বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও একটি নতুন মাত্রা যোগ হতে চলেছে। সড়ক ও রেল যোগাযোগের পর এবার ভারতের সঙ্গে নৌ যোগাযোগ চালু হতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে নৌ যোগাযোগ চালু রাখার বিষয়ে ভারতের সঙ্গে সম্মতিতে পৌঁছেছে বাংলাদেশ।
প্রোটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড (পিআইডব্লিউটিটি) পাঁচ বছরের জন্য নবায়নের সমঝোতা হয়েছে দুই দেশের মধ্যে। এর ফলে দুই দেশে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনকারী নৌযান সহজে চলাচল করতে পারবে।
গত ২৩ ও ২৪ নভেম্বর ভারত ও বাংলাদেশ সচিব পর্যায়ের বৈঠকের পর এই সমঝোতা হয়। বৈঠকে কোস্টাল শিপিং এগ্রিমেন্ট এর খসড়াও চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই খসড়ায় নৌপথ নির্বাচন, ব্যাংক গ্যারান্টি দেওয়াসহ বেশ কয়েকটি নতুন উপাদান যুক্ত হতে যাচ্ছে বলেও জানা গেছে।
একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নে মানবিক সংযোগের পাশাপাশি ফিজিক্যাল কানেকটিভি দরকার। এজন্য দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সড়ক, রেল ও নৌ যোগাযোগ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
কানেকটিভিটি ছাড়া পাশাপাশি বসবাসকারী দেশগুলোর কারও এককভাবে উন্নতি করা সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন যে, পারস্পরিক শ্রদ্ধ ও প্রীতির সম্পর্ক গড়ে তোলা ছাড়া উভয় দেশের উন্নতি-অগ্রগতি দূরূহ। এ জন্য অবশ্য সবার আগে দরকার বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ‘মনের কানেকটিভি’।
পরস্পরের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। গড়ে তুলতে হবে নতুন উন্নয়ন কাঠামো। যেটি কারও ক্ষতির কারণ হবে না বরং উভয়ের জন্য হবে লাভজনক। উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি।
দুইশ বছর ব্রিটিশ শাসনে থাকার পর ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান আলাদা দেশ হলেও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের অনেক রুটে সরাসরি বাস ও ট্রেন যোগাযোগ ছিল। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর এসব রুট বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। শেখ হাসিনা নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে সরকার গঠনের পর ঢাকা-কলকাতা সরাসরি বাস চলাচল শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালে ঢাকা-কলকাতা ট্রেনও চালু হয়।
এরপর এই বছরের মাঝামাঝিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরের সময় ঢাকা-শিলং-গোয়াহাটি ও কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা বাস সার্ভিস উদ্বোধন হয়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার আঞ্চলিক যোগাযোগে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ভারত হয়ে নেপাল-ভুটানে সরাসরি চলাচলও আলোর মুখ দেখছে।
গত ২৪ নভেম্বর ভারতের মেঘালয় রাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর থেকে যেসব সড়ক রুট বন্ধ হয়ে আছে, তা পুনরায় আমরা চালু করতে চাই।’ প্রধানমন্ত্রীর এই অঙ্গীকার ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চারটি জলপথ কার্যকর রয়েছে। সেগুলো হলো- বাংলাদেশ হয়ে দক্ষিণাঞ্চলীয় আসামের কলকাতা-পান্ডু, কলকাতা-করিমগঞ্জ, বাংলাদেশের রাজশাহী থেকে দক্ষিণাঞ্চলীয় আসামের ধুলিয়ান এবং বাংলাদেশ হয়ে করিমগঞ্জ-পান্ডু-করিমগঞ্জ। এ জলপথগুলো ১৯৭২ সাল থেকে কার্যকর রয়েছে।
আন্তঃদেশীয় জলপথ ব্যবহারের মাধ্যমে দুদেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়াতে প্রত্যেকটি দেশে চারটি করে বন্দর রয়েছে। বাংলাদেশের বন্দরগুলো হল-নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, মংলা এবং সিরাজগঞ্জ। আর ভারতের বন্দরগুলো হল-কলকাতা, হালদিয়া, করিমগঞ্জ এবং পান্ডু।
উল্লেখ্য, ত্রিপুরা আর অন্য উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো তিন দিক থেকে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, ভুটান এবং চীন দিয়ে বেষ্টিত। ভারতের জন্য এই নদীপথ চালু হওয়াটা অনেক বেশি লাভজনক। কলকাতা আর আগরতলার মধ্যে ১,৬৫০ কিলোমিটার দূরত্ব রয়েছে।
যদি বাংলাদেশ হয়ে আসা যায় তবে এ দূরত্ব কমে ৫১৫ কিলোমিটারে দাঁড়ায়। আর তাই কলকাতাসহ অন্যান্য শহর থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য আনা নেওয়ার সময় কমাতে বাংলাদেশের জলপথ এবং বন্দর ব্যবহারের জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছে ভারত।
উভয় দেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে নদীপথে শিলাইদহ কুঠিবাড়ি যেতেন, সেই জলপথই আবার চালু হতে চলেছে। মেঘনা-যমুনা-তিতাস এখন ইছামতী-ভাগীরথীর উজানপথের গন্তব্যস্থল হতে পারে। শুধু তাই নয়, এতদিন কলকাতা থেকে চট্টগ্রাম বঙ্গোপসাগর বেয়ে যাওয়ার কোনও নিয়মই ছিল না। পণ্য চলাচল ছিল। তাও আবার কলকাতা থেকে সেই কলম্বো বা সিঙ্গাপুর যেতে হত৷ তারপর নাক ঘুরিয়ে চট্টগ্রাম বা মংলা৷ এখন সেইসব ইতিহাস প্রাচীন হয়ে উঠল।
চাইলে সুন্দরবন থেকেও নদীপথে বাঘ-জঙ্গল দেখতে দেখতে ওপারের সুন্দরবন যাওয়া যাবে সহজেই। সড়ক আর রেলপথ খোলার কাজটা আগেই শুরু হয়েছিলো। এবার শুরু জলপথ উন্মুক্ত করা৷ এককথায় সীমান্তটাই বিলোপ হতে চলেছে। এসব নিয়ে রাজনীতির কূটকচালি চলতে থাকবেই। কিন্তু ঔপনিবেশিকদের দু’দেশের মানুষের মধ্যে প্রাচীর তুলে ভেদাভেদ তৈরি করার সিদ্ধান্তটা এবার বোধ হয় ভাঙতে চলেছে। কূটনীতির ইতিহাসে এমন একটা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নজির খুব কম।
আপাতত যে নদীপথগুলোতে যাত্রাবাহী ছোট জাহাজ বা প্রমোদতরণি চলতে পারে বলে ভাবা হয়েছে সেগুলো হল, কলকাতা-হলদিয়া-রাইমঙ্গল-খুলনা-মঙ্গলা-বরিশাল-হিজলা-চাঁদপুর-নারায়ণগঞ্জ-সিরাজগঞ্জ৷ চাইলে এই পথ বিস্তৃত হতে পারে ধুবড়ি ও পাণ্ডু পর্যন্ত। দ্বিতীয় বিকল্প পথটি নারায়ণগঞ্জ থেকে সিরাজগঞ্জ হয়ে শেরপুর-আসামের করিমগঞ্জ পর্যন্ত।
তৃতীয় পথ–রাজশাহী থেকে ধুলিয়ান পর্যন্ত। যত সহজে এই কল্পনার পথে ভেসে যাওয়া যায়, ততটা সহজ নয় নদীপথ। বছরের অধিকাংশ সময়ই এর মধ্যে অনেক নদী মজে থাকে। তাই প্রয়োজন নিয়মিত পলি ওঠানোর কাজ৷ সুখের কথা এবার ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে বাংলাদেশ বিশ্ব ব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেণ্ট ব্যাঙ্কের কাছে ড্রেজিং-এর জন্য আর্থিক ঋণের আবেদন করবে। ভারতের পক্ষে আবেদন করা সম্ভব নয়।
যেহেতু এই ঋণ কেবল স্বল্প উন্নত দেশের জন্যই বরাদ্দ হয়ে থাকে। সেই আবেদন মঞ্জুর হওয়ার ফলেই নির্বিবাদে নদীপথে সফর করা যাবে। তবে এটা বলে রাখা ভাল, সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলের সেই সমস্যা নেই। এই রুট চালু হওয়া যতটা যাত্রীদের কাছে যতটা রোমান্টিক বিষয়, ততটাই বাণিজ্যিক দিক থেকে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য অবশ্য প্রয়োজন শিল্পের প্রসার। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। একটি বিশেষ আর্থিক অঞ্চল গড়ে তুলতে পাললে লাভবান হবে বাংলাদেশ।
ভারত-সহ বিশ্বে পণ্য রপ্তানির এক তালুক হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশ। তাতে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ঘাটতি যেমন কমবে, তেমনই প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। আর এটা কেবল ভারত ও বাংলাদেশ নয়, সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে কলকাতা-ঢাকা থেকে ইয়াঙ্গন হয়ে ব্যাংককেও৷ তারপর সেখান থেকে ভিয়েতনামের হ্যানয়। প্রায় গোটা দুনিয়া হাতের মুঠোয়। এমন সম্ভাবনা নিয়েই এবার ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ‘সোনার তরী’ চলাচলের অপেক্ষায়!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






