাসিবাদ থেকে রক্ষা করতেই এই হামলা পরিচালনা করছেন।
তবে ইউক্রেন যুদ্ধের এই পরিস্থিতি ফিনল্যান্ড এবং সুইডেনের ন্যাটোর সামরিক জোটে যোগ দেয়া উচিত হবে কি না তা বিবেচনা করার আসল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছে দুই দেশ।








