‘দেশের রাজনীতির রহস্য পুরুষ’ সিরাজুল আলম খানকে সত্য প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে আত্মদায়বদ্ধ সামাজিক সংগঠন ‘প্রজন্মের চেতনা’।
সংগঠনটি বলছে: ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে তার মনোনীত জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে কতোজন স্বাধীনতাবিরোধী ছিল সেটা প্রকাশ করা সিরাজুল আলম খানের নৈতিক দায়িত্ব।
শুক্রবার রাজধানীর শাহবাগে মানববন্ধন করে সংগঠনটি। ইতিহাসের বৃহত্তর স্বার্থে- মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত দালাল আইনে অভিযুক্তদের তালিকা প্রকাশ ও ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত ও পরাজিত বাঙালি সদস্যদের মধ্যে যারা স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা পালন করেছে তাদের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিচয়সহ সকল তথ্য-উপাত্ত জনসম্মুখে প্রকাশ করার দাবিতে প্রজন্মের চেতনা এ মানবন্ধন করে।
মানববন্ধনে নাজিম উদ্দিন গেরিলা বলেন: মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কর্তৃক চলতি মাসের ১৫ তারিখ প্রকাশিত তালিকাটি কোনোভাবেই রাজাকারের তালিকা নয়। অপ্রিয় হলেও সত্য- মূলত ওই তালিকাটি ছিল ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত দালাল আইনে অভিযুক্তদের অংশবিশেষ মাত্র। অথচ মন্ত্রণালয় রাজাকারদের তালিকা বলে প্রকাশ করেছে! বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এর দায়-দায়িত্ব কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এড়াতে পারে না।
বক্তারা আরও বলেন: প্রকাশিত ওই তালিকায় যাদের নাম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তাদের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিচয়সহ জনযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান কী ছিল, তা নির্ধারণ করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখন দায়িত্ব হচ্ছে একটি গ্রহণযোগ্য নাগরিক কমিশন গঠন করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা। তাহলেই বেরিয়ে আসবে যুদ্ধকালীন কার কী ভূমিকা ছিল। এছাড়া চিহ্নিত করতে হবে যারা দালালদের তালিকা প্রকাশে বাধা দেয় বা তালিকা প্রকাশ বন্ধ করতে বলে তারা কারা? তাহলেই বেরিয়ে আসবে তারা কিভাবে আমাদের ৪৮ বছর ধরে ধোকা দিয়ে বোকা বানিয়ে রেখেছে! যদি তাদের প্রকৃত স্বরূপ চিহ্নিত করা না যায়, তাহলে কোনো দিনই জানা যাবে না স্বাধীনতার বিরোধীতা করার পরেও এদেশে কারা কিভাবে পেয়েছে যোদ্ধা আর শহীদের মর্যাদা!
সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক মোহাম্মদ গোলাম নবী হোসেন বলেন: ‘‘১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত ও পরাজিত বাঙালিদের মধ্যে কারা কিভাবে স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। অভাগা এই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত ও সমালোচিত ব্যক্তি সিরাজুল আলম খান তার অনুলিখিত বই ‘আমি সিরাজুল আলম খান’-এর ১২৯নং পাতায় উল্লেখ করেছেন, ‘আমি মুজিব ভাইকে বললাম চলমান আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসা প্রায় ২০০ জনকে মনোনয়ন দিতে। তিনি তাই করলেন।’ তাই সিরাজুল আলম খান সময়ের ব্যবধানে এখন দায়িত্ব এড়াতে পারেন না, কারণ তারই বাছাই করা ব্যক্তিদের মধ্যে কে কিভাবে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে আর ঘাতক সামরিক শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে কাজ করেছে; তাদের সকল ঘৃণ্য অপকর্মসহ নামের তালিকা আগামী ২০২০-২১ সালের মাহেন্দ্রক্ষণকে সামনে রেখে সিরাজুল আলম খানের প্রকাশ করা নৈতিক দায়িত্ব।’’
তিনি বলেন: কর্তৃপক্ষ যদি সকল স্বাধীনতাবিরোধীদের কর্মকর্তাসহ তালিকা প্রকাশ করেন, তাহলে এই দেশের মানুষ জানতে পারবে যুদ্ধকালীন কে কী ভূমিকা পালন করেছে। তারা কিভাবে সময়ের ব্যবধানে মুখোশের আড়ালে ভিন্ন পরিচয়ে সমাজে বিচরণ করছে। যুদ্ধের সময় গুটি কয়েকজন ছাড়া ধর্মান্ধ পীর ও মাদ্রাসা অলাদেরদের নৈরাজ্যজনক কর্মকর্তা এবং চীন বিপ্লবের সময় ব্যবহারিত তাদের নিজেস্ব প্রযুক্তির সবুজ রং-এর বিষাক্ত ফাঁদের অস্ত্র, আমাদের দেশের চীনপন্থী কমিউনিস্টরা খেতের পাশে ব্যবহার করে কিভাবে জনযোদ্ধাসহ প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে আর তাদের বিভিন্ন ঘৃণ্য অপকর্মের ঘটনাবলী!
এমনকি তৎকালীন চীনপন্থীদের বিষয়ে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তার লেখা বই ‘নিষফলা মাঠের কৃষক’-এর ২৩৩নং পাতায় উল্লেখ করেছেন: ‘‘আমরা যেন না ভুলি যে চীনপন্থী কমিউনিস্টদের প্রতি চরমপন্থী দলও সে-সময় পাকিস্তান চীনের বন্ধু ছিল বলে, চীনের বন্ধু পাকিস্তানের সমর্থনে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিয়েছিলেন। মানবিক মূরতা এতটাই ভ্রামাত্মক! এছাড়া বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ১৯৭১-এর ৩১ আগস্ট যে রাজনৈতিক নীতিমালা প্রকাশ করে তাতে উল্লেখ আছে, ‘দেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী চীনপন্থীদের সম্পর্কে হুশিয়ার থাকিতে হইবে।’’
এর আগে কর্মসূচির শুরুতে ডা. পেমাঙ্কর রায়-এর মৃত্যুতে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয় এবং কবি সাইদ তপু ‘জাগো আরেক বার’ শিরোনামে তার একটি স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন।
মানববন্ধন কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতিকর্মী আনোয়ার ফরিদী, যুগ্ন- আহ্বায়ক এম এম রাশেদ রাব্বি, শাজাহান কবির সুমন, সদস্য মো. মাসুদ আলম, মো. ছালেক-উর-রহমান (সুমন) এবং গণমাধ্যম কর্মী আমীর মোহাম্মদ জুয়েল, নাট্যকার ও নাট্য সংগঠক দীন ইসলাম শ্যামল, মো. শওকত হোসেন বাবুল, ফজলুর রহমান ভুলু।







