রনি হক নামে একজনের একটি ভিডিও কল ভাইরাল হয়েছে। রনি হক একজন ব্যবসায়ী। বয়স আনুমানিক ৩৫+। তার মোটামুটি সব আছে। আপাতদৃষ্টিতে একটা সুখী পরিবার আছে। সেখানে সুন্দরী স্ত্রী আছে। দুটো ফুটফুটে সন্তান আছে।
রনি হকের সামাজিক জীবন আছে। আড্ডা দেয়ার মতো বন্ধুবান্ধব আছে। প্রায় ২৫০০ বন্ধুসহ ফেসবুক আইডি আছে। সেখানে বউ বাচ্চাদের সাথে সুখময় জীবনের ছবি আছে। বন্ধু-আত্মীয় পরিজনের সাথে ইফতার পার্টি, বিয়ে ইত্যাদি সামাজিক অনুষ্ঠানের ছবিও আছে।
রনি হক ধর্ম-কর্ম করে, জিম এ যায়, পরিবার নিয়ে দেশ বিদেশে ঘুরতে যায়, সিগারেট খায়, মাঝে মাঝে মদ খায় এবং মাতাল হয়। রনির গাড়ি আছে, বাড়ি আছে, ভালো ইনকামও আছে। সে আপাত সুখী, সফল একজন সামাজিক পুরুষ মানুষ।
রনি হকের এই সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের বিবরণ আপনার সাথে কম বেশি মিলে যায় কি? চেহারা, পোশাক দেখে মনে হয়না, তবুও রনি ধর্ষক। রনি প্রতারক। রনি বিকারগ্রস্ত। রনি যৌন নির্যাতক। আপনাকে দেখলেও মনে হয় না কিন্তু প্রিয় পুরুষ। আপনাকেও দেখতে রনি হকের মতোই ভদ্রলোক লাগে। তবুও, আপনাকেও আমরা একই কারণে সম্ভাব্য ধর্ষক, প্রতারক, বিকারগ্রস্ত, যৌন নির্যাতক ভাবি।
কী বললেন? আপনি সম্ভাব্য ধর্ষক নন? আপনি অন্যদের চেয়ে আলাদা? আপনি উন্নততর? বিশ্বাস করুন, আমরাও সেটা মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে চাই। কিন্তু চারদিকের বাস্তবতা, আপনাদের কৃতকর্ম আমাদের সেটা বিশ্বাস করতে দেয় না। কি দেখে বুঝবো যে সব পুরুষ এক নয়? আপনিই বা কিভাবে সেটা প্রমাণ করবেন?
এই রনি হক’ই গণপিটুনীর শিকার হয়েছে একটি মেয়েকে তার ব্যক্তিগত গাড়িতে তুলে ধর্ষণের চেষ্টার দায়ে। কাল যদি রনি ধর্ষক অভিযুক্ত না হয়ে ঘটনাচক্রে জনতার কাতারে থাকতো, তাহলে হয়তো সেও প্রতিবাদি সেজে দুই এক ঘা লাগিয়ে দিতো ধর্ষককে। গলার রগ ফুলিয়ে গালি দিতো। যেমন অনেকেই দিয়েছে কাল।
এখানেই শুভংকরের ফাঁকির খেলা। ধর্ষক শব্দটা কারো গায়ে লেখা থাকে না। সকলেই রনি হকের মতো বা আপনার মতো কারো স্বামী, কারো বাবা, কারো বন্ধু, কারো সন্তান, কারো প্রেমিক। চেহারা ভদ্রলোকগোছের বা গোবেচারা ধরণের। রনির মতো আপনি হয়তো অতোটা বেপরোয়া নন। রাস্তা ঘাটে ব্যক্তিগত গাড়িতেই ধর্ষণে লিপ্ত হবেন না। কিন্তু সুযোগ পেলে আপনিও ধর্ষণ করবেন না, যৌন নির্যাতন করবেন না, সেই নিশ্চয়তা কোথাও নেই।
আপনি কারো বাবা বা ভাই বলে কোন মেয়েকে ধর্ষণ করবেন না, এই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না।
আপনি বিবাহিত বা অবিবাহিত হলে ধর্ষণ করবেন না, সেই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না।
আপনি তরুণ বা মাঝবয়সী বা বৃদ্ধ হলে ধর্ষণ করবেন না, সেই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না।
আপনি শিক্ষিত বা অশিক্ষিত হলে ধর্ষণ করবেন না, সেই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না।
আপনি আস্তিক বা নাস্তিক হলে ধর্ষণ করবেন না, সেই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না।
আপনি ধনী বা গরীব হলে ধর্ষণ করবেন না, সেই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না।
এমনকি, আপনি সাদা বা কালো হলে, মোটা বা চিকন হলে, টেকো বা চুলওয়ালা হলে, লম্বা বা খাটো হলে, সুশ্রী বা কুশ্রী হলে, পরিশ্রমী বা অলস হলে, কবি, সাহিত্যিক, অভিনেতা হলে, আপনি ধর্ষণ করবে না, সেই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না।
সেকারণেই, পুরুষকে দেখলে একটা বাড়তি সতর্কতার অ্যালার্ম বেজে ওঠে মনের ভেতর। শুধু নারীর না, পুরুষেরও। তাই পুরুষেরাও নিজের কাছের বা পরিবারের নারীদের অন্য পুরুষ থেকে নিরাপদে রাখতে চায়।
এইযে এতো অভিযোগের আঙ্গুল আপনাদের দিকে, এই যে এতো গালি, ঘৃণা, অসম্মান, অভিশাপ – আপনাদের খারাপ লাগে না? এই অবস্থার পরিবর্তন করতে ইচ্ছা করে না? নারী পুরুষ নির্বিশেষে মানুষ আপনাকে ভালোবাসুক, বিশ্বাস করুক, সম্মান করুক, চান না সেটা?
যদি চান, তবে এই অভিযোগ থেকে, এই অসম্মানের জীবন থেকে বের হয়ে আসুন প্রিয় পুরুষ। খুঁজে বের করুন এই রিপুর তাড়না থেকে পরিত্রাণের উপায়। সিদ্ধান্ত নিন, আপনি আপনার যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণ করবেন, নাকি আপনি যৌন তাড়না দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবেন? দায়িত্ব নিন প্রিয় পুরুষ, প্রমাণ করে দিন, যেকোনো পরিবেশে আপনিও বিশ্বাসযোগ্য ও নিরাপদ, আপনাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আপনি মানুষ, পশু নন। এই পশুত্বের জীবনকে না বলুন।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








