রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে চলমান আলোচনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তালগাছ নিয়ে টানাটানির পর্যায়ে চলে গেছে বলে দৃশ্যমান। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ দুই পক্ষের প্রচারণায় কেউ কারে নাহি ছাড়ি সমানে সমান অবস্থায় পৌঁছেছে। পূর্ব সিদ্ধান্তে অনড় দু’পক্ষই কেউ হেরে যেতে রাজি নয়। এমন অবস্থায় প্রকৃত অবস্থা অনুধাবনের সাধ্য কারও নাই। আসলে কী ঘটছে, আর কী ঘটতে যাচ্ছে- এ আলোচনার চাইতে নিজের অবস্থান অটুট রাখতে মরিয়া মনোভাবের কারণে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে কোন আলোচনা হচ্ছে না।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনমত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাব দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে। সরকার ও সরকারবিরোধী দুই মত সর্বক্ষেত্রে প্রচলিত বলে যেকোনো ধরণের মতামত গোষ্ঠীবদ্ধ মত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আলোচনা এ ধারার বাইরে যেতে পারেনি খুব একটা। সরকার পক্ষের যেকোনো সিদ্ধান্তকে সমর্থন করতে ‘জাস্টিফাই’ করার মত এক পক্ষের উদ্ভব হয়েছে বেশ আগেই। এবার তারা আবারও সক্রিয় রয়েছে বলে দৃশ্যমান। রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন যৌক্তিক এবং সে কারণে সুন্দরবনে পরিবেশগত কোনো ক্ষয়ক্ষতি হবে না এমন এক প্রচারণা চালাচ্ছেন অনলাইনের আওয়ামী সমর্থক এক্টিভিস্ট ও সমর্থকেরা। তারা আগেও বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারি যেকোনো সিদ্ধান্তের সমর্থক হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এক্ষেত্রে রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন নিয়ে আগের মত তারা দাঁড়িয়ে গেছেন।
পরস্পরবিরোধী এ অনলাইন যুদ্ধের কারণে অনেকের কাছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সুবিধা-অসুবিধা রীতিমত রহস্যময় ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে সব তথ্য অনলাইনে ভেসে আসছে এক পক্ষে সেগুলো নিয়ে পক্ষে আলোচনা করলেও, অন্যপক্ষ একইভাবে সেগুলোকে উপলক্ষ করে বিপক্ষে প্রচারণায় নেমেছে। আবার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অসুবিধা নিয়ে ভেসে আসা লেখা নিয়ে একইভাবে দুইপক্ষ পক্ষ-বিপক্ষ আলোচনায় মেতেছে। যৌক্তিক যেকোনো তথ্য আর আলোচনাও পূর্বসিদ্ধান্তে অনড় দুই পক্ষের ইতিবাচক-নেতিবাচক প্রচারণার কারণে অনলাইনে টিকতে পারছে না। ফলে পক্ষ-বিপক্ষের সমর্থক দুই পক্ষের বাইরে তৃতীয় যে পক্ষ যারা নাকি নিজেদের জানার পরিধি বাড়াতে সচেষ্ট ছিল তারা বিভ্রান্ত ছিল। কারণ পক্ষ-বিপক্ষের দুই পক্ষের আলোচনার কারণে প্রকৃত সত্য-তথ্য আড়াল পড়ে যাচ্ছে। 
রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে সরকারের এবং আন্দোলনকারী দুই পক্ষের যুক্তি রয়েছে। রামপাল যেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন হবে সেটা সুন্দরবনের ইউনেস্কো ঘোষিত অভয়ারণ্য থেকে ৭২ কিলোমিটার দূরে, সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে, আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ি এ দূরত্ব ১২ কিলোমিটার হলেই স্ট্যান্ডার্ড- এসব অনেক কিছুই আলোচনায় আসছে। কিন্তু খুব কমই আলোচনায় আসছে পশুর নদীর কথা, যেখান দিয়ে বর্জ্যগুলো সুন্দরবন দিয়ে প্রবাহিত হবে সেটা। পানিতে থাকা কুমির, ডলফিনসহ অন্যান্যরা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আকাশে ভেসে বেড়ানো ধোয়া বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার কারণে প্রাণিজগত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মৌমাছি কিংবা প্রজাপতির পরাগায়ণ বাধাগ্রস্ত হবে। অথবা সুন্দরবনের অভ্যন্তর দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ব্যাপক শব্দদূষণের কাছে বনের ভেতরকার প্রাণিরা কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সেটা নিয়েও খুব বেশি আলোচনা হচ্ছে না। জাহাজডুবি হলে সে কারণে নদী ক্ষতিগ্রস্ত হবে এসব নিয়েও ব্যাপক আলোচনা আর গবেষণার দরকার ছিল। কিন্তু সে বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে কই? সুন্দরবন থেকে রামপাল এ দূরত্বের বিষয়টি হয়ত কাগজে-কলমে জাস্টিফাই করা যায় আন্তর্জাতিক রীতি অনুসরণের জন্যে, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টি নিয়েও ভাবা দরকার।
এখন রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র হয়ে গেলে এক, দুই, পাঁচ কিংবা দশ বছরে হয়ত পরিবেশগত কোন ক্ষতি দৃশ্যমান হবে না, কিন্তু এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে আস্তে আস্তে; চূড়ান্ত ক্ষতি হয়ত চল্লিশ কিংবা পঞ্চাশ বছর পর দৃশ্যমান হবে। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে যদি পরিবেশের ১ ভাগও ক্ষতির আশঙ্কা থাকে তাহলেও সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা উচিত। অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে সুন্দরবনের কিছুটা ক্ষতি হবে, তবে একই সঙ্গে তিনি রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে বলেই ঘোষণা দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রীর এ বক্তব্য একদিকে যেমন সহজাত সারল্য আছে, ঠিক একইভাবে আছে সরকারি জেদের বহিঃপ্রকাশ যা সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত থেকেই উদ্ভূত!
সরকারের এ জেদের কারণে হয়ত সেখানে সুন্দরবন ধ্বংস করে হলেও বিদ্যুৎকেন্দ্র হয়ে যাবে। আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দরের মত প্রবল আন্দোলন হবে না, কারণ স্থানীয়রা সরকারের সে সিদ্ধান্ত রুখে দিয়েছিল। সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকায় যে গাছপালা, পশু-পাখির বাস তারা মানুষের মত এসে রাস্তায় আন্দোলনে নামতে পারবে না বলে সরকার হয়ত আড়িয়াল বিলের মত প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়বে না। জেদের কারণে ধ্বংসকেই বেছে নেবে। ফলে সুন্দরবন নিয়ে লিখা ইতিহাসে হয়ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই “সুন্দরবন হত্যাকারী” হিসেবে লিখা হবে। অথচ এ ধরণের সরকারি কোন সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই সরকার প্রধানের একক সিদ্ধান্তে হয় না। সকলেরই এখানে অংশগ্রহণ থাকে, সকলেরই কিছু কিছু দায় থাকে; কিন্তু মূল দায় গিয়ে পড়ে একজনের উপরই, এক্ষেত্রে এটা শেখ হাসিনার। বড় যেকোনো সিদ্ধান্ত যেমন এককভাবে নেওয়া যায় না, ঠিক একইভাবে সিদ্ধান্ত বাতিলও এককভাবে সম্ভব না। এখানে অনেকের অংশগ্রহণ দরকার। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সুন্দরবনের পক্ষে থাকা মানুষজনের কেউ নেই শেখ হাসিনার পাশে। যারা আছে তাদের অধিকাংশই জেদ চাঙা রেখে ধ্বংসের পক্ষের মন্ত্রণাদাতা!
সুন্দরবন রক্ষা নিয়ে এই আন্দোলন কয়েকজন বাম নেতার নেতৃত্বে হচ্ছে বলে নেতা দেখে আন্দোলনের উদ্দেশ্যকে সরকার তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চাইছে, হয়ত দেবেও কিন্তু এ বিষয়ে দেশের অধিকাংশ মানুষই পরিবেশের বিনাশ চায় না। এক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অনেকেই বলতে চাইছেন এই বর্ষায় কয়টা গাছ লাগিয়েছেন যে পরিবেশ নিয়ে এত উতলা হচ্ছেন। সুন্দরবন রক্ষা ইস্যুতে কথা বলতে গেলে কি গাছ লাগিয়ে পরিবেশপ্রেমের প্রমাণ দিতে হবে?
এটাকে যদি যৌক্তিক ভাবা হয় তাহলে অন্য অনেক কিছুর মত পুলিশের সমালোচনা করতে গেলে আগে পুলিশ হয়ে দেখাতে হবে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করতে গেলে আগে মন্ত্রী হয়ে, তা না হলে অন্তত সাবেক মন্ত্রী হতে হবে। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যেকোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতে গেলে অন্তত একবারের জন্যে হলেও প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেখাতে হবে। এটা কেমন যুক্তি! সমালোচনা, আর যেকোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে গেলে যুক্তি আর বাস্তবতা থাকলেও চলে। এ ধরণের অযৌক্তিক আক্রমণ দেশের মধ্যকার বুদ্ধিবৃত্তিক যেকোনো আলোচনার পথ রুদ্ধ করে দেয়, যা অনাকাঙ্ক্ষিত।
ব্যক্তি-মানুষ শেষ পর্যন্ত এক প্রকার রাজনৈতিক জীবই। দেশের যেকোনো আলোচনা-সমালোচনায় ঘুরেফিরে যেকোনো রাজনৈতিক পক্ষে তার মতামত হেলে পড়ে। আন্দোলনের পক্ষে-বিপক্ষে এবং আপাত দর্শকপক্ষের সকল পক্ষই কোন না কোনোভাবে একপক্ষে তাদের মতামত প্রকাশ করবে। কিন্তু তাই বলে পূর্বসিদ্ধান্তে অনড়পক্ষ হয়ে থাকলে শেষবিচারে আমাদের সামষ্টিক ক্ষতি। সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনের নেতৃত্বের প্রতি আমার ব্যক্তিগত অনাগ্রহ থাকতে পারে, থাকতে পারে তাদের রাজনৈতিক কৌশলের প্রতি বিরোধিতা। কিন্তু জনবান্ধব, পরিবেশবান্ধব তাদের এ উদ্যোগকে আমি যদি ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয় হিসেবেই দেখি তাহলে জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিলাম ব্যক্তিগত চিন্তার কাছে। এটা হয় না, হতে পারে না।
দিন দিন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, দরকার বাড়তি উৎপাদন- এসব অস্বীকার করা যাবে না। বিদ্যুতপ্রাপ্তির মত নাগরিক সকল চাহিদা পূরণে সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ। পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায়ও তারা দায়বদ্ধ। এ অঙ্গীকারপূরণ ও দায়বদ্ধতার বিষয়টি মাথায় রেখেই উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ করা উচিত। বাংলাদেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র করার মত আর কোন জায়গা নেই- এমন ত না! তাহলে সুন্দরবন ঘেঁষে রামপাল কেন? রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে এটা আন্দোলনকারী ও সরকারবিরোধীদের বক্তব্যই কেবল নয়, এটা স্বীকার করেছেন স্বয়ং অর্থমন্ত্রীও। তাহলে পরিবেশবিনাশী এমন সিদ্ধান্ত কেন? আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর হয় নি, এ কারণে সরকারের জনসমর্থনে ব্যাপক ধস নেমেছে- এমন ত না, বরং সরকারের সে সিদ্ধান্ত প্রশংসিত হয়েছে। রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন থেকে সরকার সরে আসলে সরকারের পরাজয় কিংবা পতন হয়ে যাবে এমন না। বরং প্রশংসিত হবে। আর জেদের কারণে জোর করে সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র করে নিলে উলটো সমালোচিত হবে এবং জনসমর্থন কমবে। 
রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র না করে অন্য কোথাও সে বিদ্যুৎকেন্দ্র করার সুযোগ আছে, কিন্তু অপ্রকাশ্য প্রভাবের কারণে হলেও সুন্দরবন ধ্বংস হলে সে সুন্দরবন আর পাওয়া যাবে না। হ্যাঁ, ধ্বংস হয়ত একদিনে কিংবা মাত্র পাঁচ বছরে হবে না; আস্তে আস্তে হবে। সরকারের সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়ন ও মেয়াদকে পাঁচ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না ভেবে সারাজীবনের জন্যে ভেবে দেখার অনুরোধ করি। স্বাভাবিকভাবেই একটা সরকার সারাজীবন থাকে না, আপনারাও থাকবেন না; কিন্তু সরকারী এ সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগের রেশ থেকে যাবে আজীবনের জন্যে। সুন্দরবনকে পাঁচ কিংবা দশ বছর মেয়াদি কোন বিষয় না ভেবে এটাকে আজীবনের এক বিষয় ভেবে সুন্দরবনবিনাশি যেকোনো ধরণের সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকুন।
আমি দেশের মালিক- একবাক্যে এ দাবি করতে পারছি না, কারণ মালিকানার বিষয়টি বিধিবদ্ধ। সংবিধানের এক অনুচ্ছেদ সরাসরি মালিক বলবে আর অন্য অনুচ্ছেদ সেটাকে নিয়ন্ত্রণ ও বিধিবদ্ধ করবে; এটাই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে মালিকানার বিষয়টি মুখ্য না; দাবির যৌক্তিকতাই প্রধান আলোচ্য। ক্ষমতা গ্রহণ ও প্রদানের নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আমরা সরকারের মুখাপেক্ষী, আবার সরকারও আমাদের কাছে দায়বদ্ধ। আমি আমার মালিকানার দাবি করে বলছি না, আপনাদের দায়িত্বকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে দাবি করছি সুন্দরবনকে যেকোনো ধরণের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করুন!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল
আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







