আলোচিত-সমালোচিত ছাত্রলীগ নেতা নুরুল আজিম রনির অবশেষে বোধোদয় হয়েছে। তার আগে অবশ্য তাকে ছাত্রলীগের পদ ছাড়তে হয়েছে। দুর্নাম কুড়াতে হয়েছে ব্যক্তিগতভাবে। এমনকি রনির দুর্নামের ভাগিদার হতে হয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগকেও। এর দায় গিয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগের কাঁধেও।
ছাত্রলীগের দায়িত্বে না থাকা রনি আইন-আদালতকে শ্রদ্ধা করে আইনের কাছেই আশ্রয় চেয়েছেন। জামিন আবেদন করেছিলেন আদালতে। তার জামিন নামঞ্জুর করে গত ৪ জুন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম তাকে কারাগারে প্রেরণ করেছেন। চট্টগ্রাম বিজ্ঞান কলেজ অধ্যক্ষ জাহেদ খানের দায়ের করা চাঁদাবাজির একটি মামলায় নুরুল আজিম রনি ৭ মে চার সপ্তাহের অন্তর্বর্তী জামিন পেয়েছিলেন হাইকোর্টে।
গত ৩১ মার্চ কলেজ ক্যাম্পাসে গিয়ে কলেজের অধ্যক্ষ জাহেদ খানকে মারধর করেন রনি। উন্নয়ন ফির নামে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছিলেন অধ্যক্ষ, এমন অভিযোগ ছিল রনির। অপরদিকে, অধ্যক্ষের দাবি চাঁদা দাবি করেছিলেন ছাত্রলীগের ওই নেতা, এবং সেটা না পেয়ে ওই হামলার ঘটনা।
রনির শিক্ষক লাঞ্ছনার ভিডিও ফেসবুকে প্রচার হওয়ার পর নানামুখী আলোচনা শুরু হয়। ফেসবুকে থাকা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ সমর্থকদের একাংশ এই ঘটনাকে সমর্থন করে রনিকে ব্যতিক্রমী ও উজ্জ্বল এক ছাত্রনেতা আখ্যা দিয়ে ঘরে ঘরে এমন ছাত্রনেতা দরকার বলেও প্রচারণা চালায়।
তারা দাবি করে, কয়েকটা কিল-ঘুষিতে যদি শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত ফি থেকে মুক্তি পেয়ে যায় তাহলে সে কিল-ঘুষিই উত্তম। তাদের সে দাবি যে ভ্রান্তিতে পূর্ণ ছিল রনির বোধোদয়ে সেটা প্রমাণিত। সন্ত্রাসের মাধ্যমে কোন দাবি আদায়ে ভূমিকা নিলে শেষ পর্যন্ত যে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয় রনি এখন নিশ্চয় টের পাচ্ছেন, এবং সেটাই স্বাভাবিক। তবে এখানে প্রায়শ্চিত্তের বিষয়টি ঘটমান বর্তমান হলেও এখানে ‘বোধোদয়’ নামক শব্দের ব্যবহারে পক্ষপাতি, কারণ এটা ইতিবাচক অর্থেরই নির্দেশ করে।
নুরুল আজিম রনি ফেসবুকে একটা অংশের মধ্যে জনপ্রিয়। তার সে জনপ্রিয়তা অন্যের ওপর আক্রমণের মত আইন-আদালতকে অবজ্ঞা করার মত দুইটি পৃথক ভিডিওচিত্র প্রকাশের পর প্রমাণ হয়েছে। ফেসবুকের একটা অংশ স্বনির্ধারণী মানদণ্ডে সেই মারধরের মত অন্যায়কে সমর্থন করে গেছেন। অবাক ব্যাপার হচ্ছে এই রনি যখন এবার আইনকে শ্রদ্ধা করে আইনের কাছেই নিজেকে সমর্পণ করেছেন তখন আবার সেই সমর্থক অংশের অধিকাংশই মুখে কলুপ এঁটে বসা। মানুষের মধ্যকার ন্যায়-অন্যায়ের প্রভেদ নিরূপণের এমন দীনতা সত্যি অবাক করার মত।
ধারণা করা যায়, ফেসবুকের অধিকাংশই কোনো না কোনোভাবে শিক্ষার সুযোগ পেয়েছে, এবং নিচ্ছেও। শিক্ষিত এবং শিক্ষিত হতে যাওয়া বিশাল এক জনগোষ্ঠী যখন পরিস্কার অন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে যায়, এবং অন্যায়কারীর কৃত অন্যায় থেকে বেরিয়ে আসার উদাহরণেও নির্বিকার থাকে তখন অবাক হয়ে যেতে হয়। মানুষের মধ্যকার বিবেচনাবোধের এমন নিদারুণ অভাব আমাদের সামাজিক শৃঙ্খলাবোধের অন্তরায় হিসেবে যে কাজ করবে না সে কে বলবে!
রনি শেষ পর্যন্ত নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন এটা সুখবর। এবার আইনি প্রক্রিয়ায় তিনি বেরিয়ে আসলে এবং খালাস পেলে এখানে আপত্তির কিছুই নেই, থাকার কথাও না; এটাই রীতি। আইনকে শ্রদ্ধা করার এই মানসিকতা আমাদের সমাজের মধ্যে দৃঢ় হলে সামাজিক স্থিতি রক্ষা হবে, এবং সমাজ উপকৃত হবে। তবে এই সামাজিক স্থিতি ও শৃঙ্খলাবোধের ব্যাপারটার সমাবেশ কেবল অভিযুক্ত দিয়েই শুরু হলে চলবে না, সমাজস্থিত তৃতীয় পক্ষ হয়েও যারা অভিযুক্ত পক্ষের হয়ে গলা মেলায় একটা পর্যায়ে তাদের মধ্যেও সঞ্চারিত হতে হবে। তা না হলে ব্যক্তির সামাজিক বোধের উত্তরণ ঘটবে কীভাবে?
রাজনীতি বিশ্লেষণের এই সময়ে এসে বলা যায়, অন্যান্য সংগঠনগুলোর তুলনায় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের দিকে সজাগ দৃষ্টি গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের। তাদের যেকোনো কর্মকাণ্ডে ঈগল চোখ তাদের। নেতিবাচক কিছুতে ঝাঁপিয়ে পড়ে গণমাধ্যম সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এনিয়ে আলোচনা-সমালোচনার বান ছুটে। কাঠগড়ায় একপাক্ষিকভাবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয় পুরো সংগঠনকে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এনিয়ে ইচ্ছে হলে কোন পদক্ষেপ নেয়, অন্যথায় এড়িয়ে যায়; আবার কিছুক্ষেত্রে তারা দায় এড়ায় ব্যক্তির অপরাধের দায় সংগঠনের নয়- এমন দাবির মাধ্যমে।
ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের অন্যায় যেকোনো কর্মকাণ্ডের এমন আলোচনা-সমালোচনকারীদের সকলেই যে সংগঠন-বিদ্বেষ থেকে করছেন তা কিন্তু নয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংগঠনটির নেতৃত্ব পর্যায়ে এবং প্রান্তিক পর্যায়ের অনেকেই এমন ভুল করে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের ভাবনাটা একপাক্ষিকভাবে দায়সারাগোছের, এবং অপরের ওপর দায় চাপিয়ে নিজেদের দায়মুক্ত করার প্রাণান্ত অপচেষ্টা। বলতে দ্বিধা নেই, ঠিক এসব কারণে ছাত্রলীগ নেতাকর্মী কৃত অন্যায়গুলো বাড়ছে ক্রমশ।
ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ওপর সকল মাধ্যমের সতর্ক দৃষ্টি থাকার কারণ এই মুহূর্তে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, এবং ছাত্রলীগ সরকারি দলের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন। সরকারি দলের সঙ্গে ছাত্রলীগের এমন সম্পর্ক একদিকে যেমন তাদের গুরুত্ব বাড়িয়েছে, অপরদিকে গুরুত্ব বাড়িয়েছে বাংলাদেশের স্বাধিকার, স্বাধীনতা সহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সংগঠনটির নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের অনেকেরই রাজনৈতিক বিকাশ হয়েছে এই সংগঠনে। সেই হিসেবে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের ওপর মানুষের চাওয়ার ক্ষেত্রটা বিশাল। চাওয়ার এই জায়গায় আঘাত তাই অনেকেই মেনে নিতে পারে না।
নুরুল আজিম রনি সর্বশেষ আলোচনায় যখন এসেছিলেন তখনও ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। চট্টগ্রাম বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষ এবং এক কোচিং সেন্টারের পরিচালককে মারধরের ঘটনার ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর তিনি মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে অব্যাহতি নেন, এবং তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ তার ওই অব্যাহতিপত্র গ্রহণ করে। এখন তার পদ নেই, আছে আইন-আদালতকে শ্রদ্ধা করার বোধজ্ঞান। এই বোধজ্ঞান রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিকাশের একটা প্রপঞ্চ, যা নেতৃত্ব থাকাবস্থায় বিকশিত হলে তিনি নিজে সহ তার সংগঠন উপকৃত হত। তবে পদ না থাকলেও যে ব্যক্তি হিসেবে তিনি ও সংগঠন-দল উপকৃত হবে না তা না; হতে পারে, যদি তা অব্যাহত রাখতে পারেন। আমাদের আশাবাদ সেটাই করতে চলেছেন তিনি। এমনটা হলে নিশ্চিতভাবে সেটা ভালো খবর।
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া অহঙ্কারের বিষয় নয়। এটা নিন্দাযোগ্য, সামাজিকভাবেও ঘৃণার। কথাগুলো কেবল কোনো অভিযুক্তের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, পক্ষ নেওয়া সকলের জন্যেও প্রযোজ্য। দেশে আইনের প্রয়োগ কম বা ক্ষেত্রবিশেষে নেই- এমন অভিযোগ অনেকের। তবে এমন শত অভিযোগ থাকলেও আইনকে অগ্রাহ্য করার শক্তি কারো নেই। শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে আইনের পথ ধরে আদালতের ওপর আস্থা রাখতেই হয়। এটা সর্বশেষ সত্য, একে মেনে নিতেই হবে।
দেশে বিচার বহির্ভূত বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা চলছে। আইন-আদালতকে পাশ কাটিয়ে যেকোনো কর্মকাণ্ডই নৈতিক দিক থেকে সমর্থনযোগ্য নয়- কথাগুলো সকলেই বলছে। এটা যেমন পুলিশ-র্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, ঠিক একইভাবে প্রযোজ্য রনি-জনি-মনি-টনি সহ নানা নামের সকলে ব্যক্তি ও তাদের সমর্থকদের ক্ষেত্রেও। আইন ও আদালতকে যখন আমরা সর্বশেষ সত্য ও সর্বশেষ আশ্রয় ভাবব তখনই কেবল আসতে পারে সামাজিক স্থিতি, এর আগে কেবলই বৃথা অপেক্ষা।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








